কোভিড ১৯


শাহনাজ পারভীন:

সারারাত ভাল ঘুম হয় নি মোমেনার। এ পাশ ওপাশ করেছে নির্ঘুম। সারা গা হাত পায়ে ব্যথা। জ্বর জ্বর ভাব। গায়ে বল পাচ্ছেনা মোটেই। কি এক অস্বস্তিতে এই ঘুম, এই জাগরণে। আধা ঘুম, আধা জাগরণে মহা বড় রাতটা যেন কাটলো। দূর থেকে ভেসে আসছে মুয়াজ্জ্বিনের আযানের ধ্বনি। ‘হাইয়া লাস সালাহ। হাইয়া লাল ফালাহ। আসসালাতু খাউরুম মিনান নাউম’। কানে আযানের মধুর ধ্বনি পৌঁছাইতে না পৌঁছাইতে গভীর ঘুমে চোখ আটকে যেতে চায় মোমেনার। ও জানে, ছোটবেলায় মুরব্বীদের কাছ থেকে শুনেছে, আসলে শয়তান এই সময় গা হাত পা টিপে ঘুম পাড়াইয়া দেয়। মানুষ যেন নামাজ না পড়বার পারে। কিন্তু ও প্রাণপন জেগে থাকার চেষ্টা করে। দূরের মেহগণি বনে কিছু রাত জাগা পাখির কিচিরমিচির, বিদ্যুতের খুঁটিতে কাকের তারস্বরের চিৎকার মোমেনাকে ঘুমাতে দেয় না। ছোটবেলা থেকেই ওর অভ্যেস গ্রামের সেই মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙা। এই শহরের বস্তিতে তো আর মোরগের ডাক শোনা যায় না। ভোর না হতেই কাকের ডাকে কান ঝাঁলাফালা। এমনিতেও ও প্রতিদিন ভোর করেই উঠে পড়ে। অনেক বাসায় ঠিকা কাজ করে। তবে প্রথমেই কাজে যায় প্রফেসর ম্যাডামের বাড়ি। ভোর ফুটতে না ফুটতেই প্রতিদিন হাজির হয় মোমেনা চাচী। মেইন গেটের চাবি চাচীর কাছেই আছে। তবে ম্যাডামের ফ্লাটের দরজার লক ম্যাডাম নামাজ পড়তে যাবার সময় খুলে রাখে। ও আস্তে করে ঢুকে পড়ে। প্রথমেই ঘন দুধ চা বানায়। বিস্কিট কলা, আপেলসহ ম্যাডামের খাটে ওর চায়ের ট্রে দিয়ে মোমেনাও চা বিস্কিট খায়, কাজ শুরু করে। ম্যাডাম চা খেয়ে ঢুকে পড়ে তার লেখার ঘরে। তাকে আর দুই ঘন্টা ডিস্টার্ব করা যায় না। ঐ সময় কারো সাথেই কোন কথা বলেন না তিনি। মোমেনাও নিজের মতো কাজ করে। সমস্ত কাজ শেষ করে,
সারাদিনের রান্না শেষে ম্যাডামের সকালের নাস্তা টেবিলে দিয়েই মোমেনার কাজ শেষ হয়। সারাদিন আর আসে না। কতদিন ম্যাডাম তাকে বলেছে-
সন্ধ্যায় আসো। চা নাস্তা বানাও। খাও। যত টাকা চাও দেবো। আমার বাসায়ই শুধু কাজ করো। অন্য কোথাও দরকার নেই। কিন্তু কে শোনে কার কথা?
