যশোরে পুলিশ কর্মকর্তার শাশুড়ি ও চিকিৎসকের স্ত্রী সন্তানসহ শনাক্ত ৪২

বিল্লাল হোসেন : যশোরে কোভিড-১৯ নভেল করোনাভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে ৫শ’ ছাড়িয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার ১৪২ নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত ৪২ জনের মধ্যে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৯ জন। আক্রান্তের তালিকায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের শাশুড়ি, পূর্বে শনাক্ত দন্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের স্ত্রী সন্তান, ১ জন সেবিকা, ২ জন ব্যাংক কর্মকর্তা ও ফায়ার সার্ভিসের ১ জন সদস্য, রয়েছেন। এছাড়া উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া শামিমুর রহমানের ফলাফল পজেটিভ এসেছে। এ নিয়ে সোমবার পর্যন্ত করে যশোরে ৫৬২ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। রেডজোন এলাকায় বেড়েই চলেছে আক্রান্তের সংখ্যা। সোমবারও শহরের রেডজোন এলাকায় ১৭ জন শনাক্ত হয়েছেন। এরজন্য অসচেতনতাকে দায়ী করেছেন স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা।

যশোর সিভিল সার্জন অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত তথ্য কর্মকর্তা ডা. রেহেনেওয়াজ জানিয়েছেন, সোমবার যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) জিনোম সেন্টার থেকে ১৪২ নমুনা পরীক্ষার ফলাফল পাঠানো হয়। এতে করোনা পজেটিভ শনাক্ত হয় ৪২ জন। এরমধ্যে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৯ জন। এরমধ্যে যশোর সদর উপজেলায় ২৭ জন, চৌগাছা উপজেলায় ২ জন , শার্শা উপজেলায় ৪ জন, ঝিকরগাছা উপজেলায় ১ জন, কেশবপুর উপজেলায় ৫ জন রয়েছেন। এছাড়া যে ৩ জন পুরাতন রোগীর ফলাফল ফলোআপ পজেটিভ এসেছে তার মধ্যে শার্শা উপজেলায় ১ জন, কেশবপুর উপজেলায় ১ জন ও মণিরামপুর উপজেলায় ১ জন। ডা. রেহেনেওয়াজ আরো জানান, করোনায় আাক্রান্ত সন্দেহে সোমবার যশোর জেলার আরও ১১০ জনের নমুনা সংগ্রহ করে যবিপ্রবি ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। তথ্য কর্মকর্তা ডা. রেহেনেওয়াজ জানিয়েছেন, উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া

যশোর শহরের চুয়াডাঙ্গা বাস স্ট্যান্ডের আনোয়ারা ফার্মেসির মালিক শামিমুর রহমান (৩৮) করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন বলে ফলাফলে প্রমাণ মিলেছে। যশোর শহরের কাজীপাড়ার বাসিন্দা আনিসুর রহমানের ছেলে। ২৬ জুন (শুক্রবার) রাত পৌনে ১০ টার দিকে শামিমুর রহমান খুলনার বেসরকারি একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এরআগে শুক্রবার সকালে তাকে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিলো। সেখানে তার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠানো হয়েছিলো। তার উন্নত চিকিৎসার জন্য শুক্রবার দুপুরে স্বজনরা তাকে খুলনায় নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত পৌনে ১০ টার দিকে শামিমুর মারা যায়। এক প্রশ্নের উত্তরে ডা. রেহেনেওয়াজ জানান, সোমবারও যশোর শহরের রেডজোন এলাকায় ১৭ জন করোনা আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে। রেডজোন এলাকায় এভাবে প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে চললেও মানুষের মাঝে কোনো ভীতি নেই। তারা করোনাকে পরোয়া না করে ইচ্ছামতো চলাফেরা করছেন। একপ্রকার তারা লকডাউন মানছেন না। এতে করে পরিস্থিতি বেসামাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

