করোনা আতঙ্কের মধ্যে ঈদবাজারে সতর্ক ক্রেতা-বিক্রেতা

মারুফ কবীর : করোনা আতংকের মধ্যে যশোরের ঈদবাজারে ক্রেতা বিক্রেতারা সতর্ক রয়েছের। সরকারের বিধি-নিষেধের মধ্যে মানুষ ছুটছে ঈদ বাজারে। সরকারি সিদ্ধান্তের পর  ১০ মে থেকে সীমিত পরিসরে দোকানপাট খোলার সিদ্ধান্ত নেয় যশোরের জেলা প্রশাসন। শর্ত সাপেক্ষে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত  দোকানপাট খোলার কথা বলা হলেও তা মানছে না অনেকে ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সকাল ১০টার আগেও অনেকে দোকান খুলছেন। অনেক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন ৪ টা পর্যন্ত সময় বেধে দেয়ায় অল্প সময়ের মধ্যে বেশি সংখ্যক লোক আসায় বাজারে বেশি সমাগম মনে হচ্ছে। তবে এদের মধ্যে উৎসুক জনতাই বেশি। সরকারের নির্দেশনা মেনে ব্যবসায়ীরা  স্বাস্থ্য সুরক্ষার সরঞ্জাম রেখেছেন দোকানে। তারা বলেছেন আমরা নিরূপায় আর ক্রেতারা সচেতন নয়। তবে সতর্ক রয়েছেন ক্রেতা বিক্রেতারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, ঢাকা, চট্টগাম ও বরিশালসহ অনেক জায়গার ব্যবসায়ীরা দোকান ও শপিংমল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরাও আতঙ্কে আছি। এই বুঝি সব বন্ধ করতে হবে সেই ভয়ে। বুধবার যশোর শহরের মার্কেটগুলো ঘুরে দেখা যায় ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়। বিকেল ৪ টা পর্যন্ত সময় বেধে দেয়ার কারনে এমন ভিড় বলে জানান ব্যবসায়ীরা। তা না হয়ে ইফতারের পর দ্বিতীয় দফা কাস্টমার বাজারে আসতে পারলে ভিড় কিছুটা কম হতো। এর মধ্যে দোকানপাট আবারও বন্ধ হয়ে যাবে এ ভয়ে শংকিত হয়ে বাজারে ছুটছেন অনেকে। শহরের কাপুড়িয়া পট্টি ও এইচএম এম রোড ও স্টেডিয়াম পাড়ার হকার্স মার্কেটে ভিড় বেশি হলেও ভিন্ন চিত্র শপিংমলগুলোতে। সিটি প্লাজা, জেস টাওয়ার ও মুজিব সড়কস্থ্য ভিআইপি মার্কেটে হাতে গোনা কয়েকজন কাষ্টমারের আনাগোনা। শপিং করতে আসা ক্রেতারা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, জীবাণুনাশক ব্যবহার করা, মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভস ব্যবহার করাসহ মোট ১৬ শর্তের বেশিরভাগ মানছেন না। এমনকি শিশুদেরকেও নিয়ে মার্কেটে আসছেন অনেকে।

করোনা পরিস্থিতিতে সারা বিশ্বের মতো গোটা বাংলাদেশ যখন আতঙ্কে তখন ঈদের মার্কেট গুলোতে আসা মানুষের কারও মাঝে নেই আতঙ্কের কোনো ছাপ। মার্কেটে ঢুকলে মনে হবে দেশে করোনা নামক কিছুই নেই এখন। ক্রেতা-বিক্রেতা কেউ মানছেন না সামাজিক দূরত্ব। অল্পসংখ্যক বিপনীতে সেনেটাইজেশন ব্যবস্থা আছে। আনেক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন মার্কেটের ভেতর মোটরসাইকেল, রিকসাসহ নানান যানবাহন অবাধে চলছে। এতে ক্রেতারা সমস্যয় পড়ছেন। শাড়ির দোকান পাঁড় আচলের প্রোপাইটর মোস্তাফিজুর রহমান মুস্তা বলেন, ঈদে বিগত বছরের মতো খুববেশী কালেকশন না থাকলেও বিক্রি হচ্ছে যথাসামান্য।  কালেক্টরেট মসজিদ কমপ্লেক্স মার্কেট  এসোসিয়েশনের সভাপতি রেজওয়ানুল করিম লালু বলেন, সরকারি নির্দেশনা ও স্বাস্থ্য বিধি মেনে আমাদের মার্কেটের দোকানীরা ব্যবসা পরিচালনা করছেন। বিক্রয়কর্মীদের মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামুলক। এছাড়া হ্যান্ড সেনিটাইজার রয়েছে প্রতিটা দোকানে। তিনি আরও বলেন, এবছর ব্যবসা খুব খারাপ।   