যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালের উন্নয়নে সফল ডা. লিটু

বিল্লাল হোসেন : যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালকে ঢেলে সাজানোর স্বপ্ন পূরণের মধ্য দিয়ে আজ শনিবার চাকরিজীবন শেষ করছেন ডা. আবুল কালাম আজাদ লিটু। তিনি ১ বছর ৮ মাস তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব পালনকালে হাসপাতালে ৫৫ প্রকারের উন্নয়নের মাধ্যমে রেকর্ড তৈরি করেছেন। এতো পরিমানে উন্নয়ন বিগত কোনো তত্ত্বাবধায়কের আমলে হয়নি বলে হাসপাতালের কর্মকর্তা কর্মচারীরা দাবি করেছেন। ডা. লিটুর আন্তরিক প্রচেষ্টায় সরকারি এ হাসপাতালে স্থাপন হয়েছে ডিজিটাল এক্সরে ও আল্ট্রাসনো মেশিন। এর সুফল পাচ্ছে রোগীরা। এছাড়া  অস্ত্রোপচার কক্ষে আধুনিক যন্ত্রপাতি, গাইনী বিভাগে জরায়ু ক্যান্সার নির্ণয়ে মেশিন স্থাপন করেছেন তিনি। অনুমোদন মিলেছে সিটিস্ক্যান মেশিনের। চলতি মাসেই সিটিস্ক্যান কার্যক্রম শুরু হবে। এছাড়া অবকাঠামো উন্নয়ন ও আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে হাসপাতালের প্রতিটি কোণে।

হাসপাতালের প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, ডা. আবুল কালাম আজাদ লিটু গত ২০১৮ সালের ৭ এপ্রিল এই হাসপাতালে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে যোগদান করেন। এরপর হাসপাতালের নানা সংকট চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানে শুরু করেন আপ্রাণ চেষ্টা। তিনি রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি হাসপাতালের উন্নয়নে জোরালোভাবে লেগে পড়েন। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতে থাকেন। ডা. লিটুর হস্তক্ষেপে বদলাতে থাকে হাসপাতালের চিকিৎসা পরিবেশ। রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সংযোজন হয় নানা রকমের ডিজিটাল যন্ত্রপাতি। তারই সাহসী ভূমিকায় অনুমোদনের সাড়ে ৪ বছর পর সেন্ট্রাল ক্যাশ কাউন্টার চালু হয়। হাসপাতালে প্রথমবারের মতো স্থাপন করা হয় হয়েছে ডায়াবেটিস নির্ণয়ের এইচ ডি এ ওয়ান সি মেশিন। এই মেশিনে  তিন মাসের  ডায়াবেটিস পরিমান নির্ণয় করা সম্ভব । বেসরকারি হাসপাতালে এই পরীক্ষা করতে রোগীদের ব্যয় হয় ১ হাজার টাকা। ডা. লিটুর প্রচেষ্ঠায় হাসপাতালের বর্হিবিভাগ ও সকল টয়লেটে টাইলস বসানো হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এসি ও ফ্রিজ যুক্ত হয়েছে। সুরক্ষিত বেস্টনি দিয়ে ২২ টি ফুলের বাগান সুসজ্জিত করা, বিভিন্ন স্থানে এলইডি লাইট বসানো, অযতœ অবহেলায় পড়ে থাকা ভেষজ বাগানের চারিপাশে প্রাচীর ও ১টি গেট নির্মাণ,শেড দিয়ে ডাস্টবিন তৈরি, হাসপাতালের বহিরাঙ্গনের আগাছা মুক্ত, হাসপাতাল অভ্যন্তরে অবৈধ বসবাসকারীরদের উচ্ছেদ, আই এমসি আই সেন্টাল চালু, করোনারি কেয়ার ইউনিটের সামনে ও স্টাফ কোয়ার্টারের সামনে আধুনিক গেট নির্মাণ, হাসপাতালের প্রবেশ গেটে নিয়ন সাইনের একটি নতুন সাইনবোর্ড বসানো, হাসপাতালের নিজস্ব ওয়েবসাইট চালু , উন্নতমানের একটি অ্যাস্বুলেন্সের ব্যবস্থা, দালালমুক্ত হাসপাতাল গড়তে ভ্রাম্যমাণ আদালতে নিয়মিত অভিযানের ব্যবস্থা, রোগী ও স্বজনদের সচেতন করতে  বর্হিবিভাগের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সাউন্ড বক্সের মাধ্যমে দালাল বিরোধী প্রচারণার ব্যবস্থা, তথ্য কেন্দ্র ও রিপোর্ট ডেলিভারি কাউন্টার, ব্লাড ব্যাংকের সচ্ছতা ফিরিয়ে আনা, হাসপাতালের বিভিন্ন কক্ষ নতুন করে ডেকোরেশন, শিশুদের জন্য যুক্ত করা হয়েছে পেডিয়াট্রিক কক্ষ, সেবিকাদের নির্দিষ্ট কক্ষ তৈরি, ভিডিও কনফারেন্স ব্যবস্থা, গাইনী ও পেইং বেডের সেবিকাদের স্টোর ও বসার ব্যবস্থা, মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী চলমান ডাস্টবিন বসানো, ১টি সাবমারসেবল টিউবওয়েল ও রোগীদের খাওয়ার পানি নিশ্চত করতে আর্সেনিকমুক্ত ৩ টি ডিপ টিউবওয়েল স্থাপন, প্রতিটি ওয়ার্ডে সুপেয় পানির ব্যবস্থা,  বর্হিবিভাগে রোগীদের বসার ব্যবস্থা, চিকিৎসকদের