করোনাভাইরাস মুক্ত হলেন যশোরের চিকিৎসক দম্পতিসহ ৩ জন

বিল্লাল হোসেন : প্রাণঘাতী কোভিড-১৯ নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থ হয়েছেন যশোরে চিকিৎসক দম্পতিসহ তিনজন। পরীক্ষার ফলাফল নেগেটিভ নিশ্চিত হওয়ার পর শনিবার তাদের করোনা মুক্ত ঘোষণা করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। তারা হলেন যশোর মেডিকেল কলেজের নাক কান গলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম, তার স্ত্রী যশোর বক্ষব্যাধি হাসপাতালের কনসালটেন্ট ডা. শরিফা খাতুন ও যশোরের চৌগাছা উপজেলার বানরহুদা গ্রামের আলমগীর হোসেনের স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা জান্নাতি খাতুন।

বিষয়টি নিশ্চিত করে যশোরের সিভিল সার্জন শেখ আবু শাহীন জানান, তাদের তিনজনকে করোনামুক্ত হওয়ার ছাড়পত্র প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ৩ জনকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়। এরআগে গত বৃহস্পতিবার যশোরের চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. আসিফ রায়হান করোনাভাইরাস থেকে সুস্থ হয়েছিলেন। সিভিল সার্জন কার্যালয়ে দায়িত্বরত তথ্য কর্মকর্তা মেডিকেল অফিসার ডা. মোহাম্মদ রেহেনেওয়াজ জানান, গত  ২৫ এপ্রিল ডা. নাজমুল ইসলামের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। ২৬ তারিখের ফলাফলে তার করোনা শনাক্ত হয়। পরে গত ২ মে ও ৯ মে ফলাফলে তার রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। ডা. নাজমুল ইসলামের স্ত্রী ডা. শরিফা খাতুনের নমুনা ২৬ এপ্রিল পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। অভ্যান্তরীণ কারণে ফলাফল আসে ৫ মে। ফলাফলে তিনি কোভিড-১৯ পজেটিভ শনাক্ত হন। তথ্য কর্মকর্তা ডা. রেহেনেওয়াজ আরো জানান, ফলাফল পাঠাতে দেরি হওয়ার কারণে নমুনা পাঠানোর দুই দিন পরই ফলাফল জানিয়ে দেয়া হয়েছিলো। সেই থেকে ডা. শরিফা খাতুন হোম আইসোলেশনে ছিলেন। তিনি আরো জানান, গত ৭ ও ৯ মে দুই বার পরীক্ষার ফলাফলে ডা. শরিফার নেগেটিভ শনাক্ত হয়। চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. লুৎফুন্নাহার লাকি জানান, অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ জান্নাতি  উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্øেক্সে ভর্তি হন গত ২০ এপ্রিল। তার উপসর্গ সন্দেহজনক হলে ২১ এপ্রিল নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। ২২ এপ্রিল তিনি হাসপাতাল পালিয়ে বাড়িতে চলে যান। ২৩ এপ্রিলের ফলাফলে জান্নাতি খাতুন করোনায় শনাক্ত হন। ডা. লাকি আরো জানান, এরপর আমি নিজে আক্রান্তের বাড়ি গিয়ে চিকিৎসাসেবা প্রদান করেছি।হোম আইসোলেশনে রেখে সব সময় জান্নাতির শারীরিক অবস্থার খোঁজ খবর নিয়েছি।  গত ৫ ও ৯ মে দুইবারের পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায় জান্নাতি খাতুনের করোনা নেগেটিভ। ডা. লুৎফুন্নাহার লাকি জানান, সুস্থ হওয়ার পর শনিবার তাকে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে প্রসূতি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে।  দুই একদিনের মধ্যে হাসপাতালের গাইনী বিভাগের চিকিৎসকরা তার সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করবেন। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস থেকে চিকিৎসক দম্পতি যেভাবে সুস্থ হলেন তার বর্ণনা করেছেন ডা. নাজমুল ইসলাম। তিনি জানান, ব্যক্তিহত চেম্বারে দায়িত্ব পালনকালীন রোগীর সংস্পর্শে তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। এরপর থেকে  প্রথম ১০ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন। তারপরের ১০ দিন ছিলেন হোম আইসোলেশনে। শরীরে জ্বর থাকার কারণে  প্রথম অবস্থায় দিনে ৩ বার প্যারাসিটামল সেবন করেছি। এরপর রমজানে রোজা থাকার কারণে ভোর রাতে ও সন্ধ্যায় প্যারাসিটামল খেতাম।  এ ছাড়া ঠান্ডার জন্য প্রতি রাতে ১টি করে ফেক্সোফেনাডিন সেবন করেছি। ভোরে ও সন্ধ্যায় ইফতারির পর বিভিন্ন সময়ে গরম পানির  গারগিল করতাম। গরম পানির সাথে কালো জিরা মধু মিশিয়ে খেয়েছি নিয়মিত। একাধিকবার গরম পানির ভাপ নিতাম। প্রতিদিন গোসল করেছি। সবার থেকে আলাদা থেকেছি। খাবার খেয়ে নিজে থালা বাসন পরিস্কার করেছি। বিছানা নিজে গুছিয়েছি। আল্লাহকে স্মরণ করেছি। ভিটামিন সি জাতীয় ফল ও শাক সবজি খেয়েছি। এক প্রশ্নের উত্তরে ডা. নাজমুল আরো জানান, আমার স্ত্রী ১ সপ্তাহের হোম আইসোলেশনে ছিলেন। আমার মতো তিনিও একই নিয়ম করে চলেছেন। আল্লাহর রহমতে আমরা এখন সুস্থ। দ্রুত কর্মস্থলে রোগীর সেবায় ফিরে যাবো। যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের প্রসূতি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন জান্নাতি জানান, তার তেমন ঠান্ডা ছিলোনা। ছিলো গলায় ব্যথা আর জ্বর। নিয়মিত তিনবেলা প্যারাসিটামল সেবন করেছি। লবন মেশানো গরম পানি গড়গড় করেছি। গরম পানির ভাপ নিয়েছি। নিয়মিত গরম পানি খেয়েছি। আলাদা কক্ষে থেকেছি ২ সপ্তাহ। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কারণে আল্লাহর ইচ্ছায় সুস্থ জীবনে ফিরে এসেছি। করোনাভাইরাস হওয়ার প্রথমে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছিলাম। কিন্তু পরে মনোবল ফিরে আনতে সক্ষম হয়েছিলাম। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. লুৎফুন্নাহার লাকি আপা নিয়মিত আমার খোঁজ নিয়েছেন। আমাকে সাহস দিয়েছেন। যশোরের সিভিল সার্জন ডা. শেখ আবু শাহীন জানান, কোভিড-১৯ নভেল করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে ডা. নাজমুল ইসলাম, ডা. শরিফা খাতুন ও অন্তঃসত্ত্বা জান্নাতি খাতুন সুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত হোম আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেছেন। তারা সুস্থ হওয়ায় আনন্দিত। তাদের হাতে ছাড়পত্র তুলে দিয়েছি। সেই সাথে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়। এই তিনজনের আগে বৃহস্পতিবার সুস্থ হন করোনায় আক্রান্ত ডা. আসিফ রায়হান। তিনি আরো জানান, শনিবার যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৩ জনের ও খুলনা মেডিকেল কলেজের ল্যাব থেকে ৫ জনের নমুনা পরীক্ষার ফলাফল পাঠানো হয়েছে। ৮ জনের ফলাফল করোনা নেগেটিভ শনাক্ত হয়েছে।