ওর এক কথা বস্তা বোঝাই টাকা দিলেও হবে না। সারাদিন বাসায় কেউ থাকে না। আমি একলা একলা বাসায় থাকতে পারবো না। আপনার সারাদিনের কাজ তো সকালেই হয়ে যায়, সারাদিন আমার কী কাজ? তাছাড়া ও জানে, আরও পাঁচ বাসায় কাজ করলেই আমার সুবিধা। মোমেনার ছেলে মেয়ে নেই। বুড়ো বর। কাজ করে না কোনো। ওর আয়েই দুইজনের চলে যায়।
ম্যাডাম খুব ভাল মানুষ। তিনি একজন লেখিকা। কলেজ শেষে দিনরাত নিজের পড়ালেখার ঘরে থাকেন। নাম ড. শায়মা চৌধুরী। দেখতেও তেমনি চৌকস। দুধে আলতা রং, টিকালো নাক, ঈগলের ডানার মতো ভ্রু। কোমড় অবধি ছলাৎ ছলাৎ লম্বা চুলের ঝরনা। তবে নিরহঙ্কার। মানবিক, মায়াবি। তিনি মোমেনাকে চাচী বলে ডাকেন। ওর বিপদ, আপদ, রোগ শোক নিজের মতো করেই দেখেন। যখন তখন হাতে বাড়তি টাকা ধরিয়ে দেন। বাড়তি রান্নাবান্নাও মোমেনার জন্য বরাদ্দ থাকে। ও তাই কাজ কামাই করে না। বাধ্য হয়ে তাই আজও সকালে জ্বর জ্বর ভাব নিয়েই কাজে ঢোকে মোমেনা চাচী।
প্রতিদিনের মতো চায়ের ট্রে বিছানায় দিতেই হঠাৎ কাঁশিতে চায়ের কাপটা ছলকে ওঠে। হাতটা কেঁপে ওঠে অল্প।
–কি হলো চাচী?
ম্যাডামের গলা যেন তারচেয়েও বেশি জোরে কেঁপে ওঠে। ফের আতংকিত চেঁচিয়ে ওঠে যেন,
–কী হয়েছে তোমার চাচী?
চাচী ম্যাডামের এমন শঙ্কাময় কণ্ঠ শুনে হকচকিয়ে ওঠে আবারও-
–ও কিছু না, মা। রাতে একটু জ্বর আইছে। কাশির জ্বালায় ঘুমাইতে পারি নাই সারারাত। গলা ব্যথা।
চাচী ভুল করেই যেন, ম্যাডামকে মা ডেকে ফেলে। তাকে তার মেয়ে মনে হয়। মনে হয়, তারও যদি যোগ্য সময়ে একটা অন্তত মেয়ে হইতো, তো ঠিক এইরম ম্যাডামের বয়সেই হইতো। মোমেনা ম্যাডামের বয়স জানেনা। ম্যাডাম নিয়ম মত ব্যায়াম করে, ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া, ঘুম, শরীরের কত যত্ন! ও বোঝে না, ম্যাডামের আসলে বয়স কতো। অনেক পড়ালেহা জানা। বিদেশতন পড়া মানুষ। কত্তো বড় মানুষ। বই লেহে। সেই বই আবার স্কুল, কলেজে পড়ায়। যেহেতু উনি তাকে চাচী বলে ডাকে তাই তার অন্তরের গোপন স্থান থেকে সে তাঁকে মেয়ে ভাবে। কিন্ত সবাই যখন তারে ম্যাডাম বলে ডাকে, আর কাজ ঠিক করবার সময় দারোয়ান যেহেতু ম্যাডাম বলেছে, তাই মোমেনাও তাকে ম্যাডাম বলে ডাকে। তবে কখনো কোন আতঙ্কে, কিংবা খুশির খবরে মা বলে ডেকে ওঠে। তেমনি ঠিক আজও। যখন ওর জ্বর আর কাঁশির কথা শুনে ম্যাডাম চিন্তায় পড়ে যায়, তখন ওর ও তখন ম্যাডামকে নিজের মেয়ে মনে হয়। মা বলে ডেকে তাই নিজেই সংকোচে লজ্জ্বায় দূরে সরে যায়।
— ঠিক আছে, দেখি কত জ্বর? হাত বাড়িয়ে দেয় ম্যাডাম। সহসা কী মনে হতেই আবার সে হাত গুটিয়ে নেয়। মোমেনার এগিয়ে আনা বাড়ানো কপাল শেষ পর্যন্ত ছোঁয় না। —
— ঠিক আছে তুমি ও ঘরে যাও। আমি দেখছি।
পর মুহূর্তে মোমেনাকে ডেকে টেবিলে রাখা পাঁচশ টাকার নোটটা নিতে বলে তাকে ছুটি দিয়ে দেয়।
–শোনো, এক সপ্তাহ তোমার ছুটি। কারো ঘরে যাবে না। কাউকে ছোবে না। সব সময় সাবান দিয়ে হাত ধোবে। আজই হাসপাতালে যাবে। ঘর থেকে বের হবে না।
ম্যাডামের মুখে এক নাগাড়ে এতগুলো কথা শুনে এবার মোমেনা ভয় পেয়ে যায়।
-রান্না বসাইছি চুলায়। রান্নাডা শ্যাস কইরা যাই?
