স্বর্ণ ব্যবসায় করোনার প্রভাব : চাকরি হারাচ্ছে কারিগররা

আবদুল কাদের : গত চারমাস ধরে কোনো বিক্রি নেই যশোরের সোনার দোকানে। তার উপর বেড়েছে সোনার দাম। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। হাতে গোনা কয়েকটি বড় দোকানি কর্মচারীদের বেতন দিলেও ছোট ব্যবসায়ীরা কর্মচারীদের কাজে রাখছে না। গত একমাসের ব্যবধানে শতাধিক স্বর্ণকর্মচারী কাজ হারিয়েছেন।

এদিকে সোনা ব্যবসায়ীদের ব্যবসা না থাকায় খারাপ অবস্থা স্বর্ণকারিগরদের। কেননা তারা কমিশন ভিত্তিতে টাকা পেয়ে থাকে। একভরি সোনার কাজ করলে টাকা পাওয়া যায় ৪ হাজার। কাজটি করতে কারিগরদের ৫-৭ দিন সময় লেগে যায়। কাজ না থাকায় স্বর্ণকারিগররা অসহায়ভাবে জীবন-যাপন করছেন। এপর্যন্ত স্বর্ণ ব্যবসায়ী সমিতি একবার চাল-ডাল দিয়েছে। আর কিছুই পায়নি তারা।

যশোর শহর ও আশপাশে ২২৫টি সোনার দোকান রয়েছে। যার মধ্যে শহরের এইচএমএম রোড ও চুড়িপট্টি সড়কে বেশিরভাগ দোকানের অবস্থান। চুড়িপট্টি সড়কের দোকানি স্বর্ণময়ী জুয়েলার্সের মালিক সঞ্জয় দাস জানান, গত ৪ মাস ধরে দোকানে কোন বিক্রি নেই। লকডাউনে ২ মাস বন্ধের পর দোকান খুললেও গত একমাস একটি টাকাও বিক্রি হয়নি। পুজি ভেঙে এপর্যন্ত খেয়েছি। এখন ঘরের সোনা বিক্রি কারা ছাড়া আর উপায় দেখছি না। আমার দোকানে ২জন কর্মচারী ছিল। তাদের অনুরোধ করলে তারা স্বেচ্ছায় দোকান ছেড়ে চলে গেছে। কি করব বুঝতে পারছি না।

এমদাদ হোসেন নামে অপর এক ব্যবসায়ী বলেন, কাজের অর্ডার পেলে বড় দোকান থেকে সোনা ধার করে মাল ডেলিভারি করতাম। এতে ভালো যাচ্ছিল আমার সংসার। বর্তমানে কোন কাজ না থাকায় ৫ জনের সংসার চলছে অন্যের সাহায্য নিয়ে। রাজিব পাল নামে এক কর্মচারী জানান, গত মাসে আমাদের বেতন দেয়া হয়নি। এমাসেও দেবে বলে মনে হচ্ছে না। করোনা আমাদের ধ্বংস করে দিল।

যশোর জুয়েলারি ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) সাধন কুমার ধর জানান, করোনা ভাইরাস আমাদের বাণিজ্য শেষ করে দিয়েছে। ছোট-বড় কোনো দোকানে স্বর্ণ বিক্রি নেই। তার উপর বেড়েছে সোনার দাম। এখন ২২ ক্যারেট সোনার ভরি ৬৯ হাজার ৮৬৭ টাকা। যা আগে ছিল ৬৪ হাজার ৪২ টাকা। এতে আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছি। সোনা ব্যবসায়ীরা দোকান ভাড়া ও সংসার চালাচ্ছেন পুজি ভেঙে। অনেক ছোট দোকানী কর্মচারী ছাঁটাই করছে বলে শুনেছি।

