ওপারে ভাল থাকুন ফখরে ভাই

মিলন রহমান:
চলে গেলেন খ্যাতিমান সাংবাদিক কবি ফখরে আলম। প্রায় দেড় দশক আগে শ্রদ্ধা আর ভালবাসায় তাঁর সঙ্গে যে সম্পর্কের সূত্রপাত; ‘মৃত্যু’ নামক অমোঘ নিয়তি তাতে ছেদ টানালো। ক্ষমা করবেন ফখরে ভাই; আপনার আবেগ মাখানো শেষ কথাটি পুরোপুরি পালন করতে পারিনি; তাই হয়তো আপনার এই আকস্মিক চলে যাওয়া!
২০০৬ সালের প্রথম দিকের কথা; বছর পাঁচেক হলো গ্রামের কাগজে কাজ করি। যায়যায়দিন পত্রিকা তখন দৈনিক আকারে বাজারে আসার প্রস্তুতি চলছে। ফখরে আলম ভাই যশোরের দায়িত্ব নিয়েছেন। গ্রামের কাগজ সম্পাদক মবিনুল ইসলাম মবিন ভাই আমাকে ডেকে বললেন, ফখরে ভাইয়ের সাথে কাজ করো, কিছু শিখতে পারবে। এর আগে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও কর্মসূচির সূত্রে ফখরে আলম ভাইকে চিনি। মবিন ভাইয়ের কথা মতো ফখরে ভাইয়ের বাড়িতে তাঁর রিডিং রুমে (যে কক্ষটি তিনি অফিস হিসেবে ব্যবহার করতেন) যাতায়াত শুরু করি। ভাই সম্বোধন করলেও পিতার মত, গুরুজনের মত শ্রদ্ধা করতাম। রাশভারী মানুষটি ছোট ভাইয়ের মতো, সন্তানের মত স্নেহ করতেন।
ঘনিষ্ঠতার সেই শুরু। ফখরে ভাইয়ের মোটরসাইকেলের পেছনে চড়ে ইয়াসিকা ক্যামেরা নিয়ে মাইলের পর মাইল ছুটেছি দক্ষিণ-পশ্চিমের পথে-প্রান্তরে। ঝিকরগাছায় ‘ইতিহাসখ্যাত অমৃতবাজার’ পত্রিকার ছাপাখানার খোঁজে গিয়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপির আলাদা চায়ের দোকান চিনেছি। রাস্তার দু’পাশে দুই চায়ের দোকান। এক দোকানে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা, অন্য দোকানে বিএনপির সমর্থকরা চা পান করেন। অভয়নগরের রূপ-সনাতম ধামে গিয়েছি। বাঘারপাড়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে গ্রামভিত্তিক সমবায় নিয়ে সরেজমিন করেছি। এমন অনেক অনেক ঘটনা আজ সেলুলয়েডের মতো চোখের সামনে এসে ভিড় করছে। যা বলতে শুরু করলে কোথায় গিয়ে শেষ হবে জানি না। শুধু শুরুর শিক্ষাটাই বলি।
২০০৭ সালের ১৫ এপ্রিল, ২ বৈশাখ। তখন দৈনিক স্পন্দনে কাজ করি। দুই সহকর্মীর সাথে ঝিনাইদহের মহেশপুরের ফতেপুর গ্রামে চড়ক পূজার রিপোর্ট করতে গেছি। বর্শি বিঁধে সন্ন্যাসীর শূন্যে ঘোরার সচিত্র প্রতিবেদন লিখেছি। স্পন্দনে বেশ বড় করে ছাপা হয়েছে। খুশি খুশি মনে পরদিন ফখরে ভাইয়ের বাসায় গিয়েছি। ভাইও ততক্ষণে নিউজটি পড়ে ফেলেছেন। আমাকে দেখে বললেন, ‘ভালোই লিখেছো। তবে শুধু নিজের লেখা মানুষকে পড়ালে তো হবে না। নিজেরও পড়াশুনা থাকতে হবে!’ আমি কিছুই বুঝতে না পেরে চুপ করে থাকলাম। ভাই বুক সেলফ্ থেকে একটি বই বের করতে বললেন। বইটি তার সামনে দিলাম। তিনি বইটি খুলে খুঁজে খুঁজে একটি যায়গায় স্থির হলেন। আমাকে দেখিয়ে বললেন, ‘এই দেখো, এই হচ্ছে চড়ক পূজার ইতিহাস। আর এই দেখো, বর্শি বিঁধে শূন্যে ঘোরা ব্রিটিশ আমল থেকেই কিন্তু আইনত নিষিদ্ধ।’ এইসব তথ্য-ইতিহাসও রিপোর্টে থাকা দরকার। ফখরে ভাইয়ের সেই উপদেশ আজও কানে ভাসে, ‘নিজেরও পড়াশুনা থাকতে হবে।’
দু’বছর ফখরে ভাইয়ের সাথে কাজ করলাম। তারপর যুগান্তর যশোর অফিসে কচি দা’র (কিরণ সাহা) সাথে কাজ করার সুযোগ হলো। যুগান্তরে আসলেও ফখরে ভাইয়ের সাথে সম্পর্কের কোনো ছেদ ঘটেনি। কারণ ফখরে ভাই, কচি দা ছিলেন হরিহর আত্মা! ২০১০ সালে সালে ফখরে ভাই কালের কণ্ঠে যোগ দিলেন। ভাইয়ের সুপারিশে আমার চাকরি হলো যায়যায়দিনে। ফখরে ভাইয়ের বাড়ি, কালের কণ্ঠ অফিস- এই সম্পর্কের টানা নিত্য টেনেছে আমাকে।
২০১১ সালের ডিসেম্বরে ফখরে ভাইয়ের ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়লো। ‘ব্লাড ক্যান্সার!’ আমরা ভয়ে শিউরে উঠলাম। জানুয়ারির এক ভোরে কচি দা, মনোতোষ দাদু, তৌহিদ ভাই ও আমি ফখরে ভাইকে বেনাপোলে পৌঁছে দিলাম। ভাবীকে (ফখরে ভাইয়ের স্ত্রী নাসিমা আলম) সাথে নিয়ে ফখরে ভাই ভারতে গেলেন চিকিৎসার জন্য। উৎকণ্ঠায় স্রষ্টার কাছে প্রার্থনায় আমাদের দিন কাটতে লাগলো। আমাদের উৎকণ্ঠাকে উড়িয়ে দিয়ে ক্যান্সারকে জয় করে ফিরলেন ফখরে ভাই। নিয়মিত চিকিৎসায় ছয় বছর সুস্থ ছিলেন তিনি।
২০১৮ সালের একুশে বইমেলায় আমার ‘গিট্টু দা’ প্রকাশিত হলো। ভাইকে বই উপহার দিলাম। ফেব্রুয়ারিতে বুলবুল ভাই (ফারাজী আহমেদ সাঈদ বুলবুল) চাঁদের হাটে ‘গিট্টু দা’কে নিয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেন। অনুষ্ঠানে ফখরে ভাই গিট্টু দা’কে নিয়ে সুন্দর আলোচনা করলেন। আলোচনায় বুঝিয়ে দিলেন, ‘গিট্টু দা’র প্রত্যেকটি গল্পই তিনি মনোযোগ দিয়ে পড়েছেন। মার্চে প্রেসক্লাবের বনভোজনে যশোরের সংবাদকর্মীদের নিয়ে ফখরে ভাই ছড়া লিখলেন। সেখানে আমাকে নিয়ে লেখা লাইনটি ছিল, ‘মিলনের গিট্টু দা করে শুধু ফন্দি…।’
২০১৮ সালের এপ্রিলে হঠাৎ ক্যান্সার ফিরে এসে মাথায় ছড়িয়ে পড়লো। অপটিক নার্ভ ড্যামেজ করে দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নিলো। ভাবী হাত ধরে ফখরে ভাইকে ভারতে নিয়ে গেলেন। ভারতের টাটা হাসপাতাল, আমরি হাসপাতাল, অ্যাপোলো হাসপাতাল ও চেন্নাইয়ের শংকর নেত্রালয় চক্ষু হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে দেশে ফিরলেন। ক্যান্সারকে নিয়ন্ত্রণ করা গেলো। কিন্তু দৃষ্টিশক্তি ফিরলো না!