–না, লাগবে না। আমি দেখছি। তুমি সোজা তোমার বাসায় চলে যাও। কোনো বাসায় আজ আর কাজে যাবে না। সোজা হাসপাতালে যাও।
–আম্মা, কালকে সবাই কী জানি কচ্ছিলো। করুনা, না কী যেন। জ্বর, কাঁশি বার হইছে। সারা দুনিয়ায় নাকি হাজার হাজার মানুষ মরতেছে। আমেরিকাও নাকি হইছে?
— করুণা না, করোনা ভাইরাস। কে বললো তোমাকে?
–ঐ আমার বাড়িয়ালী কচ্ছিলো। টিপিতি সবাই দেখছে। আমার জ্বর শুনে কচ্ছিলো যে, বিদেশ তে কি কেউ আইছে, তোমাগো ম্যাডামের বাড়ি? আমি কইছি, না। কেউ আসে নাই। অন্য কোন বাসায়, কোন বাড়ি।
— ঠিক আছে, তুমি এখন যাও। কারো বাড়ি যাবে না। কাউকে ছোঁবে না। হাসপাতালে যাও। আমি বিকালে তোমাকে ফোন দিয়ে জেনে নেবো।
–আম্মা কলেজ কী বন্ধ? আপনি একা একা কেমনে কী করবেন?
— ঐ নিয়ে তুমি চিন্ত করো না। আমি দেখছি।
না, মোমেনা চাচীর খারাপ কিছু হয়নি। আলহামদুলিল্লাহ। সিজোনাল জ্বর, কাঁশি। হাসপাতাল থেকেও জিজ্ঞেস করেছে, বিদেশ থেকে কেউ আসছে কী না? এক সপ্তাহের ঔষধ দিয়ে দিয়েছে।
ওকে ছুটি দিয়ে দিয়েছে অন্য সব বাসাবাড়ি থেকে। অবশ্য ও ছুটি চায় নি। ছুটি হলেই তো সমস্যা। যদিও বেতন কেউ কাটবে না। কিন্তু খাওয়া দাওয়া? সে তো আর পাওয়া যাবে না। ঘন দুধ চা, ঘিয়ে ভাজা পরোটা। বড় বড় মাছের পিস, গোস, বাসি তরকারি, সবজি। সবকিছুই তো প্রতিদিন বাসাবাড়ি থেকে আনতো। সেইটা বন্ধ। তাই মোমেনার দিন ভাল কাটছে না। যদিও কাজের তাড়া নেই। আয়েশে আছে, আরামে আছে। তবে খালি পেটে আর কাহাতক ভাল লাগে। ছোটা কাজের ঐ এক লাভ। যে বাড়ি যায়, সে বাড়িতেই কিছু না কিছু পায়। সেটা বন্ধ। তবে নিজের রান্না নিজেরা করে খাচ্ছে। সেও আর এক সুখ।

এদিকে ম্যাডামের দিনও কাটছে নির্জলা অবসরে। কলেজ বন্ধ। কাজের মেয়ে থেকে শুরু করে সমাজ, রাষ্ট্র, দেশ, বিদেশ, সারা পৃথিবী এখন তার চিন্তার বিষয়।
পঁচিশ বছরের আগের জীবনে ঢুকে যায় যেন। অখ- সময়, পছন্দের রান্না– বান্না, ঘর দোর পরিষ্কার করা, দোর অবশ্য নেই- লম্বা ব্যালকনি, ছাদ, পর্যাপ্ত গাছ, ফুল। টিভি দেখে, খবরের কাগজ পড়ে, নামাজ–কালাম, ফেসবুক, টুইটারে। লিখে, পড়ে, আতংকে, ভয়ে, মহান আল্লাহর
কাছে প্রার্থনায়।
প্রতিদিন লাফিয়ে লাফিয়ে চলছে মৃত্যূহার। ব্রিটেনের প্রিন্স চার্লস, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনসহ প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ নোবেল করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। যদিও এই ভাইরাসের উৎপত্তি চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে। ২০১৯ সালের নভেম্বরে প্রথমবারের মতো করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হন। ওই শহরে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের বাস। উহানের সামুদ্রিক খাবার বিক্রির একটি পাইকারি মার্কেট থেকে এই ভাইরাস দ্রুত চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একই সঙ্গে নতুন কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ে এবং যার বিস্তার রোধ করা সহজে সম্ভব হয় না বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সেই রোগকে মহামারি হিসেবে ঘোষণা করে।