যশোর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. আদনান ইমতিয়াজ জানান, সদর উপজেলায় ২৭ জনের মধ্যে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের (খ সার্কেল ) শাশুড়ি, যশোর শহরের ঘোপ এলাকায় পূর্বে আক্রান্ত দন্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের স্ত্রী ও সন্তান , যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের ১ জন সেবিকা, ১ জন পরিছন্নকর্মী ও তার সন্তান, ১ জন ওয়ার্ড বয়ের স্ত্রী, বেজপাড়া পূজা মন্দির এলাকায় পূর্বে আক্রান্ত এক পল্লী চিকিৎসকের পরিবারের ৩ জন, বেজপাড়া নলডাঙ্গা রোডের ১ জন যুবক, নাজির শংকরপর এলাকার ১ জন ব্যাংক কর্মকর্তা, উপশহর বি ব্লকের ১ জন বৃদ্ধা, চুড়ামনকাটির ছাতিয়ানতলা গ্রামে পূর্বে করোনায় আক্রান্ত মৃত রোগীর ছেলে, কিসমত নওয়াপাড়ার ১ জন ব্যাংক কর্মকর্তা, বোলপুর গ্রামের বাসিন্দা সিভিল সার্জন অফিসের ১ জন কর্মচারী, ভেকুটিয়া কারিগরপাড়ার ১ জন নারী, ঝুমঝুমপুর এলাকার ২ জন পুরুষ, ও যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের ২ জন রোগী। বাকি ১ জনের ঠিকানা পাওয়া যায়নি। আক্রান্তদের বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে। তারা হোম আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. লুৎফুন্নাহার লাকি জানিয়েছেন, নতুন করে আক্রান্ত ২ জনের মধ্যে ১ জনের বাড়ি পৌরসভার পাঁচনামনা গ্রামে। তিনি শার্শা উপজেলার পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে একজন কর্মী। অপরজনের বাড়ি উপজেলার মাঠচাকলা গ্রামে। তাদের বাড়ি লকডাউন করেছে উপজেলা প্রশাসন। তারা হোম আইসোলেশনে রয়েছে

শার্শা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা.ইউসুফ আলী জানান, নতুন আক্রান্ত ৪ জনের মধ্যে ১ জন ফায়ার সার্ভিসের সদস্য রয়েছেন। তার বসবাস বেনাপোল ৭ নম্বর ওয়ার্ডে। অন্য ৩ জনের মধ্যে বেনাপোল পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ২ জন ও উলাশী ইউনিয়নের খাজুরা গ্রামের ১ জন। তারা হোম আইসোলেশনে রয়েছেন। বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে। কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আলমগীর হোসেন জানিয়েছেন, কেশবপুর নতুন করে আক্রান্ত ৫ জনের মধ্যে এক শিক্ষক পরিবারের ৩ জন রয়েছেন। তাদের বসবাস মধুসড়ক এলাকায়। বাকি ২ জনের মধ্যে কেশবপুর কলেজ পাড়ার ১ জন এনজিও কর্মী ও বাইষা গ্রামের ১ জন যুবক। তারা নিজ বাড়ি চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বাড়ি লকডাইন করা হয়েছে।

ঝিকরগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান জানান, নতুন আক্রান্ত ১ জনের বাড়ি লকডাউন করার জন্য উপজেলা প্রশাসনকে বলা হয়েছে।

যবিপ্রবির এনএফটি বিভাগের চেয়ারম্যান ও পরীক্ষণ দলের সদস্য ড. শিরিন নিগার জানিয়েছেন, জিনোম সেন্টারে যশোর জেলার ৪২ জন ছাড়াও মাগুরা জেলার ৪২ জনের নমুনা পরীক্ষায়

১১ জন, বাগেরহাট জেলার ৬৩ নমুনা পরীক্ষায় ৭ জন ও সাতক্ষীরা জেলার ৩০ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৯ জনের শরীরে কোভিডের জীবাণু পাওয়া গেছে। সবমিলিয়ে ২৭৭ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৬৯ জনের করোনা পজিটিভ এবং ২০৮ জনের নেগেটিভ ফলাফল এসেছে। যশোরের সিভিল সার্জন ডা. শেখ আবু শাহীন জানান, সোমবার পর্যন্ত জেলায় মোট ৫৬২ জন করোনা রোগী শনাক্ত হলেন। সুস্থ হয়েছেন ১৭২ জন। মারা গেছেন ১০ জন। যশোর শহরের রেডজোনে রোগী বাড়ার বিষয়ে তিনি মানুষের অসচেনতাকে দায়ি করেছেন। তিনি বলেন রেডজোনে মানুষের ইচ্ছামতো চলাচলে বিষয়ে কঠোরতা জারি করার জন্য জেলা প্রশাসনকে জানাবেন।