করোনা উপসর্গে মৃত্যু আরও  ১, যশোরে রেকর্ড ৬২ জন শনাক্তের দিনে আক্রান্ত ছাড়ালো ৭শ

বিল্লাল হোসেন : যশোরে কোভিড-১৯ নভেল করোনাভাইরাস পরিস্থিতি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ছে। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টায় ৬২ জনের করোনা শনাক্তের মধ্যে দিয়ে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে ২ জন চিকিৎসক,  ১ জন সেবিকা,  ৪ জন ব্যাংকার, ৩ জন পুলিশ ও ৩ জন র‌্যাব সদস্য রয়েছেন। এ নিয়ে জেলায় করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৭শ’ ছাড়িয়েছে। ভয়ঙ্কর করোনা পরিস্থিতে যশোরবাসী রীতিমতো আতঙ্কগ্রস্ত।

এদিকে, বৃহস্পতিবার করোনা উপসর্গ নিয়ে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে  চিকিৎসাধীন স্বপন চক্রবর্তী (৬২) মারা গেছেন।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আরিফ আহমেদ জানান, ঝিকরগাছা উপজেলার উপজেলার কৃষ্ণনগর গ্রামের  শ্যামাপদ চক্রবর্তীর ছেলে স্বপন চক্রবর্তী করোনার উপসর্গ নিয়ে বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে ভর্তি হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেলা ৯টা ২০ মিনিটে দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্যবিধি মেনে দাফন করার জন্য স্বজনদের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

যশোর সিভিল সার্জন অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত তথ্য কর্মকর্তা ডা. রেহেনেওয়াজ জানিয়েছেন, জেলার ২৪১ নমুনা পরীক্ষায়  ৬২ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে বলে বৃহস্পতিবার ফলাফল প্রকাশ করেছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) কর্তৃপক্ষ। শনাক্তের মধ্যে নতুন  আক্রান্তের তালিকায় রয়েছেন ৬০ জন। এরমধ্যে যশোর জেলার ৫৯ জনের মধ্যে ১ জনের হদিস পাওয়া যায়নি। আরেকজনের  ফলাফল মাগুরা জেলায় হস্তান্তর করা হয়েছে। কারণ তিনি মাগুরার রোগী বলে জানতে পেরেছি। এছাড়া ২ জন পুরাতন রোগীর নমুনা পরীক্ষার ফলাফল ফলোআপ পজেটিভ এসেছে। ডা. রেহেনেওয়াজ আরও জানান, আক্রান্তদের মধ্যে যশোর সদর উপজেলায় ৩০ জন, শার্শা উপজেলার ৬ জন, চৌগাছা উপজেলার ৪ জন, বাঘারপাড়া উপজেলার ২ জন, কেশবপুর উপজেলার ৪ জন ও অভয়নগর উপজেলার ৬ জন। ডা. রেহেনেওয়াজ আরো জানান, করোনা আক্রান্ত সন্দেহে বৃহস্পতিবার যশোর জেলার আরও ২শ ৭৩ জনের নমুনা পরীক্ষার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (খুমেক) ল্যাবে পাঠানো হয়েছে।

যশোর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য উপজেলার মেডিকেল অফিসার (রোগ নিয়ন্ত্রন)  ডা. এ এন এম নাসিম ফেরদৌস জানান, সদর উপজেলায় আক্রান্ত ৩০ জনের মধ্যে শহরের পুরাতন কসবা কাজীপাড়ার বাসিন্দা আদ-দ্বীনের চিকিৎসক কর্মকর্তা ও তার স্ত্রী সন্তান, শহদি মশিউর রহমান সড়ক এলাকার বাসিন্দা ১ জন চিকিৎসক, বেজপাড়া পূজা মন্ডব এলাকার বাসিন্দা যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে দায়িত্বরত ১ জন সেবিকা, ট্রাফিক কার্যালয়ের ২ জন সদস্য, পুলিশ লাইন এলাকায় বসবাসকারী ১ জন নারী পুলিশ সদস্য, বকচরের র‌্যাব অফিসের ডিএডিসহ ৩ জন সদস্য, এমকে রোড এলাকার ১ জন ব্যাংকার, রেলরোড এলাকার ১ জন ব্যাংকার, মাইকপট্টি এলাকার ১ জন ব্যাংকার,  ঝুমঝুমপুর এলাকার ১ জন ব্যাংকার, ঘোপ জেলরোড এলাকায় বসবাসকারী আওয়ামীলীগের ১জন নেত্রী, ঘোপ নওয়াপাড়ার রোডের ১ জন ফার্মাসিস্ট, বেজপাড়া সাদেক দারোগা মোড়ের ২জন , পূর্ব বারান্দীপাড়ার বসবাসকারী সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মকর্তাসহ ২ জন, পোস্ট অফিস পাড়ার ১ জন, বাহাদুরপুর এলাকার এক শিক্ষার্থী, চাঁচড়া রায়পাড়ার ১ জন, নিরালা পট্টির ১ জন। এছাড়া ৩ জনের হদিস পাওয়া যায়নি। তাদের মোবাইল ফোনের নম্বরও বন্ধ। বর্তমানে তারা হোমআইসোলেশনে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে।

