সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ই-মেইল : সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা

 মোঃ মমিনুর রহমান :

‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এর প্রধান লক্ষ্য হলো প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশের নাগরিকদের সরকারি সেবা নিশ্চিত করা ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সামগ্রিক উন্নতি সাধন। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ ভিশন’এর অন্যতম প্রধান চারটি উপাদারে উপর সরকার জোর দিয়েছে তা হলো মানব সম্পদ উন্নয়ন, জনগণের অংশগ্রহণ, সিভিল সার্ভিস এবং ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করা। মানব সম্পদ উন্নয়নের প্রধান এবং প্রথম সিড়ি হলো প্রাথমিক বিদ্যালয়। বর্তমান যুগে পৃথিবীর যে প্রান্তেই কর্মসংস্থান হোক না কেন, তাকে প্রাথমিক জ্ঞান থাকা বাধ্যতামূলক। যার কারণে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংবিধানের 17 নং অনুচ্ছেদে একই পদ্ধতির গণমূখী ও সার্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর কাতারে যাওয়ার চেষ্টা করলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের দেশের অধিকাংশ প্রাথমিক প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো প্রত্যন্ত এলাকাতে থাকায় ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে বড় বাধা হয়ে দাড়িয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারি সেবা সহজীকরণ, প্রত্যন্ত এলাকার জনগণকে দক্ষ করা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান, জনগণকে সচেতন করে তোলা ইত্যাদি ক্ষেত্রে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ই-মেইল ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা অতীব জরুরী।

দেশের অধিকাংশ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর বর্তমান অবস্থা:

1। উর্ধ্বতন দপ্তর যেমন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, বিভাগীয় শিক্ষা অফিস, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস, উপজেলা শিক্ষা অফিস, যুব ও ক্রীড়া বিভাগ, মহিলা ও শিশু বিভাগ, সংস্কৃতি বিভাগ, স্বাস্থ্য বিভাগ, সমাজ কল্যাণ বিভাগ, সংস্থাপন বিভাগসহ বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন দপ্তর থেকে প্রায় প্রতিদিন এক বা একাধিক চিঠিপত্র আসে যা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে এবং তা একজন সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তাঁর ক্লাস্টারাধীন সকল বিদ্যালয়ে পৌছে দেন। কিন্তু মোবাইল বার্তায় একটি মেসেজের শতভাগ পৌছানো সম্ভব হয় না। ফলে শিক্ষকগণ দ্বিধায় পড়েন, মোবাইল বার্তা অনুযায়ী সরকারি নির্দেশনাটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতেও পারেন না।

2। উপবৃত্তি, বার্ষিক বিদ্যালয় শুমারি,  বইয়ের চাহিদা অনলাইনে এন্ট্রি, শিক্ষক তথ্য এন্ট্রি ও হালনাগাদ, জাতীয় দিবসগুলোর কর্মসূচি ইত্যাদিসহ নানাবিধ কাজে প্রধান শিক্ষকগণ (সময়ে সময়ে সহকারী শিক্ষকও) শিক্ষা অফিস মূখী হয়ে পড়েন। ফলে মানব সম্পদ উন্নয়নের প্রধান কাজ শ্রেণি পাঠদানে প্রচন্ড ব্যাঘাত ঘটে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক উপস্থিত না থাকলে শ্রেণি পাঠদান শতভাগ আশা করা যায় না যা সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার হিসেবে দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি।

3। সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ল্যাপটপ, সাউন্ড সিস্টেম, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরসহ কিছু বিদ্যালয়ে মডেম সরকারিভাবে পেয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে বা বিশ্বায়নের ক্ষেত্রে এগুলোর ব্যবহার অতীব জররী। মাল্টিমিডিয়া শ্রেণি পাঠদান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এমএমসি প্রতিবেদন দাখিলের জন্য এ্যাপসে রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। কিন্তু সকল বিদ্যালয় এ নিবন্ধনের আওতায় আসেনি। ফলে এমএমসি পাঠদান নিশ্চিত পুরোপুরি সম্ভব হচ্ছে না।

4। শিক্ষকগণ চর্চার অভাবে প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান কাজে লাগাতে পারছেন না, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সম্পকে অসচেতন থাকছেন। যার ফলাফল শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে এলাকাবাসিও এ বিষয়ে অসতেন থেকে যাচ্ছে।

5। সরকারের নির্দেশাবলীর মধ্যে যে সকল বিষয়ে গোপনীয়তা রাখা দরকার সেক্ষেত্রেও পিছিয়ে থাকছে।

6। ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে বার্তা পৌছানোর ক্ষেত্রে সময় ও অর্থ উভয়ের অপচয় হয়। যেমন ঘন ঘন মিটিং আহবান করা, প্রিন্টেড কপি নিতে শিক্ষা অফিস বা দূরবর্তি দোকানে যাওয়া।

এছাড়াও নানাবিধ সীমাবদ্ধতায় কাটাচ্ছে আমাদের দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো।

মেইল ব্যবহারের সুবিধা:

1। স্বল্পতম সময়ের মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে সরকারি পরিপত্র, আদেশ, নির্দেশ, প্রজ্ঞাপন ও বিভিন্ন চিঠিপত্র প্রেরন সম্ভব।

2। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের থেকে প্রাপ্ত পরিপত্র, আদেশ, নির্দেশ, প্রজ্ঞাপন ও বিভিন্ন চিঠিপত্র  পূর্ণাঙ্গ কপি প্রেরণ সম্ভব এবং সে অনুযায়ী বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দ্বিধাহীনভাবে শতভাগ বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিতে পারেন।

3। শিক্ষকগণের হয়রানি কমে সরকারি সেবা সহজীকরণ করা সম্ভব, ঘন ঘন মিটিং আহবান করে পাঠদান ব্যহত হওয়া থেকে মুক্তিলাভ।

4। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হয় এবং পরিকল্পনা করে কাজ করা সম্ভব হয়।

5। বিদ্যালয়ের ই-মেইল থাকলে বিদ্যালয়ের নামে অনলাইনে বিভিন্ন নিবন্ধন যেমন প্রাথমিক বিদ্যালয় ই-ব্যবস্থাপনা, ই-প্রাইমারি স্কুল সিস্টেম, এমএমসি প্রতিবেদন দাখিল, শিক্ষক বাতায়নের সদস্য হওয়া, মুক্তপাঠের সদস্য হওয়া, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ ইত্যাদি।

6। ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারনা চর্চা রাখা।

7। মাঝে মধ্যে শিক্ষার্থীদের দেখানোর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোকে সচেতনতা আনয়ন করা।

8। বিদ্যালয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট স্টেক হোল্ডারদেরকে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারে সচেতন করা।

9। বিভিন্ন চিঠির গোপনীয়তা রক্ষা করা।

10। শিক্ষক ও সংশ্লিস্টদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন করা।

11। শিক্ষকগণের নৈমিত্তিক ছুটি, মাতৃত্বকালীন ছুটি, চিকিৎসা ছুটি, বহি:বাংলাদেশ ছুটি, জিপিএফ লোন, পেনশন ইত্যাদির জন্য আবেদন প্রেরণ করা এবং বিনা হয়রানিতে অনুমোদিত পত্র বিদ্যালয়ে বসেই পাওয়া ইত্যাদি।

সীমাবদ্ধতাসমূহ:

1। প্রায় সকল বিদ্যালয়ে বিদ্যুতায়ন থাকলেও কিছু কিছু এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক দূর্বল।

2। সরকারিভাবে ল্যাপটপ, সাউন্ড সিস্টেম, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর পেলেও সকল বিদ্যালয়ে মডেম (কিছু সংখ্যক বিদ্যালয় পেয়েছে), প্রিন্টার, স্ক্যানার দেয়া হয়নি।

3। প্রতি বিদ্যালয় থেকে আইসিটি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক থাকলেও তারা চর্চার অভাবে ভুলে যাচ্ছে।

সুপারিশসমূহ:

1। দেশের সকল বিদ্যালয়ে ই-মেইল যোগাযোগ বাধ্যতামূলক করা।

2। কিছু কিছু এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক দূর্বল থাকলেও এনড্রয়েড ফোনের মাধ্যমে নিকটবর্তী র্সুবিধাজনক স্থানে গিয়ে ব্যবহার করা।

3। স্থানীয় অনুদান (কৃতি শিক্ষার্থী, এসএমসি, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, স্থানীয় ধনী ব্যক্তি থেকে প্রাপ্ত অর্থ) থেকে, প্রয়োজনে স্লিপ (বিদ্যালয় উন্নয়ন পরিকল্পনা) ফান্ড, রুটিন মেইনটেন্যান্স বরাদ্দ থেকে প্রিন্টার ও স্ক্যানার ক্রয় করে ব্যবহার করা।

4। বিদ্যালয়ের নামেই ই-মেইল খোলা যাতে শিক্ষকের বদলি হলে একই ই-মেইল ঠিকানা ব্যবহার করতে পারে।

5। উর্ধ্বতন দপ্তর থেকে সরকারি পরিপত্র, আদেশ, নির্দেশ, প্রজ্ঞাপন ও বিভিন্ন চিঠিপত্র শিক্ষা অফিসগুলোতে প্রেরণের সময় বিদ্যালয়ে এর কপি প্রেরণ করা।

6। ক্লাস্টারের সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারের নেতৃত্বে ইউনিয়ন পর্যায়ে শিক্ষক সমাবেশ করে অথবা প্রতি বিদ্যালয় থেকে 2 জন শিক্ষক (প্রশিসহ) কে বিনা খরচে প্রশিক্ষণ দিয়ে ই-মেইল খোলা, ব্যবহারের নিয়ম জানানোর ব্যবস্থা করা এবং উপজেলা পর্যায়ে মাসিক সমন্বয় মিটিং এ রিফ্রেশমেন্ট করা।

সুপারিশে উল্লিখিত উপায়ে মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার বুনাগাতী ক্লাস্টারে সেপ্টেম্বর-2019 মাস থেকেই ই-মেইলের মাধ্যমে তথ্য আদান প্রদান ইতোমধ্যে শুরু করেছি। শিক্ষকগণ সন্তুষ্টির সাথেই এগুলো ব্যবহার করছে। সরকারের বিবেচনায় আসলে সারাদেশে এ সুবিধা বিস্তরণের জন্য কর্তৃপক্ষকে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।

      লেখক : সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার, শালিখা, মাগুরা।