এতসব নেগেটিভ খবরের ভিড়ে হঠাৎ একটা আশ্চর্যজনক খবরে চোখ আটকে গেলো ড. শায়মার।
প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য চীনের উহান শহরে জরুরি ভিত্তিতে নির্মিত লেইশেনশান হাসপাতালের মতো দেশেও এমন একটি হাসপাতাল তৈরি হচ্ছে! তবে সরকারি নয়, ব্যক্তি উদ্যোগে। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অস্থায়ী এ হাসপাতালটি তৈরি করছেন দেশের শীর্ষ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান আকিজ গ্রুপের এমডি শেখ বশির উদ্দিন। তিনি নিজ উদ্যোগে দুই বিঘা জমিতে চীনের মতো করে করোনার চিকিৎসার জন্য এটা করছেন। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে হাসপাতালটি তৈরি শেষ হবে। সেই সঙ্গে পরবর্তী এক সপ্তাহের মধ্যে সরঞ্জাম বসানো হবে। এরপর বিনামূল্যে করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হবে। ড. শায়মা ভীষণ আশ্চর্য হন এই খবরে। যেখানে এদেশে চিকিৎসকদের জন্য পর্যাপ্ত পিপিই নেই, করোনা পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কিট নেই, সেখানে পুরো আস্ত একটি হসপিটাল! যাক! আশান্বিত হওয়ার মতো খবর! হা! এগিয়ে যাও বাংলাদেশ! হৃদয়ের গভীর থেকে যেন একটি সুখ নিঃশ্বাস বের হয়ে আসে।

আজ শুক্রবার পর্যন্ত বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা ৪৮ এবং মারা গেছে ৫ জন। সুস্থ হয়ে বাড়িতে গেছেন পাঁচ জন। বিশ্বব্যাপী আক্রান্ত হয়েছে সাড়ে পাঁচলাখ মানুষ।

দেশ এখন কার্যত অচল। করোনা ভাইরাসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সরকারি, বেসরকারি অফিস দশদিন বন্ধ। বন্ধ আন্তর্জাতিক ফ্লাইট, অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট, ট্রেন, গণ- পরিবহন, নৌযানসহ বিপনি বিতান, মার্কেট সব। এইস, এস, সি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত। এমন ভাবে অচল দেশ সমসাময়িক সময়ে কেউ দেখে নি। শুধু দেশ কেন, বলতে গেলে পুরো বিশ্বই এখন লকডাউন। শুধুমাত্র গণমাধ্যম বন্ধ হয় নি। নিরবিচ্ছিন্নভাবে চলছে তার কার্যক্রম। মানুষ চোখ মেলে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সারা পৃথিবীর খবরাখবর তার কাছেই! কিন্তু এই সমস্ত গণমাধ্যম কর্মীদের নিরাপত্তা ঠিক আছে তো! মহান আল্লাহ তুমি সবকিছু রক্ষা করো নিজ করুনায়।
– কি হলো বলো তো?