গত বছর যুগসাগ্নিক’র যশোর সাহিত্য উৎসবে কবিতা পড়েছিলাম। ফখরে ভাইয়ের তখন দৃষ্টিশক্তি নেই। অনুষ্ঠানে বসে ভাই কবিতা শুনেছিলেন। পরদিন বাড়িতে গেলে ভাবী বললেন, ‘আপনার কবিতা আপনার ভাইয়ের ভাল লেগেছে।’ পরে ভাই বললেন, ‘কবিতা লেখাটা ছেড়ো না।’ একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘কবিতার প্রথম লাইন স্বর্গ থেকে আসে। দ্বিতীয় লাইনটার জন্য কবিকে অনেক সাধনা করতে হয়!’
ফখরে ভাইয়ের দৃষ্টিশক্তি চলে গেছে। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) সভাপতি শ্রদ্ধাভাজন মনজুরুল ইসলাম বুলবুল ভাই যশোরে এসে ভাইকে দেখতে গেলেন। ক্যান্সার চিকিৎসায় তখন পানির মতো টাকা যাচ্ছে। ভাই জানালেন, এ পর্যন্ত ৪০ লাখ টাকার উপরে ব্যয় হয়েছে। বুলবুল ভাই বললেন, কল্যাণ ফান্ড বা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে চিকিৎসা সহযোগিতার জন্য আবেদন করা যায় কিনা? ফখরে ভাই অস্বীকৃতি জানালেন। বুলবুল ভাই পরে ভাবীকে বলেছিলেন, ভাইকে রাজী করানো যায় কিনা। আমাকেও বলে গেলেন, দেখেন ভাইকে রাজী করিয়ে একটি আবেদন দিতে পারেন কিনা! ভাবী এবং আমার চাপাচাপিতে ফখরে ভাই নিমরাজী হয়ে আবেদনে সই করেছিলেন। বুলবুল ভাই সেই আবেদনটির সুরাহা করার জন্য দু’বছর ধরে অনেক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ফল হয়নি (মনজুরুল আহসান বুলবুল ভাই ফেসবুক স্ট্যাটাসে সেটি লিখেছেন)। হয়তো স্রষ্টা চাননি, যে হাতে অকাতরে মানুষকে দিয়ে গেছেন, সেই হাত কিছু গ্রহণ করুক!
শেষ সময়ে এসে ফখরে ভাইয়ের শরীর হঠাৎ খারাপ হতে শুরু করে। চিকিৎসার জন্যে ভাবী ছোটাছুটি শুরু করলেন। এদিকে করোনা পরিস্থিতির কারণে বর্ডার বন্ধ। ভারতে যাওয়া যাচ্ছে না। ভাবী দিন গুনছিলেন, বর্ডার খুললে ভাইকে নিয়ে ভারতে যাবেন। হঠাৎ ভাই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে যশোর মেডিকেল কলেজ’র ডা. নাজমুস সাদিক রাসেল ভাইকে বললাম, ভাই কি করবো, করোনার জন্য তো কোথাও কাউকে পাচ্ছি না। লক্ষণ শুনে রাসেল ভাই বললেন, সম্ভবত সোডিয়ামের ঘাটতি। রক্ত পরীক্ষা করো। সোডিয়াম’র ঘাটতি ধরা পড়লো। সোডিয়াম ক্লোরাইড স্যালাইন, ট্যাবলেট দিয়েও শরীরে লবণ ধরে রাখা যাচ্ছিল না। প্রায় প্রতিদিনই রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট দিচ্ছিলাম রাসেল ভাইকে। তার পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চলছিল। এক মাসের চেষ্টায় সোডিয়ামের ঘাটতি পূরণ হলো। কিন্তু এরপর আবার হঠাৎ করেই সোডিয়াম নেমে গেলো। রাসেল ভাই কী কী কারণে এটি হতে পারে ব্যাখ্যা দিয়ে, দ্রুত ক্যান্সার বিশেষজ্ঞে শরাণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু তার আগেই চিরবিদায় নিলেন ফখরে ভাই!
