সন্তানকে বুকে জড়িয়ে হাসি মুখে বাড়ি ফিরলেন সেই জান্নাতি

বিল্লাল হোসেন : কোভিড-১৯ নভেল করোনাভাইরাস মুক্ত হওয়ার পর ফের করোনায় আক্রান্ত সেই জান্নাতি বেগম (২৮) সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে কন্যা সন্তানকে বুকে জড়িয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বুধবার দুপুরে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা তাকে ফুল দিয়ে বরণের পর সরকারি অ্যাম্বুলেন্সযোগে তাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছে। যশোরের সিভিল সার্জন জানিয়েছেন,  ঢাকার বাইরে যশোরে এই প্রথম কোনো করোনা রোগীর অস্ত্রোপচারে সাফল্য অর্জন করেছেন। তারা মা ও মেয়ে সুস্থ আছেন। করোনার সাথে মিলিয়ে জান্নাতির সন্তানের নাম দেয়া হয়েছে কারিনা সুলতানা।

যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা, আরিফ আহমেদ জানান, গত ৯ মে  চৌগাছা উপজেলার বানরহুদা গ্রামের আলমগীর হোসেনের স্ত্রী করোনায় আক্রান্ত অন্তঃসত্ত্বা জান্নাতিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বুধবার সকালে তাকে নেয়া হয় জেনেসিস হাসপাতালে। সেখানে তার সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করেন গাইনী বিভাগের সার্জন ডা.নিলুফার ইসলাম এমিলি। অজ্ঞানের চিকিৎসক ছিলেন আনিসুর রহমান। সহায়ক হিসেবে ছিলেন সেবিকা ফারহানা আক্তার চৌধুরী। অস্ত্রোপচারের পর টিমে দায়িত্বরতদের ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে তাকে দেখভাল করেন ডা. সোহাগ, ডা. আবুল হাসান, ডা. মাহমুদ, ডা. মাসুদ, হাসপাতালের নার্সিং সুপারভাইজার মরিয়ম খাতুন, সিনিয়র স্টাফ নার্স আনোয়ারা খাতুন, রেক্সোনা খাতুন, মর্জিনা খাতুন, আলমদিনা সুলতানা, কাকলি খাতুন, রিনা নাসরিন ও তানিয়া খাতুন। পরিছন্নকর্মীর দায়িত্বে ছিলেন প্রতিমা রানী দাস। সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) যশোর জেলা শাখার সাংস্কৃতিক ও আপ্যায়ন বিষয়ক সম্পাদক ডা. মাহমুদুল হাসান পান্নু ও দপ্তর সম্পাদক ডা. গোলাম মোর্তজা।

জান্নাতির স্বামী আলমগীর হোসেন জানিয়েছেন, আমি পেশায় একজন কৃষক। ভিটেবাড়ি ছাড়া নিজস্ব কোনো জমি নেই। আমার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর হতাশ হয়েছিলাম। পরে স্বাস্থ্যবিভাগের কর্মকর্তারা আমাকে ও আর স্ত্রীকে সাহস দিয়েছেন। তিনি আরো জানান, আমার স্ত্রীর চিকিৎসা থাকা খাওয় বাবদ আমাদের কোনো টাকা খরচ হয়নি। সরকারিভাবে সব খরচ বহন করা হয়েছে। এতে আমরা অনেক খুশি।