শায়মা প্রশ্নাবদ্ধ দৃষ্টিতে তার স্বামী মি. কায়েসের দিকে চোখ বাড়ায়-
– কি আর হবে? যা হবার তাই! একশ বছর পর পর প্রকৃতির এই প্রতিশোধ পৃথিবীতে নেমে আসে; ১৭২০, ১৮২০, ১৯২০, এরপর ২০২০। প্রকৃতি গুছিয়ে নেয় তার শরীর। ক্রমাগত পলিউশান, হিমালয়ের বরফ গলে যাওয়া, বাতাসে শিসা, কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেনসহ বিষাক্ত গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, সবুজ বেষ্টনী ভেঙ্গে ফেলা, মারণাস্ত্র, যুদ্ধ, বিগ্রহ, হিংসা, ধ্বংস সবকিছুর প্রতিবাদে পৃথিবী আটকে গেছে লকডাউন আর কোয়ারাইন্টনে। ম্যালথাসের সূত্র পড়েছো তো?

– সত্যি, তা বলেছো ঠিক কথা। একটি সময়ের পর প্রকৃতি নিজেই তার প্রতিশোধ নিয়ে নেয়। পৃথিবীর ওজন স্তর আজ হুমকির মুখে। তার ও তো বিশ্রামের প্রয়োজন, না কি?
– সেও গুছিয়ে নিচ্ছে তার শরীর কাল বৈশাখীর তা-বের মতো, ভাইরাসের প্রভাবে। নতুন করে সাজিয়ে নিতে ব্যস্ত সময় পার করছে সে। রাস্তা ঘাট ফাঁকা, জন জীবন ঘরে বন্দি। আকাশও মুক্ত। সেখানেও চলছেনা কোনো আকাশযান। আর একটি যুদ্ধ মোকাবেলা করছে বিশ্ব। এ যুদ্ধ ঘরে থাকার যুদ্ধ, এ যুদ্ধ একা থাকার যুদ্ধ। তাহলেই প্রত্যেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে বলে মনে করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ।

– তুমি ঠিকই বলেছো। এখন আমরা যতটা ঘরে থাকতে পারবো, ততটাই নিরাপদ থাকতে পারবো।
– এর মধ্যেই বেজে ওঠে কলিংবেল।
– দেখো তো কে এলো? এত সকালে? মোমেনা চাচী কি না? নিষেধ করে দিও। আপাতত দরকার নেই।
– হুম, তুমি ঠিক ধরেছো।
– নিষেধ করে দিয়েছো?
– হুম। বলেছি, সময় হলে ফোন দিয়ে জানাবো।
– আসলে ওদেরও সমস্যা। নানান রকম। ঘরে থাকলে তো আর ওদের চলবে না।
– ঠিকই বলেছো। আমাদেরও কী চলছে? মনে হচ্ছে যেন, ট্রেনে বসে আছি। মাঝে মাঝে দরজা খুলে বাইরে একটু উঁকি দিচ্ছি। আবার সিটে এসে বসছি।
– তফাৎ শুধু এই, কোথাও যাওয়া হচ্ছে না। সেই বনি ইসরাঈলদের মতো একই জায়গায় দিনের পর দিন।
– তা বলেছো ঠিক। আজ কিন্তু আমি জুমআর নামাজ পড়তে যাবো।
– প্লিজ, ছেলেমি করো না। আজ সাপ্তাহিক নামাজীরা আসবে। ভিড় হবে। গায়ের মধ্যে গা দিয়ে দাঁড়াবে। ইচ্ছে করলেও তুমি নামাজের মধ্যে তিন ফুট সরে দাঁড়াতে পারবে না।
– মঈন চুপ করে থাকে। শায়মার যুক্তির কাছে কোনো কথা খুঁজে পায় না। কিন্তু ভীষণ মন খারাপ হয়। ঠিক ঠিক গোছল করে ইস্ত্রি করা পায়জামা পাঞ্জাবি পরে আতর সুবাস মাখে, অতঃপর নিজের ঘরে সময় নিয়ে জোহরের নামাজ পড়ে।

