একটি দুর্ঘটনায় নিভে গেলো দুইবোন ও ভাবির প্রাণ, পাল্টালো সব চিত্র

‘ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হলো না
পিয়াসার, অন্ধকারে বিয়ের আলোকসজ্জা ’
বিল্লাল হোসেন :
ডাক্তারী পরীক্ষা শেষ, ফলের অপেক্ষা, এরই মাঝে বিবাহোত্তর অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছে তনিমা ইয়াসমিন পিয়াসার (২৫) পরিবারে। ফুরফুরে মেজাজে স্বামীর সাথে সদ্য কেনা প্রাইভেটকারে বের হয়েছিল যশোর শহরে ঘুরতে। রাতের শহরের বৈচিত্র্যতার সাক্ষী হতে সাথে নেয় বড় বোন তানজিলা ইয়াসমিন (২৮) ও খালাতো ভাবি আফরোজা তাবাসসুম তিথিকে (২৮)। তিথির ছোট মেয়ে মানিজুরাও তাদের রাত ভ্রমণের সাথী হয়। স্বামী মটর পার্টস ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম জ্যোতিই ছিলেন ড্রাইভিং সিটে। পাশের সিটে ছিল স্বামীর দুই বন্ধু হৃদয় (২৮) ও শাহিন হোসেন (২৫)। পুরাতন কসবার নিরিবিলি পাড়ার আকিজ গলির মুখে আচমকা এক দুর্ঘটনায় বদলে গেছে সব ইতিহাস। ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে পরিবারের সব স্বপ্ন। দুর্ঘটনায় শুধু পিয়াসা না বোন তানজিলা ও ভাবি আফরোজা নিয়েছেন চিরবিদায়। নববধূ বেশে শ্বশুর বাড়িতে আনুষ্ঠানিক প্রবেশের জায়গায় পিয়াসাদের শব যাত্রায় অংশ নিয়েছে হাজারো মানুষ। ডাক্তার মেয়ের মা হওয়ার স্বপ্নে বিভোর মা রেহেনা আক্তার হিরা এখন নির্বাক। দুই সন্তানকে হারিয়ে পাগলপ্রায় বাবা ইয়াসিন আলী। ছোট্ট মেয়ে মানিজুরা হাজারো মুখের মাঝে শুধু মাকেই খুঁজে ফিরছে।
বছর দেড়েক আগে শহরের লোন অফিস পাড়ার শহিদুল ইসলাম ডাবলুর ছেলে ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম জ্যোতির সাথে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় বারান্দিপাড়া ঢাকা রোডের বাসিন্দা মেডিকেলের ছাত্রী তনিমা ইয়াসমিন পিয়াসার (২৫)। আগামী ২৩ জানুয়ারি তাদের বিবাহোত্তর অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। সেই অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছিল দুই পরিবারে। ২১ জানুয়ারি হবু ডাক্তার পিয়াসার গায়ে হলুদের প্রস্তুতিও সম্পন্ন হয়েছিল। চলছিল দাওয়াত কার্ড বিতরণ। শুক্রবার রাত সাড়ে ১১ টার দিকে বরের নতুন প্রাইভেটকারে চড়ে শ্বশুর বাড়ির আলোকসজ্জা দেখতে যান পিয়াসা। রাতের খাবার খাওয়ার পর শহর ঘুরতে যেয়ে আর ফিরে আসা হলো না তাদের। বাড়িতে ফিরেছে তিনটি তরতাজা লাশ। দুর্ঘটনার খবর জানার পরই দুই পরিবারের আনন্দ বিষাদে পরিণত হয়। পরিবারের লোকজন ও স্বজনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। নিহত পিয়াসা ও ইয়াসা শহরের পশ্চিম বারান্দীপাড়ার ইয়াসিন আলীর মেয়ে। নিহত অপরজন তিথি তাদের খালাতো ভাই মনজুর হোসেনের স্ত্রী। দুই মেয়েকে হারিয়ে শোকে পাগলপ্রায় ইয়াসিন। মেয়েকে ডাক্তার সাজে দেখার স্বপ্ন পূরণ হলো না তার। দুই মেয়েকে এক সাথে হারানোর কষ্ট সহ্য করতে পারছেন না মা রেহেনা আক্তার হিরা। হাউমাউ করে কাঁদছেন আর বলছেন “আমার দুই কলিজার টুকরোকে ছেড়ে আমি কি করে থাকবো। কে আমাকে মা বলে ডাকবে। আল্লাহ তুমি আমার সোনা পাখিদের শান্তিতে রেখো”। দুর্ঘটনা কবলিত প্রাইভেটকারটি দুমড়ে মুচড়ে গেছে। দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন, নিহত তিথির মেয়ে মানিজুরা (৩), লোন অফিসপাড়া আদর্শ বালিকা বিদ্যালয়ের সামনের বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম জ্যোতি, তার বন্ধু মৃত আবুল কাশেমের ছেলে হৃদয় (২৮) ও শেখহাটির শাহিন হোসেন (২৩)। প্রাইভেটকারের চালক জ্যোতিকে পুলিশ আটক করে পরে আদালতের মাধ্যমে জামিনে মুক্তি পায়।