জান্নাতি বেগম জানান. ফের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছিলাম। ভেবেই নিয়েছিলাম গর্ভের সন্তানকে আর বাঁচাতে পারবোনা। ঠিক সেই মুহুর্তে যশোরের সিভিল সার্জন ডা. শেখ আবু শাহীন, চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা  ডা. লুৎফুন্নাহার লাকি, চিকিৎসক নেতা মাহমুদুল হাসান পান্নু ও গোলাম মোর্তজা সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। আল্লাহর রহমত ও তাদের আন্তরিকতায় আমি এখন সুস্থ। আমার সন্তানেক বুকে জড়িয়ে আদর করতে পারছি। জান্নাতি আরো বলেন, আমি কৃতজ্ঞ গাইনী বিভাগের সার্জন ডা. নিলুফা ইসলাম এমিলিসহ অন্যান্য চিকিৎসক সেবিকাদের প্রতি। যারা আমাকে অবহেলা না করে সম্মানের চোখে চিকিৎসাসেবা প্রদান করেছেন। চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা  ডা. লুৎফুন্নাহার লাকি জানিয়েছেন, শুরু থেকেই জান্নাতির পাশে থেকেছি। নবজাতক সন্তান কোলে নিয়ে জান্নাতির হাসিমুখ দেখে আমি খুশি ও আনন্দিত। আমি ব্যক্তিগত ভাবে জান্নাতি খাওয়ার জন্য কিছু ফল ও নবজাতক সন্তানের জন্য জামা কাপড় কিনে দিয়েছি।

সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসক গাইনী সার্জন নিলুফার ইসলাম এমিলি জানিয়েছেন, জান্নাতি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন শুনে আমি মহাখুশি। কেননা আমি অনেক ঝুঁকি নিয়েই ওই রোগীর সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করেছিলাম।

যশোরের সিভিল সার্জন ডা. শেখ আবু শাহীন জানিয়েছেন, ঢাকার বাইরে যশোরে প্রথম করোনা আক্রান্ত কোন রোগীর অস্ত্রোচার করা হয়েছে। অবশ্যই যশোরের চিকিৎসক সমাজের জন্য একটি বড় সাফল্য। স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে জান্নাতিকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানো হয়েছে। তাকে সম্মানের সাথে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স করে বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। সিভিল সার্জন আরো জানান, অস্ত্রোপচারের আগ পর্যন্ত জান্নাতির ৫ বার নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিলো। এরমধ্যে ৩ বার পজেটিভ ও ২ বার নেগেটিভ ফলাফল আসে। তার সর্বশেষ ১৩ তারিখের ফলাফলে নেগেটিভ ছিলো। বুধবার হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র প্রদানের পর জান্নাতিসহ ৫ জনের ফের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। অন্যরা হলো তার স্বামী আলমগীর হোসেন, নবজাতক সন্তান কারিনা সুলতানা আছিয়া, বড় মেয়ে ৮ বছরের নুসরাত জাহান রোজা ও  মা চায়না বেগম।  ফলাফল না আসা পর্যন্ত তাদেরকে নিজ বাড়িতে সামাজিক  দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হয়েছে। সিভিল সার্জন ডা. শেখ আবু শাহীন আরো জানান, জান্নাতির চিকিৎসাসেবার দায়িত্বে থাকা আরো ৪ জন চিকিৎসক ৫ সেবিকা ও ১ জন পরিছন্নকর্মী বুধবার থেকে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ২০ এপ্রিল গৃহবধূ জান্নাতি বেগম চৌগাছা  উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্øেক্সে ভর্তি হন। তার উপসর্গ সন্দেহজনক হলে ২১ এপ্রিল নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। ২২ এপ্রিল তিনি হাসপাতাল থেকে পালিয়ে বাড়িতে চলে যান। ২৩ এপ্রিলের ফলাফলে জান্নাতি খাতুন করোনায় শনাক্ত হন। এরপর তিনি  হোম আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত ৫ ও ৯ মে দুইবারের পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায় জান্নাতি খাতুনের করোনা নেগেটিভ। ৯ মে তাকে যশোর সিভিল সার্জন অফিসে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি করোনামুক্ত ঘোষণা করে সনদপত্র তুলে দেয়া হয়। এরপর সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের জন্য তাকে ভর্তি করা হয় যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে। কিন্তু অস্ত্রোপচারের আগেই গত ১২ মে জান্নাতির ফের করোনা পজেটিভ ফলাফল আসে।