সব উলোট পালোট করোনা ভাইরাসে

নিজস্ব প্রতিবেদক : সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। কিন্তু করোনা ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর হঠাৎ করেই সব কিছু বদলে গেছে। থমকে গেছে জেলা শহর যশোর। মানুষ যা কোনোদিন কল্পনাও করেনি তা ঘটে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠান একরকম বাতিল। স্থগিত হয়েছে যশোর-৬ আসনের উপনির্বাচন। উদযাপন হয়নি বাংলা বর্ষবরণ ‘বৈশাখী উৎসব, মঙ্গল-শোভাযাত্রা’। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এখন স্থবির। এছাড়াও সামাজিক বা পারিবারিক কোনো অনুষ্ঠান এখন আর হচ্ছে না বললেই চলে। মসজিদ-মন্দিরে উপাশনায় ধর্মপ্রাণ মানুষের উপস্থিতি নিতান্তই কম। এই রমজানে তারাবির নামাজ বাসাতেই সারছে রোজাদাররা । ঈদের কেনাকাটার আগ্র্রহ নেই কারো মাঝে। অধিকাংশ মানুষ নিজ গৃহে বন্দি। অজানা আতঙ্কে প্রভাব পড়েছে নিত্যপণ্যের বাজারে ও খেলার মাঠে।  সাংস্কৃতিক অঙ্গণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বন্ধ। জনকোলাহল এড়িয়ে চলতে গিয়ে প্রিয়জন স্বজনদের সাথেও দেখা সাক্ষাৎ বন্ধ।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী মুজিববর্ষ পালনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ১০ জানুয়ারি থেকে ১৭ মার্চ পর্যন্ত চলে ক্ষণ গণনার পালা। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে চীনের উহান শহরে ধরাপড়ে নতুন ভাইরাস করোনা। এরপর তা বিশে^র অন্যসব দেশে ছড়িয়ে যায়। এতে প্রতিদিনই বাড়তে থাকে মৃত্যর মিছিল। গোটা বিশ^ হয়ে ওঠে টালমাটাল। এক পর্যায়ে বাংলাদেশেও এর প্রাদুর্ভাব ঘটে। শনাক্ত হয় করোনা রোগী। সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এর প্রভাব। মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। এখনো থামছে না আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দপ্তর, কলকারখানা আদালত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তারপর নির্মম বাস্তবতায় সব কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যায় মুজিববর্ষ পালনের সকল কর্মসূচি। ঘোষণা করা হয় লকডাউন। সকাল থেকে বেলা ২ টা পর্যন্ত কেবল কাঁচাবাজার ও মুদি দোকান খোলা রাখার অনুমতি থাকলেও কেনা কাটা করতে হবে সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে। বর্তমানে  সামাজিক দুরত্ব নিশ্চিত করতে যশোরের বড় বাজার সরিয়ে আনা হয় শহরের মধ্যবর্তী স্থানে। কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে কাঁচাবাজার আর ঐতিহাসিক টাউন হল ময়দানে মাছ ও মাংসের দোকান বসানো হয় অস্থায়ী ভাবে।

শ্রমিক সংকট দেখা দেয়ায় কৃষকের ধান কেটে দিতে এগিয়ে যায় ছাত্রলীগ ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা।

ঘরে বন্দি মানুষের মাঝে খাবার পৌঁছে দিতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনসহ জনপ্রতিনিধি, বিত্তবান ব্যক্তি ও বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন গুলো এগিয়ে আসে। প্রতিনিয়ত তারা বিতরণ করছে চাল,ডাল,তেল,আলু, পিয়াজসহ ইফতার সামগ্রী। করোনা চিকিৎসায় ডাক্তাররা প্রথম দিকে পিছিয়ে থাকলেও এখন তার পরিবর্তন ঘটেছে। সরকারের কঠোর অবস্থান, নানামুখি সহায়তার আশ^াস এবং লজিস্টিটিক সাপোর্ট দেয়ার কারণে এখন চিকিৎসা সেবা কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন। জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এখন সকল ভেদাভেদ ভুলে জনসেবায় নিয়োজিত হয়েছেন।

এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন বলেন, এই করোনাভাইরাসের জন্যে আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। মুজিববর্ষ পালনের জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু এই অবস্থায় উৎসবের আয়োজন বাদদিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডাক দিয়েছেন। তিনি বলেন আমাদের খাবার মজুদ আছে যথেষ্ট। তার পরে নতুন ধান উঠতে শুরু হয়েছে। আসা করা যায় অল্পদিনের মধ্যে নতুন ধান কৃষকের  ঘরে উঠে যাবে। সরকারও প্রচুর পরিমানে ধান ক্রয় করবে। তিনি বলেন আমাদের খাবারের সংকট হবেনা। বর্তমান ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কৃষিতে অগ্রাধিকার দেয়া হবে।

যশোর পৌরসভার মেয়র জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু বলেন,অন্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশের অবস্থা ভালো । তবে একজনেরও মৃত্য কারো কাম্য নয়। তিনি বলেন মানুষের সুরক্ষার জন্যে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু কেন জানি মানুষ তা মানতে আগ্রহ নয়। তার পরেও সকলের উদ্যেশ্যে বলতে চায় নিজের এবং নিজের পরিবারের সুরক্ষায় সচেতন হতে হবে। তিনি বলেন, খাবার সামগ্রী যথেষ্ট মজুত আছে। পৌরসভা সকল সময় পৌরবাসির সেবায় পাশে আছে এবং থাকবে।

যশোর বড় বাজার পরিচালনা কমিটির সভাপতি মীর মোশারফ হোসেন বাবু বলেন, মানুষের জীবনের সুরক্ষা দিতে সাময়িকভাবে বাজার সরিয়ে দেয়া হয়েছে। সরকার বা প্রশাসন যত দিন চাইবে এভাবে চলবে। তিনি বলেন মানুষের জীবনের মূল্য অনেক বেশি। সবার আগে সেদিকেই আমাদের লক্ষ্য।

জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক মাহামুদ হাসান বুলু বলেছেন, এই পরিস্থিতির জন্যে আমরা মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। কবে এর শেষ হবে তাও জানিনা। তিনি বলেন, অন্যসব পেশার মানুষের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অঙ্গনও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। সাংস্কৃতিক স্কুল গুলোর অবস্থা আরো খারাপ। এই ভাবে চলতে থাকল নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে। তিনি এবিষয়ে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন।