যশোরে ফের করোনার আবির্ভাব : ৭ চিকিৎসকসহ আক্রান্ত ১১

 

বিল্লাল হোসেন : করোনামুক্ত যশোরে ফের করোনাভাইরাসের আবির্ভাব হয়েছে। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) জেনোম সেন্টার জীবাণুমুক্ত করার পর সোমবার ফের চালু করার প্রথম দিনে জেলার ৫৭ টি নমুনা পরীক্ষা করে ১১ জনের কোভিড-১৯ শনাক্ত হয় বলে মঙ্গলবার প্রকাশিত ফলাফলে জানানো হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে জেনোম সেন্টারের সহকারী পরিচালক প্রফেসর ড. ইকবাল কবির জাহিদ জানান, সোমবার যশোরসহ মোট জেলার মোট ৯৪ টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। তাতে যশোরের ১১ জনেরসহ মোট ১৯ জনের ফলাফল পজেটিভ হয়। বাকিগুলো হলো ঝিনাইদহে ৭ ও চুয়াডাঙ্গা ১ জন। নেগেটিভ  হয়েছে ৭৫ টি। যশোরের সিভিল সার্জন ডা. শেখ আবু শাহীন জানান, নতুন করে শনাক্ত ১১ জনের মধ্যে ৭ জন চিকিৎসক, ১ জন সেবিকা, ২ জন স্বাস্থ্যকর্মী ও ১ জন সাধারণ মানুষ রয়েছেন। এরআগে গত তিনদিনে এরআগে খুলনা থেকে গত ১, ২ ও ৪ মে ৩ দিনে মোট মোট ১৯৩ জনের নমুনা পরীক্ষা করে কারো শরীরে করোনার জীবাণু মেলেনি। সেখানে যবিপ্রবির ল্যাবে ১১ করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ায় জনমনে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কোনোটি সঠিক এনিয়ে দ্বন্দ্বে মানুষ।

যশোর সিভিল সার্জন অফিসের মেডিকেল অফিসার ডা. মোহাম্মদ রেহেনেওয়াজ জানান, করোনা শনাক্ত ১১ জনের মধ্যে যশোর সদর উপজেলায় ২ জন, চৌগাছা উপজেলায় ২ জন, ঝিকরগাছা  উপজেলায় ৪ জন , শার্শা উপজেলায় ২জন ও কেশবপুর উপজেলায় ১ জন রয়েছে। যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালসহ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের কাছে  ফলাফলের কপি পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। তিনি আরো জানান, মঙ্গলবার যশোর জেলার করোনা ভাইরাসে সন্দিগ্ধ ৪২ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য যবিপ্রবি ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। ডা. রেহেনেওয়াজ আরো জানান, গত ২৪ঘন্টায় জেলায় মোট ৮২জনকে হোম ও প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে আওতায় আনা হয়েছে। এর মধ্যে হোমে ৫জন এবং প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে ৭৭জনকে রাখা হয়েছে। এছাড়া গত ১০মাচ থেকে ৫মে পর্যন্ত জেলায় মোট ৫হাজার ৪০৭জনকে হোম ও প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের আওতায় আনা হয়। এর মধ্যে ৪হাজার ৩৫৭জনকে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। বর্তমানে জেলায় একহাজার ৫০জনকে হোম ও প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন।

যশোর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কমকর্তা ডা. মীর আবু মাউদ জানান, সদর উপজেলায় আক্রান্ত ২ জন হলেন চিকিৎসক। এরমধ্যে একজন যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট অপরজন বক্ষব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসক। তিনি আরো জানান, বক্ষব্যাধি হাসপাতালের আক্রান্ত চিকিৎসকের স্বামীরও গত সপ্তাহে করোনা ধরা পড়ে। তার স্বামী যশোর মেডিকেল কলেজের নাক কান গলা বিভাগের সহকারি অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। আগে থেকেই তাদের বাড়ি লকডাউন করা ছিলো। আক্রান্তরা নিজ বাড়িতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

শার্শা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইউসুফ আলী জানান, শার্শায় আক্রান্ত ২ জন হলেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক। দায়িত্ব পালনকালে রোগীর সংস্পর্শে তারা দুইজন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তারা নিজ বাড়িতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পননা কর্মকর্তা ডা. লুৎফুন্নাহার লাকি জানান, নতুন করে আক্রান্ত ২ জনই চিকিৎসক। তারা হলেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ১ জন আবাসিক মেডিকেল অফিসার আরএমও অপরজন শুধু মেডিকেল অফিসার। তারা হোম কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন। সেখানে তাদের চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে। তারা সুস্থ আছেন। উপজেলা প্রশাসন তাদের বাড়ি লকডাউন করেছে।

ঝিকরগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা, রাশিদুল ইসলাম জানান, আক্রান্তদের ৪ জনের মধ্যে ১ জন চিকিৎসক , ১ জন এমটিইপিআই (নমুনা সংগ্রকারী). ১ জন আয়া ও ১ জন নারী রোগী। তারা সবাই সুস্থ আছেন। নিজ বাড়িতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা.আলমগীর হোসেন জানান, কেশবপুরে যে আক্রান্ত হয়েছেন তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সিনিয়র স্টাফ নার্স। রোগীর সংস্পর্শে তিনি করোনায় আক্রান্ত হতে পারেন। তিনি নিজ বাসায় চিকিৎসাধীন।

যশোরের সিভিল সার্জন ডা. শেখ আবু শাহীন জানান, খুলনার ল্যাবে নমুনা পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী গত ১ সপ্তাহের পরিসংখ্যানে যশোর করোনামুক্ত হতে চলেছিলো। কিন্তু যবিপ্রবির ল্যাবে করা পরীক্ষার ফলাফল হাতে পেয়ে সেই ধারণার পরিবর্তন হয়েছে। খুলনা ও যশোরের ল্যাবে নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট কেনো এতো বিস্তার ফারাক তা তিনি নিজেও বুঝতে পারছেন না। তবে তিনি সাধারণ মানুষকে সতর্ক হওয়ার আহবান জানিয়েছেন।

এই বিষয়ে জেনোম সেন্টারের সহকারি পরিচালক প্রফেসর ড. ইকবাল কবির জাহিদ বলেছেন, যবিপ্রবির ল্যাবের পরীক্ষার ফলাফলে কোনো ভুল নেই। দক্ষ কর্মীরা কঠোর পরিশ্রম করে নমুনা পরীক্ষা করে ফলাফল বের করছে। তাদের পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই। এখানে তাজা নমুনা পরীক্ষা করা হয়। যে কারনে প্রকৃত ফলাফল মেলে।  অন্য ল্যাব কিভাবে পরীক্ষা করে তা জানা নেই।

খুলনার ল্যাবে নমুনা পরীক্ষায় একের পর এক নেগেটিভ ও যবিপ্রবিতে নমুনা পরীক্ষার পজেটিভের সংখ্যা বাড়ছে এই বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেন জানান, আমাদের পরীক্ষা ও ফলাফলের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস আছে। আমাদের রিপোর্টে ভুল থাকার কথা না। অনেক এক্সপার্ট দীর্ঘসময় নিয়ে নমুনা পরীক্ষার কাজ করেন। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা অন্য কোনো ল্যাবের বিষয়ে মন্তব্য করেননি দেশের অন্যতম শীর্ষ অণুজীববিজ্ঞানী।