করোনা ভাইরাসের প্রভাব: সবজি বিক্রি হচ্ছে পানির দামে

আবদুল কাদের : করোনা ভাইরাসের প্রভাব পড়েছে যশোরের সবজি ও ফুলের বাজারে। পাইকার সংকটে কৃষকরা সবজি বিক্রি করছেন পানির দামে। আবার ক্রেতা না থাকায় ফুলগাছ কেটে ফেলছেন চাষি। আবার কেউ গরু-ছাগল দিয়ে ফুল খাওয়াচ্ছেন।

দেশের অন্যতম সবজির বৃহৎ বাজার যশোরের সাতমাইল হাট। সপ্তাহে রোববার ও বৃহস্পতিবার এখানে হাট বসে। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানের ব্যবসায়ীরা এখান থেকে ট্রাকযোগে সবজি নিয়ে যান। কিন্তু করোনা ভাইরাসের প্রভাব পড়েছে এখানেও। বৃহস্পতিবার পাইকার সংকটে দাম পায়নি কৃষকরা। এতে পানির দ্বরে উৎপাদিত সবজি বিক্রি করেছেন চাষিরা।

সদর উপজেলার নাটুয়াপাড়া গ্রামের আলী হোসেন জানান, এবার ১৪ কাটা জমিতে পটলের আবাদ করেছিলাম। গতকাল হাটে পটল বিক্রি করেছি ২৮ টাকা কেজিতে। চুড়ামনকাটির বিজয়নগরের কৃষক আহাদ বলেন, মূলা ১৮ টাকা কেজিতে বিক্রি করলাম। ৩৫ টাকা বিক্রি হলে আমাদের লোকসান হতো না। কিন্তু কি করব হাটে পাইকাররা না আসায় স্থানীয় ব্যাপারীরা দাম দিতে চাইছেনা। বড় হৈবৎপুর গ্রামের চাষি মোহর আলী বলেন, পটল ২৮ টাকা, উচ্ছে ৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি করে লোকসান দিতে হলো। একই গ্রামের শুকুর আলী বলেন, পাতাকপি, ৬ টাকা পিস, লাউ ১০-১২ টাকা পিস, বেগুন ৮ টাকা, ঢেড়স ১০ টাকা কেজি এবং শিম ১০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এতে আমাদের পূঁজি বাঁচবেনা। কিন্তু কি করব, সবজি না বিক্রি করলেতো নষ্ট হয়ে যাবে। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার ব্যাপারী আনোয়ার হোসেন জানান, গত রোববার হাটে পরিবহন খরচসহ পটল ৩২ টাকা কেজিতে কিনে ঢাকার কেরানিগঞ্জে ২৫ টাকা কেজিতে বিক্রি করতে হয়েছিল। বড় পাইকাররা দাম দিচ্ছেনা। স্থানীয় ব্যাপারী আবদুর রহমান বলেন, আগে ঢাকায় যেতে ট্রাকভাড়া লাগত ১৩-১৪ হাজার টাকা কিন্তু এখন ভাড়া নিচ্ছে ১৮ হাজার টাকা। এতে মালের দাম বেশি পড়লেও আমরা ঢাকায় সবজি নিয়ে দাম পাচ্ছিনা।

শাক-সবজি উৎপাদনে হেক্টর প্রতি গড় ফলন সর্বোচ্চ ও দেশের সবজির চাহিদা পূরণে বিশেষ অবদান রাখায় জেলা পর্যায়ে প্রথম হয়েছে যশোর। সম্প্রতি ঢাকায় শেষ হওয়া জাতীয় কৃষি মেলা শেষে এই স্বীকৃতি দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়।

সারাবছর যশোর জেলায় সবজির আবাদ হয়ে থাকে। বছরে ৩২ হাজার হেক্টর জমিতে চাষিরা বিভিন্ন ধরণের সবজির আবাদ করেন। যা থেকে উৎপাদন হয় প্রায় ৮ লাখ মেট্রিক টন। এসব সবজি জেলার চাহিদা মিটিয়ে ঢাকাসহ সারা দেশে যেয়ে থাকে।

যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, যশোর জেলায় এবার চলতি মৌসুমে সবজি চাষ হয়েছে ১৬ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে। বছরে দু’বার সবজি আবাদ হয়ে থাকে।

অপরদিকে ফুলের রাজধানী খ্যাত যশোরের গদখালীতে করুণদশা। ফুল বিক্রি করতে না পেরে গাছ কেটে ফেলে দিচ্ছেন চাষিরা। কোথাও কোথাও গরু ছাগলকে দিয়ে খাওয়ানো হচ্ছে ক্ষেতের ফুল। কেউ কেউ অবিশ্বাস্য কম দামে গ্রামে গ্রামে ফেরি করে বিক্রি করছেন ফুল।