যশোর জুয়েলারি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এবং বৃহৎ ব্যবসায়ী চৌধুরী গোল্ড হাউজের স্বত্তাধিকারী রকিবুল ইসলাম চৌধুরী সঞ্জয় জানান, মানুষের হাতে টাকা না থাকলে এমনিতে সোনার দোকানে তারা আসে না। আবার উচ্চবিত্তরা করোনার কারণে বাইরে বের হচ্ছে না। এতে আমাদের ব্যবসায় ধংস নেমেছে। অসচ্ছল দোকানিরা কর্মচারী টানতে পারছে না। যেকারণে অনেকে কর্মচারি রাখছে না।

শহরের বেজপাড়ার বাসিন্দা রতন কুমারের স্বর্ণকার পেশায় হাতেখড়ি শৈশবে। শুরু হয়েছিল অন্য মহাজনের অধীনে শ্রমিক হিসেবে। বদ্ধ-ঘিঞ্জি কারখানায় রাসায়নিকের ঝাঁজ সহ্য করতে করতে বড় হয়েছেন তিনি। হারিয়েছেন চোখের স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তিও।

৩৮ বছর বয়সী রতন ২শ বর্গফুটের এক ছোট কারখানার শেয়ারে মালিক। যে পরিবেশে কাজ করতে করতে বড় হয়েছেন, সেই একই পরিবেশ এখন তার কারখানায়ও। ছোট জায়গার মধ্যেই গাদাগাদি করে কাজ করছেন ৮জন শ্রমিক। কারখানার মধ্যে স্বর্ণ পরিষ্কারের কাজে ব্যবহৃত সালফিউরিক আর নাইট্রিক অ্যাসিডের তীব্র ঝাঁজ।

স্বর্ণ কারিগর রতন জানান, সার্বিকভাবেই পেশাটির অবস্থা অনেক আগে থেকেই ভালো না। ইমিটেশনের বাজার সম্প্রসারণে সংকটে পড়েছে স্বর্ণকারদের জীবন-জীবিকাও। তারপর এসেছে করোনার থাবা। গত ৪ মাস ধরে সোনার দোকানগুলোতে ব্যবসা নেই। তিনি বলেন, আমরা কমিশন ভিত্তিতে টাকা পায়। একভরি সোনার কাজ করলে সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা পাওয়া যায়। কাজটি করতে ৫-৭ দিন সময় লাগে। আবার কেউ কঠোর পরিশ্রম করলে ৩-৪ দিন লাগে। এতে ভালো কাজের অর্ডার পেলে একজন কারিগর মাসে ১২-১৫ হাজার টাকা আয় করে। এনিয়ে আমাদের সংসার চালাতে হয়। কিন্তু গত ৪মাস বসে পুজি ভেঙে খেয়েছি। এখন ধার-দেনা করে চলতে হচ্ছে। কোনো সহায়তা মেলেনি।

অপর কারিগর সিটিকলেজ পাড়ার বাসিন্দা সঞ্জিত কুমার বলেন, অনেক কষ্টে দিন কাটছে। স্থানীয়দের কিছু ত্রাণ পেয়ে খেয়ে যাচ্ছি। ঘরে যে টাকা ছিল তা শেষ হয়ে গেছে। স্ত্রীর সোনা বিক্রি করতে চাইলেও ক্রেতা পাচ্ছি না।

যশোর জুয়েলারি কারিগর সমিতির সভাপতি দিপ্তি ঘোষ জানান, শুধুমাত্র শহরে দেড় হাজার স্বর্ণ করিগর রয়েছে। সমিতির সদস্য আছে ৭শ। যারা কাজের উপর কমিশন পেয়ে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে। এমনিতে সোনার কাজ আগের চেয়ে কমে গেছে। তার উপর মরণ কামড় দিয়েছে করোনা ভাইরাস। এভাবে চললে স্বর্ণ করিগররা না খেয়ে মরবে। স্বর্ণ ব্যবসায়ী সমিতি একবার চাল-ডাল দিয়েছে আমাদের।