শায়মা উঁকি দিয়ে দেখে মন খারাপ করে। ও ওর দাদীর কাছ থেকে শুনেছে, আগের দিনে নানান মহামারী তাড়াতে গ্রামের লোকজন আগুন জ্বালিয়ে, আযান দিয়ে গ্রাম বন্ধ করে দিতো। মনে করা হতো গ্রামে আর ঢুকতে পারবে না কলেরা, বসন্ত, প্লেগসহ নানান মহামারির ভাইরাস। কিন্তু সময় তো পাল্টেছে এখন। এতো আর নির্দিষ্ট কোন গ্রাম বা এলাকা নয়। গ্লোবাল ভিলেজের কল্যাণে পৃথিবীময় আজ মহামারির শিকার। আগুন কিংবা আযানে ঐক্যবদ্ধ হওয়া যাবে না। আজ একা একা। ঘরের মধ্যে হোম কোয়ারান্টাইন, লকডাউন কিংবা আইসোলেশান যাই বলি না কেন, তাতেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে নিজেকে।
এ অবস্থায় স্বশরীরে অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াবার সুযোগ নেই। পাশের ফ্লাটে কী হচ্ছে তাও জানবার সুযোগ নেই। টিভিতেই এখন ভরসা। ফেসবুক, টুইটার, গুগোল, ইউটিউব এখন মানুষের নিত্যসঙ্গি। শোক করার কোন সুযোগ নেই।
লাশের ওপর আছড়ে পড়ে কান্নার সুযোগ নেই। ক্রেনে করে লাশ নামানো হচ্ছে কবরে। আমেরিকা প্রবাসী কবি বন্ধু রওশন হাসানের কল্যাণে দেখা গেল জ্যামাইকা বসবাসরত ৩৮ বছর বয়স্ক বাংলাদেশী নারী আমিনা ইন্দালিব তৃষা তিন সন্তানের জননীর করোনায় আক্রান্ত মৃত্যূ পরবর্তী সব ছবি। আহা! তবে ড. শায়মা এর মধ্যেই ঘরে বসে যতটুকু সাহায্য সহযোগিতা করা যায় তা করছেন। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক সংগঠনসহ ব্যক্তি পর্যায়ে নানান ভাবে তিনি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। প্রতিদিনই তিনি এই কাজটি করছেন অত্যন্ত নিষ্ঠায়। ছোঁয়াছুঁয়ি না করেই দুরত্ব বজায় রেখেই তিনি কাজটি করবার একটা যথার্থ উপায় তিনি বের করেছেন।
বাংলাদেশের অবস্থা এখন বেশ ভালো। গত চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে নতুন কোনো রুগী শনাক্ত হয় নি। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে পাঁচজন। বাহ! খবরটায় মনে এক অন্য রকম শান্তি ফিরে পায় যেন। ফেসবুকের ওয়ালে ওয়ালে একটি ভেসে বেড়ানো ছবি দেখে ড. শায়মার আবারও মন খারাপ হয়। মনিরামপুরের এসি ল্যা- সাইয়েমা হাসান মুখে মাস্ক না রাখার অপরাধে বাবার বয়সী মুরুব্বীদের কান ধরে ওঠবস করাচ্ছেন এবং চরম পাশবিকতায় স্বয়ং সেই ছবি নিজ মোবাইলে ধারণ করছেন। তার পাশের ছবিটি সাংস্কৃতিক কর্মীদের। শহরের হরিজন পল্লীতে যেয়ে নিজ হাতে তাদের মাস্ক পড়িয়ে দিচ্ছেন। সেনিটাইজার দিয়ে হাত জীবানুমুক্ত করা শিখাচ্ছেন।