শার্শা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইউসুফ আলী জানান, আক্রান্ত ৬ জনের মধ্যে ৪ জন পুরুষ ও ২ জন নারী রয়েছেন। পুরুষদের মধ্যে ১ জন কিশোর, ৩ জন যুবক ও ১ জন বৃদ্ধ। আর নারীদের ১ জনের বয়স (৩৫) ও অপরজনের (৩৩)। তারা হোমআইসোলেশনে চিকিৎসাধীন। উপজেলা প্রশাসন তাদের বাড়ি লকডাউন করেছে।

চৌগাছা উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. লুৎফুন্নাহার লাকি জানান , আক্রান্ত ৪ জনের মধ্যে ১ জন চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (সেকমো) ও ১ জন অফিস সহকারী। বাকি ২ জনের মধ্যে উপজেলার মাশিলা এলাকার ১ জন পুরুষ ও অপরজনের বাড়ি যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি গ্রামের দৌগাছিয়া গ্রামে। সকলেই হোমআইসোলেশনে রয়েছেন। বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে।

অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহমুদুর রহমান রিজভী জানিয়েছেন, আক্রান্ত ৬ জনের মধ্যে গুয়াখোলার ৫ জন রয়েছেন। তার মধ্যে ২ জন পুরুষ ও ৩ জন নারী। এছাড়া বুইকারা গ্রামের ১ জন নারী।

মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শুভ্রা রানী দেবনাথ জানান, মণিরামপুরে নতুন করে

আক্রান্ত ৭ জনের মধ্যে মণিরামপুর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসের ১ জন নারী কর্মী,  হাসপাতালের সামনের এলাকায় বসবাসকারী পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের ১ জন লাইনম্যান, হাকোবা গ্রামে ১ জন পুরুষ, খানপুর গ্রামের ১ জন পুরুষ, পাতন গ্রামের ১ জন পুরুষ, উত্তর লাউড়ি গ্রামের ১ জন পুরুষ ও জুড়ানপুর গ্রামের ১ জন পুরুষ। তারা হোমআইসোলেশনে রয়েছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সহকারী সার্জন অনুপ বর্সু নেতৃত্বে আক্রান্তের বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে। আক্রান্তরা হোমআইসোলেশনে রয়েছেন।

কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আলমগীর হোসেন জানিয়েছেন, কেশবপুরে নতুন

৪ জনের মধ্যে ১ জন পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের ১ জন পুরুষ (৪৭), ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর (৪৩), একই ওয়ার্ডের একজন পুরুষ (৫৬) ও পাজিয়া ইউনিয়নের পাথরঘাটা গ্রামের ১ জন যুবক (২৬)। তারা হোমআইসোলেশনে রয়েছেন।  উপজেলআ প্রশাসন বাড়ি লকডাউন করেছে।

বাঘারপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য  কমপ্লেক্সের  আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. কৌশিক আশরাফ জানান, নতুন আক্রান্ত ২ জনের মধ্যে ১ জন ভিটাবল্যা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক  অপরজন পুরুষ বসবাস করেন পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডে। তারা হোমআইসোলেশনে রয়েছেন। বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে। যবিপ্রবির এনএফটি বিভাগের চেয়ারম্যান ও পরীক্ষণ দলের সদস্য ড. শিরিন নিগার জানিয়েছেন, জেনোম সেন্টারে যশোর জেলার  ৬২ জন ছাড়াও মাগুরা জেলার  ৩৪ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৪ জনের শরীরে কোভিডের জীবাণু পাওয়া গেছে।  সবমিলিয়ে ২৭৫ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৬৬ জনের করোনা পজিটিভ এবং ২০৯ জনের নেগেটিভ ফলাফল এসেছে।

যশোরের সিভিল সার্জন ডা.শেখ আবু শাহীন জানান, একদিনে ৬২ জনের করোনা শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি সর্বোচ্চ রেকর্ড। এরআগে একদিনে এতো করোনা রোগী শনাক্ত হয়নি। জনসচেতনতামূলক প্রচারণা বৃদ্ধি করার অনুরোধ জানিয়ে সিভিল সার্জন বলেন, সচেতনতা ছাড়া নিজে, পরিবার ও সমাজকে রক্ষা করার আর কোনও উপায় নেই। যশোরে সামাজিকভাবে করোনা ছড়িয়ে পড়েছে।

উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত যশোর জেলার ৫ হাজার ৩শ’ ২ জনের নমুনা পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। ফলাফল এসেছে ৪ হাজার ৪শ’ ৭৮ জনের। এরমধ্যে করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে ৭শ’ ৮ জন। সুস্থ হয়েছে ২শ’৪০ জন। এছাড়া মারা গেছেন ১৩ জন।