সিটি প্লাজা ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি এস আর আজাদ  বলেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য অনেকে ইতস্তবোধ করছেন বাজারে আসতে। সন্ধ্যার পর অনেক কাস্টমার আসেন কেনাকাটা করতে। তবে এবছর বিকেল ৪ টা পর্যন্ত সময় বেধে দেয়ায় বিক্রি কম। কাপুড়িয়াপট্টি ও এইচ এমএম রোড তৈরি পোশাক দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহিনুর রহমান তপু বলেন, ব্যবসায়ীরা তাদের পন্য অর্ডার দেয়ার আগে লকডাউন হয়ে যায় দেশ। এর মধ্যে মোবাইলের মাধ্যমে কিছু অর্ডার দিচ্ছে ব্যবসায়ীরা যা আসতে আরও ২/১ দিন লাগবে। এর মধ্যে আগের পন্য দিয়ে কোনোমতে কাষ্টমার সামলাচ্ছেন অনেকে।  দেখা ফ্যশানের প্রোপাইটর মান্না দে লিটু বলেন, এবছর ১০ শতাংশ পোশাক এসছে নতুন। পাশাপাশি কোনো ইন্ডিয়ান পোশাক আসেনি এবার। আগের পোশাক বিক্রি করে কর্মচারির বেতন বোনাস দিতে পারাটা কষ্টকর হয়ে  পড়েছে। যশোর শাড়ি কাপড় ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি তন্ময় সাহা বলেন, আমাদের মার্কেটে ছোট বড় ৩২ টি শাড়ির দোকান রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় এ বছর শাড়ির অর্ডার দেয়া হয়নি। সামান্য কিছু শাড়ির চালান  এসেছে। তা বিক্রি করছি। তিনি আরও বলেন, উচ্চবিত্তরা এবার পোশাক কিনতে তেমন একটা বাজারে আসছেন না। যারা আসছেন তাদের মধ্যে বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত শ্রেনীর। এ কারণে প্রিন্টের শাড়ি বেশী বিক্রি হচ্ছে। ছিট কাপড়ের দোকান জিকো কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপক আলী হোসেন বলেন, ছিট কাপড়ের তেমন ব্যবসা নেই। টেইলার্সে অর্ডার নেবে কিনা সে ভয়ে অনেকে ছিট কাপড় কিনছেন না। তবে ২/১ দিনের মধ্যে কিছু ব্যবসা হবে বলে আশা করছি। মুজব সড়কস্থ রং ফ্যাশনের প্রোপাইটর তনুজা রহমান মায়া বলেন, আমাদের এ মার্কেটের বেশীরভাগ ক্রেতা ভিআইপ শ্রেণীর। আগের স্টকের পোশাক বিক্রি করছি। ক্রেতা তেমন না হলেও মোটামুটি ব্যবসা হচ্ছে। রোজার শেষ সপ্তাহে বেচাকেনা আরও জমজমাট হবে বলে আশা করছি। রানা টেইলার্সের প্রোপাইটর রানা বলেন, মূলত রোজার শুরুতে তৈরি পোশাকের অর্ডার দেন কাষ্টমাররা। তবে করোনার কারণে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। অর্ডার কম হলেও সেগুলো তৈরি করে দেয়াটা এখন অনেকটা চাপের। মর্ডান টেইলার্সের প্রোপাইটর রুহুল আমিন বলেন, দোকানে কারিগর সবাই আসছেনা। অর্ডার অল্পসংখ্যক হলেও তা সঠিক সময়ে ডেলিভারি দেয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। ফেন্সি মার্কেটের মিথিলা কসমেটিকসের  পোপাইটর রাসেল আহম্মেদ বলেন,  কেনার চেয়ে দর্শনার্থী বেশি আসছেন বাজারে। তবে তিনি আশা করছেন পোশাক কেনা হলে শেষের  দিকে কসমেটিকসের দোকানের বিক্রি বাড়বে। জেস টাওয়ারের সাক্ষর সু’র পোপাইটর মাহাফুজুর রহমান নিপু বলেন, লকডাউনের আগে কিছু জুতা-স্যান্ডেল মজুত করেছিলাম তা বিক্রি করছি। বিগত বছরের তুলনায় ১০ শতাংশও বিক্রি নেই। লিবার্টি  গ্যালারির বিক্রয় কর্মী জুলফিকার আলী বলেন, সকালের দিকে কিছু কাষ্টমার আসছেন শহরতলী থেকে। তবে একজন কিনতে আসলে তাদের সাথে আসছে আরও ২/৩ জন সঙ্গী। এতে ভিড় বাড়ছে।  বেবি ফ্যাশনের বিক্রয় কর্মী মাহাবুব বলেন, করোনার কারনে শিশু পোশাক তেমন একটা আসেনি। এ কারনে আগের পোশাক বিক্রি করছি। এবার ইন্ডিয়ান পোশাক না থাকায় শিশু পোশাকের দাম বেশ কম।  এইচ এমএম রোডের শিশু পোশাকের দোকান ডরেমনের প্রোপাইটর নাজমুল ইসলাম রিপন বলেন, অল্পকিছু পোশাক আনতে পেরেছি এবারের ঈদের জন্য। আগের ও নতুন পোশাক মিলিয়ে বিক্রি করছি, তবে বিক্রি খুবই কম।