প্রাইভেটকার রাখার জন্য নির্দিষ্ট স্থান তৈরি, মোটরসাইকেল ও বাইসোইকেল রাখার সু ব্যবস্থা, অর্ধশতাধিক অক্সিজেন সিলিন্ডারের ব্যবস্থা, নার্সিং সুপারভাইজারদের রাত্রিকালীন বসবাসের জন্য আধুনিক কক্ষ নির্মাণ, সিটিজেন চার্টার ও দিকনির্দেশনা বিল, বাথরুমের সংখ্যা বাড়ানো,  ১টি নতুন জেনারেটরের ব্যবস্থা, তত্ত্বাবধায়ক, সহকারি পরিচালক ও কনফারেন্স কক্ষ আধুনকায়ন, টেলিফোন অপারেটরের জন্য ১ টি নতুন কক্ষ, বিভিন্ন স্বাস্থ্য বার্তা দিয়ে দেয়াল ও সিড়ি লিখন, মেরামত করে পুনরায় চালু করা হয় ১৬ সিসি ক্যামেরা,ডিজিটাল হাজিরা,  বিভিন্ন ওয়ার্ড ও বর্হিবিভাগে সিলিং ফ্যানের ব্যবস্থা, ইন্টানদের জন্য আলাদা কক্ষ তৈরি করে টেলিভিশন ও এসি স্থাপন,  লেবার ওয়ার্ডে রোগীদের সুবধার্থে ২টি এসি এবং ওষুধ সংরক্ষণের জন্য ১টি ফ্রিজ সরবরাহ, রোগীদের সুবিধার্থে হুইল চেয়ার ও ক্রাচের ব্যবস্থা, ডিজিটাল বোর্ড স্থাপন, কর্মচারীদের সংখ্যা বাড়ানো, হাসপতালের মধ্য থেকে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স স্ট্যান্ড উচ্ছেদ, ছাড়াও হাসপাতালের অবকাঠামো নানা উন্নয়ন হয়েছে। গত বছরের মার্চ মাস থেকে শুরু হয়েছে প্রশাসনিক ভবনের চতুর্থ তলা নির্মাণ কাজ। শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে হবে ৪ তলা বিশিষ্ট মাল্টিপারপাস ভবন। ডা.আবুল কালাম আজাদ লিটু জানান, ১৯৮৩ সালের ৮ নভেম্বর রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ইন সার্ভিস ট্রেনিং হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে চাকরি জীবন শুরু করেন। তার শেষ কর্মস্থল হলো যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল। এখানে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে যোগদান করার পর প্রথম লক্ষ্য ছিলো এই হাসপাতালকে মডেলে পরিণত করা। জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করেছেন। দীর্ঘ ৪ বছর পর চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়নে ব্যবস্থাপনা কমিটির আলোচনা সভার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিজ উদ্যোগে গঠন করেছি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা কমিউনিটি সাপোর্ট কমিটি।  ইন্টার্ন চিকিৎসক দিয়ে রোগীকে অন্যত্র রেফার্ড করা, মৃত্যু সনদ ও রোগীর ছাড়পত্র দেয়া প্রথা বন্ধ করা হয়েছে। তিনি আরো জানান, হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা, রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা, রোগীদের সন্তুষ্টি ও আস্থা অর্জন, চিকিৎসক, সেবিকা, কর্মকর্তা, ও কর্মচারীদের সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন, হাসপাতালের অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত, সৌন্দর্য বৃদ্ধিসহ স্বাস্থ্যসেবার সার্বিক দিকে বিশেষ অবদান রাখার কারণে সারাদেশের জেলা পর্যায়ে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল ৩য় স্থানে ছিলো। তার লক্ষ্য ছিলো কিভাবে ১ম স্থান অধিকার করা যায়। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন পরবর্তী কর্মকর্তা অবশ্যই এই বিষয়ে  জোরালো ভূমিকা রাখবেন। ডা. আবুল কালাম আজাদ লিটু জানান, দেশের সর্বত্র বিস্তার লাভ করেছে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার নেটওয়ার্ক। এমন মজবুত অবকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের মাত্রার ব্যাপক বিস্তার ঘটলেও যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের যন্ত্রপাতির মান ছিল ভিন্ন। তার আপ্রাণ চেষ্টায় এখানে ডিজিটাল যন্ত্রপাতির স্থাপনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মানুষ সরকারি এই হাসপাতালে ডিজিটাল মেশিনের সেবা পাওয়ায় তিনি খুশি। এসবের মধ্য দিয়েই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে তার চাকরিজীবনের।  তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন উন্নয়নের মানসিকতা থাকলে অবশ্যই সফলতা আসবেই।