আহা! এমন যদি হতো যে, ঐ সমস্ত আমলাদের হাতে মোবাইলের পরিবর্তে মাস্ক, সেনিটাইজার, খাবারের প্যাকেট থাকতো। এবং চরম পাশবিকতার পরিবর্তে পরম মমতায় তাদের নাকে মাস্ক পরিয়ে হাত জীবানুমুক্ত করে অন্তত দশদিনের খাবার ধরিয়ে দিতো! তাহলে! কল্পনার দৃষ্টিতে এমন একটি পরিচ্ছন্ন দেশের ছবি দেখতে দেখতে আনমনা হয়ে যান ড. শায়মা। তাদের অন্তত এটুকু মনে রাখা প্রয়োজন যে, এই সমস্ত খেটে খাওয়া মানুষের শ্রম আর ঘামের টাকা থেকেই মাসে মাসে তাদের বেতন আসে। সাধারণ মানুষের ট্যাক্স আর ভ্যাটের টাকায় এই দেশ চলে। অথচ তাদের এই দুর্গতি আজ।
দেশের এই দুর্যোগের সময়ে
বড় ভাই–ভাবীর সাথেও কথা হচ্ছে নিয়মিত। বোনদের সাথে কথা বলে খোঁজ খবর নেওয়ার পাশাপাশি আত্মীয় স্বজনদের খোঁজ নেওয়াও একটা রুটিনে দাঁড়িয়েছে ড. শায়মা চৌধুরীর।
–এই শোনো
বরকে ডাকতে থাকে সে।
কোনো সাড়া না পেয়ে বেডরুমে যেয়ে দেখে নাতি নাতনী মেয়ে জামাইদের সাথে সে ভিডিও কলে কথা বলছে। অতঃপর সে তার ছেলের ঘরে সাবধানে ঢোকে। তার একমাত্র ছেলে একটি প্রথম শ্রেণীর স্টাটাসের বেসরকারী ইউনিভার্সিটিতে সিভিল এ- ইনভার্নমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। এই ছুটিতে সে বাড়িতে এখন। আজ থেকে শুরু হয়েছে তার গুগোল ক্লাসরুমে, অনলাইন ক্লাস। এই বন্ধে তাদের ক্লাস যেন বন্ধ না হয়, সেজন্যই ভার্সিটি কর্তৃপক্ষ তাদের রুটিন অনুযায়ী আজ থেকে ক্লাস শুরু করেছে। সেই ক্লাসে ছেলে এনগেজ্ড।
আর এরই মধ্যে ড. শায়মার ফোনটা বেজে যায় অনর্গল। স্ক্রলে ভেসে ওঠে জ্যামাইকা প্রবাসী তার ভাইয়ের হ্যাপী ফ্যামিলির নম্বরটি। ভাই ভাবীর মুখে শোনে, অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থা অনেক ভালো। মোবাইলে ভাই ভাবীর ভিডিও কলে শায়মার মনটা শান্তিতে ভরে ওঠে। ওর চিন্তা ভারমুক্ত হয়ে ওঠে। কোথায় আমেরিকা, কোথায় কানাডা, কোথায় ঢাকা এবং বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত জেলা শহর যশোর। সব এক সুত্রে হ্যাপী ফ্যামিলিতে গাঁথা। ডিজিটালাইজড বাংলাদেশের কল্যাণে আজ সব সম্ভব হয়েছে ! ও দিব্য চোখে দেখতে পায় ক্ষুধা, দারিদ্র, রোগমুক্ত, শতভাগ শিক্ষিত, সংগ্রাম মুখর আগামী বাংলাদেশের এক নির্মল চিত্র। তাই অন্য এক সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের স্বপ্নে ওর মনটা বিভোর হয়ে যায়। ও ফুটতে থাকে ব্যালকনিতে ফুটে থাকো থোকা থোকা লিলির মতো। রাধাচুড়ার রঙে, বাতাসে দুলতে থাকে অনবরত।

এম/এস-২৯/২০২০