রাস্তাওয়ালারা ঘরে ফিরবে কবে?

হাবিবুর রহমান রিপন : অনেকের হয়তো স্মরণ আছে কয়েকমাস আগের ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কথা। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল অতিক্রম করার সময় গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হয়েছিল দুদিন। বৃষ্টিতে অধিকাংশ মানুষ গৃহবন্দি হয়ে পড়ে। ঘরবন্দি মানুষের কাজ ছিল সারাদিন টিভির সামনে বসে উপকূলের ঝড়ের অবস্থা দেখা । সন্ধ্যায় আবহাওয়ার খবরে বারবার  বলা হচ্ছিল দুই এক ঘণ্টার মধ্যে বুলবুল সাতক্ষীরার শ্যামনগর এলাকা দিয়ে দেশে প্রবেশ করবে। ঠিক সেই ভর সন্ধ্যায় একটি টেলিভিশনের লাইভে দেখা গেলো শ্যামনগরের কতিপয় ব্যক্তি উত্তাল নদী পাড়ি দিতে নৌকায় উঠছে। এ দৃশ্য দেখে টেলিভিশেনর সামনে অনেকের গাঁ শিউরে ওঠলেও ওই লোকগুলো বলে ছিল দরকারে বের হয়েছে।  শেষ পর্যন্ত গুড়িগুড়ি বৃষ্টিতে ঝড় অনেক দুর্বল হয়ে আমাদের উপকূল অতিক্রম করে। ক্ষয়ক্ষতি অন্য যেকোনো ঝড়ের তুলনায় কম হয়েছিল। অবশ্য বুলবুল মোকাবেলায় সরকারের প্রস্তুতিও ছিল যথেষ্ট । তাই ঝড় শেষে অনেকে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে ‘এই শক্তিশালী ঝড়!’ নোভেল করনাভাইরাসকে কেউ কেউ ওই ঝড়ের মতো ভাবছেন। অন্তত তাদের কর্মতৎপরতায় এমনটিই মনে হচ্ছে।

বুলবুল আর করনা দুটোই প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তাই বলে দুটোকে এক ভাবা হবে মস্ত ভুল। বুলবুল দৃশ্যমান। শুধু দৃশ্যমান নয় তার গতিপ্রকৃতি জানা ছিল। কিন্তু করোনার কোনো করুণা নেই। এটি কোনো উপকূলের নয় সারাবিশ^কে নাড়িয়ে দেয়া একটি দুর্যোগ। এরগতি প্রকৃতি ক্ষমতা সবকিছুই অজানা। এমনকি এর থেকে বাঁচার উপায়ও মানুষের জানা হয়নি। করোনা প্রতিরোধে যেটাকে বলা হচ্ছে যুদ্ধ সেটা আসলে যুদ্ধ নয় আত্মরক্ষার চেষ্টা। অস্ত্র দিয়ে শত্রুর মোবাবেলা করা যায় আবার ঢাল দিয়ে শত্রুর হামলা প্রতিহত করা যায়। গোটা পৃথিবীর মানুষের শত্রু নোভেল করোনাভাইরাসের সামনে দাঁড়ানোর মত অস্ত্র ও প্রতিহত করার ঢাল আপাতত অনবিষ্কৃত। একদিন হয়তো আবিষ্কার হবে। ততদিন নিজেদেরকে হাত পা গুটিয়ে ঘরের মধ্যে আটকে রাখা ছাড়া উপায় কী? অনেকটা ছোটাবেলার মারামারির মতো; মারখেয়ে প্রতিপক্ষকে বলা ‘আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাবি না তখন বুঝবি কি করি?’ কিছু করার ক্ষমতা নেই বলেই বাড়ি ফেরা। ঠিক তেমনি করোনার বিপক্ষে দাঁড়ারবার মত কোনো শক্তিই আমাদের নেই। তাই কোনো আস্ফালন না করে স্বেচ্ছায় ঘরে ঢুকে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

ভাববার বিষয় আমরা কতোটা অসহায় না হলে আমাদের সবচেয়ে নিরাপদ ও পবিত্র স্থান মসজিদ থেকে দূরে রয়েছি, মানুষ গড়ার পীঠস্থান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত বন্ধ করেছি। অর্থের যোগান হয় যে সব প্রতিষ্ঠান থেকে সেগুলোর ঝাপ নামিয়ে দিয়েছি, কলকারখানার চাকা থামিয়ে দিয়েছি। খেলাধুলা বন্ধ হয়ে গেছে। এভাবে সকল কর্মকান্ড থেমে গেছে, থামেনি কেবল বুদ্ধুদের কর্মতৎপরতা। তারা পাড়া মহল্লায় মোড়ে মোড়ে ঠিকই আছে, যেমন আগেও থাকতো। এইসব বখাটেদের বরাবরের ঠিকানা গলির মোড়। গলি ও মোড় যতদিন থাকবে ততদিন ওরাও থাকবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আসলে তারা পালিয়ে যাবে, চলে গেলে নিজেদের স্থানে আবার ফিরে আসবে। এভাবে খেলতেই থাকবে চোর-পুলিশ। অনেকটা শ্যামনগরে ঝড়ের মধ্যে নৌকায় ওঠা মানুষগুলোর মতো। পার্থক্য শুধু এই প্রয়োজনে তারা ঝুঁকি নিয়েছিল আর এরা স্বভাবে চোর পুলিশ খেলছে। এই বখাটের দলের জন্য আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সেনাবাহিনীর সম্মানিত সদস্যদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাঠে থাকতে হচ্ছে। বখাটেদের বাইরে আর এক দল আছে যারা এমনি এমনি রাস্তায় আসে। কেউ এমন আছে, আর্মি এসেছে কি না দেখার জন্য রাস্তায় যেয়ে লাঠির বাড়ি খেয়ে হাসতে হাসতে ঘরে ফেরে। যেন কী পুরস্কার লাভ করেছে! আবার অনেকে আছে ছেলের লেখাপড়ার ক্ষতি হবে ভেবে গৃহশিক্ষককে বাড়িতে আনছেন, অনেকে বাইরের লোকদিয়ে কাজ করাচ্ছেন। ছোট ছোট ছেলেরা মাঠে খেলছে, কেউ কেউ এককাপ চা খাওয়ার জন্য চাওয়ালার বাড়ি অথবা গুপ্তস্থানে চালু চা সিগারেটের দোকানে যাচ্ছেন।  এইসব আবালদের রুখতে প্রশাসন হয়তো একদিন সক্ষম হবে। তবে প্রশাসনের চেষ্টার আগেই ঘরে ফেরা সকলের জন্য কল্যাণের হবে।