কাজ পাগল সুমী মজুমদারের গল্প

 

এম আলমগীর, বাঁকড়া (ঝিকরগাছা) : ৬ মাসের শিশু সন্তানকে রেখে যশোরের ঝিকরগাছাকে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে দিন-রাত পরিশ্রম করছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমী মজুমদার। করোনা প্রতিরোধে সরকারের পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নের জন্য তার কার্যক্রম সাধারণ মানুষের নজর কেড়েছে।

উপজেলা পরিষদ সূত্রে জানা যায়, করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ করার জন্য সরকারের নিদের্শনা মোতাবেক ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে উপজেলা প্রশাসন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমী মজুমদারের নেতৃত্বে ২৩ মার্চ করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ও প্রতিরোধসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনার লক্ষে ১০ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি করা হয়েছে। এছাড়া পৌরসভা ও ১১ টি ইউনিয়নে ইউপি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একজন কলেজ প্রতিনিধি, একজন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতিনিধি, ২ জন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, ২ জন স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, স্বাস্থ্য পরিদর্শক, সকল ইউপি সদস্য, সকল সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য ও ইউনিয়ন পরিষদের সচিবের সমন্বয়ে একটি করে ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। উপজেলার সকল জায়গায় মাইকিং, ইসলামী ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে প্রায় ৫শ মসজিদের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় ঈমামদের করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের নিয়মগুলোর আলোচনা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সচেতনতার লক্ষে উপজেলার প্রত্যেক বাজারে লিফলেট, ফেস্টুন ও ব্যানার দেয়া হয়েছে। সেনাসদস্য ও পুলিশ সাথে নিয়ে জনসমাগম এড়ানো ও দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক রাখার জন্য নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। সরকার প্রদত্ত ১০ মেট্রিক টন চাউল, আলু, মুসুরির ডাল ও সাবান উপজেলার এক হাজার গরীব ও দুস্থ মানুষের বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। ঝিকরগাছা বাজারসহ বিভিন্ন বাজার ও রাস্তায় জীবাণুনাশক স্প্রে করা হয়েছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং জনসমাগম এড়ানোর জন্য যে জায়গা থেকে যখনই মোবাইল আসছে, তাৎক্ষণিকভাবে তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন। কখনও তিনি নিজে জায়গায় উপস্থিত হচ্ছেন, তা না হলে দ্রুত পুলিশ পাঠিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন।

এছাড়া তিনি নিজস্ব উদ্যোগে লিফলেট আকারে একটি বিশেষ ঘোষণা  বের করেছেন। তাতে ৮ টি নিদের্শনা প্রদান করা হয়েছে। নিদের্শনায় উল্লেখ করা হয়েছে, বিদেশ ফেরত প্রত্যেক ব্যক্তিকে ১৪ দিন অবশ্যই নিজ কক্ষ থেকে বের হতে পারবে না। তাদের পরিবারের সদস্যবৃন্দ তার থেকে আলাদা থাকবেন। তার থালা, বাটি, গ্লাস, কাপড়সহ অন্যান্য ব্যবহৃত জিনিসপত্র আলাদা করে রাখতে হবে এবং ঐ পরিবারের সদস্যবৃন্দ মসজিদসহ কোন ধরনের লোক সমাগমে যেতে পারবে না। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত উপজেলায় সকল প্রকার গণজমায়েত, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সমাবেশ না করার জন্য নির্দেশ প্রদান। প্রয়োজন ছাড়া জনসাধারণকে বাড়ি থেকে বের না হওয়ার জন্য অনুরোধ এবং যত্রতত্র বাজার, মোড় বা দোকানে অযথা আড্ডা বা বসে এবং যে কোন ধরনের খেলাধুলা করা নিষেধ। চায়ের ষ্টলসহ যে কোন ধরনের দোকানে টিভি ও বসার বেঞ্চ সরিয়ে রাখা একং দোকানে সামনে সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ রাখতে হবে। উপজেলার সকল স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কোচিং সেন্টার বা ব্যাচের ছাত্র পড়ানো বন্ধ ঘোষণা। এ সকল নির্দেশনা না মানলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। কোন ব্যক্তি এই নির্দেশ অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, নিকটবর্তী পুলিশ কেন্দ্র ও স্বাস্থ্যকর্মীকে অবহিত করতে হবে। এবং যে কোন বিষয়ে সহযোগিতার জন্য নিয়ন্ত্রণ কক্ষ বসানো হয়েছে।

সুমী মজুমদার নেত্রকোনা জেলা বারহাট্টা উপজেলা শহরের রনজিৎ কুমার মজুমদারের কন্যা। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ২ সন্তানের জননী। তিনি ২৯ তম ব্যাচের বিসিএস (প্রশাসন) উত্তীর্ণ হয়ে  ২০১১ সালের ১ আগস্ট সহকারী কমিশনার পদে নোয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যোগদান করেন। মাগুরা জেলার শালিখা থেকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসাবে ২০১৯ সালের ১১ জুন তিনি ঝিকরগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসাবে যোগদান করেন। যোগদানের কয়েকমাস পরে তিনি মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যান এবং ২০১৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর তারিখে দ্বিতীয় পুত্র সন্তানের জননী হন। চলতি মাসের ২২ তারিখে  পুনরায় কর্মস্থলে যোগদান করে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন  করছেন।

উপজেলার সমাজসেবা কর্মকর্তা এএসএম ওহিদুজ্জামান জানান, একজন কাজ পাগল মানুষ সুমী মজুমদার। একটা ৬ মাসের শিশু সন্তানকে বাড়ি রেখে সরকারের নির্দেশনা মেনে সাধারণ মানুষের জন্য তিনি নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন। তিনি নিজে ফিল্ডে কাজ করছেন আবার আমরা কে, কোথায়, কিভাবে কাজ করছি তার সার্বিক তদারকি করছেন।

ঝিকরগাছা সরকারি এমএল মডেল হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান আজাদ জানান,  আমার দেখা চৌকশ একজন অফিসার সুমী মজুমদার। তিনি করোনা প্রতিরোধে যেভাবে কাজ করছেন তা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমি মজুমদার বলেন, আমার কাছে দায়িত্ব অনেক বড়। সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক আমি চাই ঝিকরগাছা উপজেলা করোনা ভাইরাসমুক্ত থাকুক। এজন্য আমাকে উপজেলার সকল নাগরিককে সার্বিক সহযোগিতা করতে হবে।