বন্ধু ভারত যেন আতঙ্ক জাগানো কিছু না করে : পররাষ্ট্রমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক :
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ‘নিবিড় সম্পর্কের’ কথা মনে করিয়ে দিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন বলেছেন, জনগণ চায়, প্রতিবেশী দেশটি এমন কিছু করবে না, যাতে আতঙ্ক তৈরি হয়।

আসামের পর জাতীয়ভাবে পুরো ভারতে নাগরিকপঞ্জি করার উদ্যোগ নিয়ে আলোচনার মধ্যে শুক্রবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বক্তব্য আসে।

ভারতীয় হাই কমিশনার রীভা গাঙ্গুলী দাসের উপস্থিতিতে ওই অনুষ্ঠানে তিনি আশা প্রকাশ করেন, পরস্পর বন্ধুত্বের মাধ্যমে ভারত ও বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। দুই দেশের জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে।

“আমরা আশাবাদী, এই সম্পর্ক ক্রমান্বয়ে নিবিড় থেকে নিবিড়তর হবে। সেই সাথে আমাদের দেশের জনগণের প্রত্যাশা যে, বন্ধুপ্রতীম ভারত এমন কিছু করবে না, যাতে উভয় দেশের জনগণের মধ্যে দুশ্চিন্তা বা আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।”

নানা বিতর্কের মধ্যে গত অগাস্টে আসামের চূড়ান্ত নাগরিকপঞ্জি প্রকাশ হলে দেখা যায়, রাজ্যটির বাসিন্দা ১৯ লাখ মানুষের নাম সেখানে স্থান পায়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর আগে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে আসামে যারা আবাস গেঁড়েছেন, তারাই তালিকায় রয়েছেন।

নাগরিকপঞ্জিতে বাদ পড়াদের ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করে ভারত থেকে বের করে দেওয়া হতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে ভারতীয় গণমাধ্যমে। বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে কথা বললে তিনি এ বিষয়ে বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই বলে আস্বস্ত করেন।

এদিকে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নভেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে ইংগিত দেন, আসামের ওই তালিকা বাতি করা হবে। পুরো ভারতের সঙ্গে নতুন করে নাগরিকপঞ্জি হবে আসামে।

এর মধ্যে ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে অবৈধ পথে মানুষের আসা বেড়ে গেলে নানা আলোচনার সৃষ্টি হয়। গত মাসে মহেশপুর সীমান্ত দিয়ে প্রায় আড়াইশ মানুষ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন, যাদের আটক করে থানায় সোপর্দ করেছে বিজিবি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশকে ভারতের স্বীকৃতি প্রদানের বার্ষিকী উপলক্ষ্যে শুক্রবার একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানে দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি প্রত্যাশার কথাও বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন।

তিনি বলেন, “দুই দেশের বন্ধুত্ব, পারস্পরিক বিশ্বাস, আস্থা ও বোঝাপড়া বর্তমানে অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে দৃঢ়তর। যার ফলশ্রুতিতে পারস্পরিক সহযোগিতা ও উন্নয়নের নতুন নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হচ্ছে।

”গত এক দশকে আমাদের দুই দেশের বন্ধুত্ব অনন্য উচ্চতায় আসীন হয়েছে। যাকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সোনালী অধ্যায় হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। আমাদের দুই দেশের সরকার প্রধানদের এই যে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে এবং ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে অনেক বেশি শক্ত ভীতে পরিণত করেছে।”

হাই কমিশনার রীভা গাঙ্গুলী বলেন, “একাত্তরে ভারত বাংলাদেশের পাশে ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমাদের মধ্যে যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, সেটা চিরকালীন এবং সময়ের পরীক্ষায় সেটি সবসময় উত্তীর্ণ হবে।”

৪৮ বছরে বাংলাদেশের ’উন্নতি’ অনেক দেশের কাছে ঈর্ষার বিষয়ে পরিণত হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমরা বাংলাদেশের উন্নতিতে নিজেদের জন্য বড় রকমের অর্থনৈতিক সুযোগ দেখি। কারণ, আমরা দুইজনে একসাথে এগিয়ে যেতে পারি- এটা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ‍উন্নয়ন এবং দুই সরকারের গৃহীত বহু পদক্ষেপের ক্ষেত্রে।“

রীভা গাঙ্গুলী বলেন, “অপারেশন সার্চলাইট, রবীন্দ্র সঙ্গীত নিষিদ্ধ করা, একটা প্রজন্মের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা- এ ধরনের ঘটনা যেন না ঘটে, কিংবা আরেকবার ’আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ যেন লেখা না হয়। একটা উদার নৈতিক মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখতে বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষ কাজ করছে বা করে চলেছে, ভারত তাদের পাশে আছে।”

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এখন অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে ‘অনেক ভালো’ বলেও মন্তব্য করেন হাই কমিশনার।

তিনি বলেন, “আজকে আমাদের সম্পর্ক বহুমুখী। আমাদের সম্পর্ক কেবল ব্যবসায়-বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো ট্র্যাডিশনাল খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না। এ ছাড়া আমরা তথ্য প্রযুক্তি, মহাকাশ, পারমাণবিক বিজ্ঞানের মত নতুন নতুন ক্ষেত্রেও আমাদের সম্পর্ক বাড়াচ্ছি।”

নরেন্দ্র মোদীর ‘সাবকা সাত, সাবকা বিকাশ’ উদ্যোগের কথা তুলে ধরে হাই কমিশনার বলেন, “ভারত সরকার বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ককে সব থেকে বেশি গুরুত্ব দেয়। আমাদের কাছে প্রতিবেশী প্রথম এবং প্রতিবেশীদের মধ্যে বাংলাদেশ সবার আগে।”

বাংলাদেশকে ঋণচুক্তির আওতায় (এলওসি) ৮ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার কথা উল্লেখ করে রীভা গাঙ্গুলী বলেন, “মোটামুটি এর ৮০ ভাগের বেশি অবকাঠামো ও কানেক্টিভিটি প্রকল্পে ব্যবহৃত হয়েছে। অবকাঠামো ও কানেক্টিভিটির উন্নয়ন প্রবৃদ্ধির একটা ইঞ্জিন।

“আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যেতে আমাদের যৌথ উদ্যোগগুলো প্রমাণ করে, আমাদের এই সহযোগিতা দুই দেশের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য।”

ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টা সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের সভাপতিত্বে এ আলোচনা সভায় ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান ও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক‘ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির।

অন্যদের মধ্যে মৈত্রী সম্মাননাপ্রাপ্ত ব্রিটিশ অধিকারকর্মী জুলিয়ান ফ্রান্সিস, সাংসদ আরমা দত্ত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।