ফখরে ভাইয়ের স্মরণে লেখাটি লিখতে বসলেও ভাবীর কথা না বললে লেখাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আট বছর ধরে ভাইয়ের চিকিৎসার সহযাত্রী। কিন্তু শেষদিকে অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ায় ভাবীকেই নিতে হয় সব দায়িত্ব। ১৩ মে রাতে অফিস শেষ করে ভাবীর হাতে সোডিয়াম স্যালাইন পৌঁছে দিয়ে ভাইকে শেষ দেখে আসলাম। ঘুমাচ্ছিলেন। তার আগে চার রাত ঘুমাননি। ভাবীকে বললাম, সকালেই স্যালাইনটা দিতে হবে। ১৪ মে সকালে ভাবীর ফোন। ‘মিলন ভাই, তাড়াতাড়ি আসেন; আপনার ভাই তো কোনো সাড়া দিচ্ছে না!’ মোটরসাইকেল নিয়ে ছুটলাম। পাঁচ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে ভাইকে অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে ছুটলাম হাসপাতালে। কিন্তু তার আগেই সব শেষ!
লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরে সবাইকে শোকসংবাদ জানাচ্ছি। প্রেসক্লাব সভাপতি জাহিদ ভাই ফোনে বললেন, ‘মিলন, আমরা মরদেহ প্রেসক্লাবে এনে শেষ বিদায় জানাতে চাই।’ জাহিদ ভাইকে বললাম, ‘ভাবীর সাথে কথা বলে জানাচ্ছি।’ ভাবীকে কী বলবো বুঝতে পারছিলাম না। শেষ সময়ে এসে ফখরে ভাই আমাকে বলেছিলেন, ‘মিলন, আমি মরে গেলে আমার লাশ ক্লাবে নেবে না। তোমার ভাবীকে আমি বলে দিয়েছি।’ পিতাহারা দুই সন্তান নাজিফা আলম মাটি ও ফাহমিদ হুদা বিজয়কে নিয়ে ভাবী তখন মূর্ছাপ্রায়। সিদ্ধান্ত দেয়ার আর কেউ নেই। অগত্যা কান্না চেপে ভাবীকে বললাম, প্রেসক্লাবে মরদেহ নেয়ার কি করবো? ভাবী চোখ মুছে বললেন, ‘আমি তো জানি ওটা ছিল আপনার ভাইয়ের অভিমান। সারা জীবন তিনি সাংবাদিকদের জন্য করেছেন। আপনি শেষ বারের জন্য প্রেসক্লাবে নিয়ে যান!’ এভাবেই সারাজীবন নেপথ্যে থেকে ভাবী পরামর্শ, সাহস ও শক্তি যুগিয়েছেন ফখরে ভাইকে।
রাশভারী এই মানুষটি সারাজীবন যশোরকে নিয়ে ভেবেছেন। সাংবাদিকদের সকল সঙ্কট-প্রয়োজনে অগ্রভাগে থেকেছেন। কখনও অতিআবেগে তাকে ভাসতে দেখিনি। মাসখানেক আগে হঠাৎই আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে বললেন, ‘মিলন, তুমি আর ছোট ভাই। তোমার ভাবীর সাথে থেকে আমার চিকিৎসাটা একটু দেখো!’
বৃহস্পতিবার লাশ দাফন শেষে গভীর রাতে চোখের জলে ভাবছিলাম, আপনার প্রথম পরামর্শ, পড়তে হবে। সেটি মানা হয় না। আর শেষ আকুতি চিকিৎসার ব্যবস্থাটাও পুরোপুরি করতে পারিনি করোনা পরিস্থিতির কারণে। ক্ষমা করবেন ফখরে ভাই; আপনার কথা রাখতে পারিনি! ওপারে ভাল থাকবেন বড় ভাই!
লেখক : সাধারণ সম্পাদক, যশোর সাংবাদিক ইউনিয়ন (জেইউজে)
০১৭১২ ৬১১৭০৭