নিহত পিয়াসা ও ইয়াসার চাচা আব্দুল কাদের জানিয়েছেন, আগামী ২৩ জানুয়ারি পিয়াসার বিবাহোত্তর অনুষ্ঠানের দিন ছিলো। জ্যোতির নিজস্ব প্রাইভেটকার চড়ে দাওয়াতের কার্ড পৌঁছে দিয়ে পিয়াসাসহ অন্যরা বাড়ির আলোকসজ্জা দেখতে যান। রাত ১টার দিকে শহর ঘুরতে যেয়ে তাদের প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রথমে রাস্তার পাশে বৈদ্যুতিক খুঁটিতে ধাক্কা দেয়। সেখান থেকে সরাসরি গিয়ে আঘাত হানে অবসরপ্রাপ্ত এক কাস্টমস কর্মকর্তার বাড়ির সীমানা প্রাচীরে। এতে ভেঙে যায় প্রাচীর ও বৈদ্যুতিক খুঁটি। ঘটে হতাহতের ঘটনা। যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত চিকিৎসক কাজল মল্লিক জানান, রক্তাক্ত অবস্থায় ৬ জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে আনা হয়। পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা যায় পিয়াসা, ইয়াসা ও তিথী হাসপাতালে আনার আগেই মারা গেছেন। অন্যদের ভর্তি করে চিকিৎসার জন্য সার্জারি ওয়ার্ডে পাঠানো হয়। সার্জারি ওয়ার্ডে দায়িত্বরত চিকিৎসক সুব্রত দেবনাথ জানান, হৃদয় ও শাহিন হোসেনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তাদের অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক ছিলো। এদিকে পিয়াসার মৃত্যুর খবর শুনে শেষ বারের মতো তাকে দেখতে হাসপাতাল মর্গে আসে সহপাঠীরা। সহপাঠীরা জানায়, তনিমা ইয়াসমিন পিয়াসা যশোর আদ্-দ্বীন সকিনা মেডিকেল কলেজে লেখাপড়া করতেন। গত ১৩ জানুয়ারি (সোমবার) তার চূড়ান্ত (পপ) পরীক্ষা শেষ হয়। ডাক্তারী পাস করার রেজাল্টের অপেক্ষায় ছিলেন। বারান্দীপাড়ার বাসিন্দা হাজি সালাউদ্দিন জানান, পিয়াসা ও ইয়াসা সবার সাথে মিষ্টি করে কথা বলতেন। প্রতিবেশীরা সবাই তাদের ভালোবাসতেন। এক সাথে দুইবোনের মৃত্যু সত্যিই কষ্টদায়ক। নিহতের স্বজন যশোর মটর পার্টস ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহিনুর রহমান ঠাণ্ডু জানিয়েছেন, ২০১৮ সালের ২৭ জুলাই জ্যোতির সাথে পিয়াসার বিয়ে হয়। গায়ে হলুদ ও বিবাহোত্তর অনুষ্ঠান উপলক্ষে দুই পরিবারে আনন্দ উৎসবের পরিবর্তে এখন আহাজারি চলছে। নিহত দুইবোনের বাড়িতে গিয়ে হৃদয় বিদায়ক দৃশ্য চোখে পড়ে। শোকাহত পিতামাতাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে প্রতিবেশী ও স্বজনেরা। কাঁদতে কাঁদতে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। বাড়িতে শোকের মাতম চলছে। তাদের বুকফাটা কান্নায় অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
যশোর কোতয়ালি মডেল থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) তাসমীম আলম জানান, পুলিশ ৯৯৯-এ সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। রাতেই প্রাইভেটকারের চালক জ্যোতিকে আটক করা হয়। এই ঘটনায় এসআই মোখলেছুজ্জামান বাদী হয়ে থানায় মামলা করেছেন। যার নম্বর ৫৯। মামলায় বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর অপরাধে আসামি করা হয়েছে জ্যোতিকে। স্বজনদের কোনো অভিযোগ না থাকায় ময়না তদন্ত ছাড়াই শনিবার দুপুরে ৩ জনের মৃতদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এশা নামাজের পর নিহত ৩ জনের জানাজা শেষে কারবালা কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে।