সুপার সাইক্লোন আম্পানের তান্ডবে ভেসে গেল উপকূল মানুষের ঈদ আনন্দ

শাকিলা ইসলাম জুঁই, সাতক্ষীরা : সুপার সাইক্লোন আম্পানের তান্ডবে সাতক্ষীরা জেলায় ২২ হাজার ৭১৫টি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ও আংশিক ক্ষয় ক্ষতি হয়েছে ৬১ হাজার ঘরবাড়ি। এছাড়া কৃষি ক্ষাতে টাকার পরিমানে ক্ষতি হয়েছে ১৩৭ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। আর প্রাণী সম্পদের ক্ষতি হয়েছে ৭৭ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। আম্পানে বাতাসের তোড়ে ৭৫০টি বৈদ্যুতি খুঁটি ভেঙ্গে পড়েছে আর মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে আরও ৯৫৫টি বৈদ্যুতিক পোল। ফলে বিদ্যুৎ সঞ্চলন ব্যবস্থ্যা বন্ধ হয়ে গত দু’দিনে অচল হয়েপড়ে পুরো সাতক্ষীরা। এ অবস্থার মধ্যে সব চেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে জেলার সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগর ও আশাশুনিতে। কপোতাক্ষ, খোলপেটুয়া, মরিচ্চাপ, কাকশিয়ালী নদীসহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৫৭.৫০ কিলোমিটার বেড়িবাধের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফলে শ্যামনগর ও আশাশুনির অনেক বাঁধ এখনো মেরামত না হওয়ায় সেখানে দিনে দুই বার নীর জোয়ার ভাটা খেলছে। এ অবস্থায় উপকূল জুড়ে যে দিকেই চোখ যাবে শুধু পানি থৈ থৈ করছে। সুপার সাইক্লোন আম্ফানের তান্ডবে ভেসে গেছে উপকূলের ঈদ আনন্দ। প্রিয় জনের নতুন কাপর উপহার দেওয়া তো দূরের কথা অনেকেই সেমাই চিনি কেনার সাধ্যটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। প্রাণঘাতি নভেল করোনা ভাইরাসের সংকটের মধ্যে প্রলংয়কারি ঘূর্ণি ঝড় উপকূলের মানুষদের সর্বশান্তু করে দিয়েগেছে। এযেন মরার উপরে খাড়ার ঘাঁ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কাঁকড়া ও চিংড়ী চাষীরা। সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য মতে আম্ফানের তান্ডবে উপকূলীয় উপজেলা কালিগঞ্জ, শ্যামনগর ও আশাশুনিসহ মোট ৩টি উপজেলার ছোট বড় ১০ হাজার ২শ’৫৭টি চিংড়ী ও মৎস্য ঘের ভেসেগেছে। চিংড়ী মাছ, রেনু ও অবকাঠামোসহ মোট ১৭৬ কোটি টাকার ক্ষয় ক্ষতি হয়েছে। আর কাঁকড়া প্রজেক্ট ও চাষিদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে মোট ৪০ লক্ষ টাকা। এদিকে শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের দাঁতিনাখালী গ্রামের আকরাম হোসেন জানান, আম্ফানের তান্ডবে বাড়ীর সামনে চুনা নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে বাড়ী ঘর পানিতে থৈ থৈ করছে। ভেসে গেছে ১০০ বিঘা চিংড়ী ঘের ও তিনটি মিষ্টি পানির পুকুরসহ ২ হাজার ডিম দেওয়া মুরগীর(লেয়ার) খামার। ২০ লক্ষ টাকা ক্ষয় ক্ষতি হয়েছে তাদের। বাঁধ মেরামত না হওয়ায় চরম ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছেন তারা। তিনি কান্না জড়িত কন্ঠে জানান, এবারের ঈদ যেন তাদের কাছে মূর্তিমান দুঃষস্বপ্ন। বাড়ীতে বৃদ্ব মাতার ঔযু করার মত একটু মিষ্টি পানিও নাই। সেখানে আবার ঈদ। ঘুর্ণিঝড় আম্ফানের তান্ডব আর নদীর জলোচ্ছাসে ভাসিয়ে নিয়েগেছে তাদের ঈদ আনন্দ। পাশ্ববর্তী দাঁতিনাখালী গ্রামের ইটভাটা শ্রমিক মুছাগাইন জানান, করোনার কারনে দুই মাস ইটভাটায় কাজ বন্ধ। না খেয়ে অর্ধাহারে ভাই দিন পারকরছি। তাতে ঝড়ে চুনা নদীর বাঁধ ভেঙ্গে বাড়ীর উঠানে পানি উঠে আছে। জোয়ারে পানি উঠে আর ভাটিতে নেমে যায়। এই পরিস্থিতিতে তারা ঈদের আনন্দ ভূলে গেছে। বাড়ীতে চাল নেই, ঈদের জন্য এখনো সেমাই চিনিও কিনতে পারেননি। একই এলাকার দিনমজুর ফারুখগাজী জানান, মাটি কেটে আর নদীতে মাছ ধরে তাদের সংসার চলে। করোনা ভাইরাসের কারনে এখন আর কাজ নেই। বেশ কিছু দিন বাড়ীতে বেকার বসা। তার মধ্যে ঘুর্ণিঝড় আম্ফান তাদের চাল উড়িয়ে নিয়েগেছে। বাঁধ ভেঙ্গে নদীর পানিতে তলিয়ে আছে ঘরবাড়ী। দূর্গাবাটি ও দাঁতিনাখালি বাধ মেরামত না হওয়ায় বাড়ীর সাথে নদীর পানির জোয়ার-ভাটা খেলছে। সেখানে মুসলমান সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুলফিতরের বিষয়টি মনে নেই তাদের। কলবাড়ী এলাকার জিএম মোস্তাফিজুর জানান, আম্ফানের তান্ডবে বাধ ভেঙ্গে পানিতে ৩০ বিঘা চিংড়ী ঘের ভেসে গেছেও দুইটা কাকড়া প্রজেক্ট নষ্ট হয়েগেছে। এছাড়া কাঁকড়া প্রজেক্টের ১২ হাজার প্লাষ্টিকের বক্্র ভেসে গেছে। ক্ষতি হয়েছেন ১০ থেকে ১২ লক্ষ টাকা। তিনি জানান এবারের ঈদে মা ও ছোট ভাইয়ের জন্য কোন নতুন শাড়ী,পাঞ্জাবিসহ বিভিন্ন উপহার সামগ্রী কিনতে পারেনি। তাই মন খারাপ। কাছে নগদ কোন টাকাও নেই।চারিদিকে নদী বেষ্টিত সুন্দরবন সংলগ্ন গাবুরা ইউনিয়নের গাইনবাড়ী এলাকার হুসাই বিল্লাহ জানান, ঝড়ে তিনটা ঘর বিধ্বস্ত হয়ে পানিতে ভেসে গেছে। এখনো বাড়ীর উঠানে হাটু পানি। সরকারিভাবে এখনো কোন সাহায্য মেলেনি। ৬ জনেরসংসার নিয়ে কষ্টে আছি। ঈদের জন্য এখনো সেমাই দুধ ও চিন কিছুই কেনা হয়নি।সেখানে পরিবারের প্রিয়জনের জন্য নতুন কাপড়সহ উপহার সামগ্রী কেনা কাটার কথা ভাবতেই কষ্ট আরও বেশি হচ্ছে বলে জানান তিনি। প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাসের ভিতরে সুপার সাইক্লোন আম্ফানের তান্ডবে ক্ষতিগ্রস্থ্য সুন্দরবন সংলগ্ন শ্যামনগর,আশাশুনি উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি মানুষের দুঃখ দূর্দশা আরও চরম আকার ধারন করেছে। এবারের ঈদ আনন্দ তাদের কাছে ম্লান হয়ে গেছে। উপকুল জুড়ে যে দিকেই চোখ যাবে শুধু পানি আর পানি। এখনো শ্যামনগর ওআশাশুনির সাইক্লোনের তোড়ে ধসে যাওয়া বেড়িবাঁধ গুলো পুরোপুরি সংস্কার না হওয়ায় বাড়ীর আঙ্গিনাসহ খাল-বিল রাস্তাঘাট পানিতে থৈ থৈ করছে। নদীতে জোয়ার ভাটার কারনে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যেন সাইক্লোন আম্ফানে ভেসে গেছে উপকূলবাসীর ঈদ আনন্দ। তাই উপকূলবাসী ত্রাণ চাই না চাই বেড়িবাঁধ সংস্কার। আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মীর আলিফ রেজা জানান, সুপার সাইক্লোন আম্ফানে ৭ হাজার ৮শ’৫০টি বাড়ী সম্পুর্ন বিনষ্ট হয়েছে ও আংশিক ক্ষতি হয়েছে ১৫ হাজার ৬শ’ ঘরবাড়ী। এছাড়া এলজিইডির ৩০কিঃ মিটার রাস্তার আংশিক ক্ষতি হয়েছে। আর কপোতাক্ষের বাঁধ ভেঙ্গে প্লাবিত হয়েছে ৮ হাজার ৬শ’ ৯৮ হেক্টর মৎস্য ঘের। ২৪ কিলোমিটার ভেড়ি বাঁধ ক্ষতিগ্রস্থ্যের পাশাপাশি ৩শ’২৯ হেক্টর জমির কৃষির ক্ষতি হয়েছে। এদিকে শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আ.ন.ম আবুজর গিফারী জানান, ঘুর্ণিঝড় আম্ফানে ৩০ হাজার হেক্টর জমির চিংড়ী ঘের প্লাবিত হয়েছে। সাড়ে ৪হাজার মাটির ঘর-বাড়ি ভেঙ্গে পড়েছে। আংশিক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে আরও ১১ হাজার বাড়ি।