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী ও পানিসারা ইউনিয়নের মাঠে মাঠে এখন গোলাপ, জারবেরা, গ্লাডিওলাস, রজনীগন্ধা ও গাঁদা ফুল। এমন পূর্ণ প্রস্ফুটিত ফুল সাধারণত চোখে পড়েনা। গোলাপ বা জারবেরা তার পাপড়ি পুরোপুরি মেলে ধরার আগেই তা কেটে বাজার নেন ফুল চাষিরা। কিন্তু এখন চিত্র ভিন্ন। ফুল বিক্রি করতে পারছেন না চার্ষিরা, তা ক্ষেতেই থেকে যাচ্ছে।

গদখালীর পটুয়াপাড়ার মঞ্জুর আলম বলেন, তিনি পাঁচ বিঘা জমিতে জারবেরা ও চার বিঘা জমিতে গোলাপ ফুলের চাষ করেছেন। কিন্তু গত ১৭ ও ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ফুল বেচতে পারেনি, আবার আসন্ন পহেলা বৈশাখেও একই অবস্থা হবে।

তিনি আরও জানান, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব রোধে সকল অনুষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। ফুল জেলার বাইরে পাঠানো যাচ্ছে না চাহিদা না থাকায়। এ অবস্থায় গাছ বাঁচিয়ে রাখতে তাদেরকে ফুল তুলতে হচ্ছেই। কিন্তু ক্রেতা না থাকায় কাটা ফুলগুলো তারা গবাদী পশুকে দিয়ে খাওয়াচ্ছেন। একই ধরনের কথা পটুয়াপাড়া ও সৈয়দপাড়ার মেহেদি হাসান ও সেলিম মাল।

গদখালী বাজারে অবস্থিত ফুল প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র ও ফুল প্যাকেজিং ও বাজারজাতকরণ কেন্দ্র একেবারেই জনশূন্য। কয়েকদিন আগেও যেখানে ভোর সকাল থেকে ফুলের বেচাকেনা চলে সেখানে মাত্র তিনজনকে দেখা যায়।

তাদের মধ্যে একজন মোহা.উজ্জল হোসেন জানান, গদখালী ফুলের মোকামে কোনো খরিদ্দার নেই। করোনাভাইরাস আতঙ্কে পাইকাররা আসছেন না। এ সময় তারা খুব কম দামে ফুল কিনে গ্রামে গ্রামে ফেরি করে ফুল বিক্রি করাচ্ছেন।

তিনি আরও জানান, আগে যেখানে প্রতিটি গোলাপ ৫ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এখন তারা প্রতি ১শ’ গোলাপ ফুল বিক্রি করছেন মাত্র ২০ টাকায়। পঞ্চাশ পিসের এক আটি জারবেরা, গ্লাডিউলাস ও রজনীগন্ধা বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকায় এবং এক হাজার গাঁধা ফুল বিক্রি করছেন ৫০ টাকায়।

গদখালীর সৈয়দপাড়া গ্রামের সেলিম মাল বললেন, ফুল তুলে তারা গরু দিয়ে খাওয়াচ্ছেন অথবা ফেলে দিচ্ছেন। কিন্তু ফুল তুলতে মজুরি খরচ লাগে। খুব কম দামে ফুল বিক্রি করে তারা সেই খরচটা তোলার চেষ্টা করছেন।

বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আব্দুর রহিম বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে নেয়া সতর্কতায় সৃষ্ট অবস্থার কারণে যশোরে ৬ হাজার ফুলের কৃষক ও ফুলের উপর নির্ভরশীল দেড় লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। সারা দেশে এ অবস্থার শিকার কৃষক ও পাইকারি বিক্রেতা।

তিনি বলেন, জাতীয় দিবস গুলোতে ফুল বিক্রির অন্যতম সময়। কিন্তু২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ফুল বিক্রি করা যায়নি। আগামী পহেলা বৈশাখেও একই অবস্থার সৃষ্টি হবে। এতে করে ফুল খাতে সারা দেশে আড়াই শ’ কোটি টাকার ক্ষতি হবে।

ফ্লাওয়ার সোসাইটির নেতা প্রধানমন্ত্রী ও কৃষি মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে ফুল চাষিদের পাশে দাঁড়ানো আহ্বান জানান।

এ বিষয়ে যশোর আঞ্চলিক কৃষি অফিসের উপপরিচালক ড. আক্তারুজ্জামান বলেন, করোনার প্রভাব পড়েছে যশোরের সবজি ও ফুলের বাজারে। ক্রেতা না থাকলে চাষিরা কোথায় বিক্রি করবে। আবার সবজি ও ফুল বেশিদিন ক্ষেতে রাখা যায়না।