কিশোর থাকবে না অথচ আমি থাকব, এখনও দুঃস্বপ্ন মনে হয় : লিপিকা

স্পন্দন বিনোদন ডেস্ক : চলেই গেলেন বাংলাদেশের প্লেব্যাক সম্রাট এন্ড্রু কিশোর! প্রায় ৯ মাস সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা করেও ক্যানসার নির্মুল হয়নি প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী এন্ড্রু কিশোরের। চিকিৎসক হাল ছেড়ে দেওয়ায় ক্যানসার নিয়েই ফিরতে হয়েছে দেশে।

১১ জুন দেশে ফেরার পর ২০ জুন থেকে ছিলেন- রাজশাহীতে বড় বোন ডা. শিখা বিশ্বাসের বাড়িতে। ওই বাড়ির একটি অংশেই ক্লিনিক। সেখানেই সেবা সুস্রস্রা চলছিল তার। কিন্তু সবাইকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে ৬৫ বছর বয়সে সোমবার (৬ জুলাই) সন্ধ্যা ৬টা ৫৫ মিনিটে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন- বাংলাদেশের এই কিংবিদন্তি শিল্পী।

এর আগে তাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আবেঘ ঘন স্ট্যাটাস দেন তার সদর্মীনি লিপিকা এন্ড্রু। লেখেন, ‘এটাই শেষ পোস্ট, এর পর আর কিছু বলা বা লেখার মত আমার মানসিক অবস্থা থাকবে না। এখনও মাঝে মাঝে দুঃস্বপ্ন মনে হয়। কিশোর থাকবে না অথচ আমি থাকব। মেনে নিতে পারছি না। এই অসময়ে সবাই সাবধানে থাকবেন। নিজের প্রতি যত্ন নিবেন, সুস্থ থাকবেন, ভাল থাকবেন। আর এন্ড্রু কিশোরের প্রতি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টি রাখবেন। প্রাণ খুলে দোয়া করবেন।’

রোববার ( ৫ জুলাই) রাতে এন্ড্রু কিশোরের ফেসবুকে পেইজে দেয়া এক পোস্টে তিনি স্বামীর জন্য দোয়া চান। তিনি এন্ড্রু কিশোরের চিকিৎসা, দেশে ফেরা এবং বর্তমান শারীরিক অবস্থা নিয়ে লেখেন। আবেগঘন এই পোস্টে ভাল কোন খবর নেই। পোস্টটি পড়ে চোখের জল ঝরাচ্ছেন এন্ড্রুভক্তরা।

লিপিকা লেখেন, গত বছর ৯ সেপ্টেম্বর তারা সিঙ্গাপুর গিয়েছিলেন। সেখানে এন্ড্রু কিশোরের ক্যানসার ধরা পড়ে। তারপর কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি শেষ হয় এপ্রিল মাসে। চিকিৎসক বলেছিলেন, এখন আর কিছু দরকার নাই। ওষুধ দিয়ে বলেছিলেন, আগস্ট মাসে যেতে। তারা ১৩ মে দেশে আসার জন্য টিকেট কাটেন। কিন্তু কিশোর শারীরিকভাবে খুব দুর্বল ছিলেন।
তাই ইতি টিকিট বাতিল করেন।

চিকিৎসক বলেন, কেমোর জন্য এন্ড্রু কিশোর দুর্বল। আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে, সময় লাগবে। পরে ১০ জুন তারা আবার টিকিট কাটেন। কিন্তু হঠাৎ ২ জুন কিশোরের হালকা জ্বর আসে। পরদিন রাতে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। তাই ৪ জুন হাসপাতালে ভর্তি করেন চিকিৎসক। কিন্তু জ্বর বার বার আসতে থাকে। কোন ওষুধ তার শরীরে কাজ করছিল না। চিকিৎসক বলেছিলেন, ক্যানসার আবারও আসছে কিনা তা দেখতে হবে। পরীক্ষার পর দেখা যায় এন্ড্রু কিশোরের শরীরে সেটিই ঘটেছে।

লিপিকা লেখেন, ‘হাসপাতালের ডাক্তার আমাকে ফোন করে বলেন, পেট স্ক্যান করতে হবে। লিম্ফোমা ব্যাক করেছে কিনা দেখতে হবে। আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম, মনে মনে শুধু ঈশ্বরকে ডেকেছি। কারণ শুরুতে ডাক্তার বলেছিলেন, লিম্ফোমা যদি একবারে নির্মূল না হয়, যদি আবার আসে। তাহলে সেটা ডাবল স্ট্রং হয়ে আসে আর খুব দ্রুত ছড়ায় এবং সেটা কোনভাবেই কন্ট্রোল সম্ভব হয় না।’

তিনি লেখেন, ‘৯ জুন পেট স্ক্যান হয়। সেদিন রাতে ডাক্তার আমাকে ফোন করে বলেন যে, পরদিন মানে ১০ জুন সকাল ১০টায় আমার সাথে রিপোর্ট নিয়ে আলাদা করে কথা বলতে চান। ৯ জুন রাতটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রাত। আমি সারারাত ঘুমাতে পারিনি। সকালে ১০টার আগে হাসপাতালে গিয়ে বসে থাকি কিশোরের পাশে। কিশোর আমাকে বলল, ডাক্তারকে বলবা, হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দিতে, আমরা দেশে ফিরবো। আমি ভয়ে চুপ করে বসে আছি। শুধু বললাম, দেখি ডাক্তার কি বলে। কিছুক্ষণ পরে একজন নার্স এসে আমার হাত ধরে টেনে বাইরে নিয়ে গেল, বলল ডাক্তার ডাকছে। ডা. লিম আমার সামনে এসে একটাই কথা বলল। লিম্ফোমা ব্যাক করেছে।’

‘আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি, কোন কথা বলতে পারছিলাম না, বুঝলাম সব শেষ। ডাক্তার বললেন, এন্ড্রুকে বলব ? আমি বললাম, বলতে তো হবে। ডাক্তার আমাকে কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে নিয়ে গেলেন এবং দেখালেন। এড্রিনাল গ্ল্যান্ডে কিছু নাই। কিন্তু লিম্ফোমা ভাইরাস ডান দিকের লিভার এবং স্পাইনালে ছড়িয়ে গিয়েছে এবং শরীরের বিভিন্ন জায়গায় অল্প অল্প আছে। আমি কোন কথা বলতে পারছিলাম না। চোখের জল ঠেকাতে পারছিলাম না, অনেক কষ্টে ডাক্তার কে বললাম হট নেক্সট? ডাক্তার
বললেন, আই অ্যাম স্যরি। আমার আর কিছুই করার নাই। আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি। চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ে যাচ্ছে। নিজেকে এত অসহায় লাগছিল যে, কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। কিশোর বুঝতে পেরেছিল, আমাকে ডাকতে থাকে। ডাক্তার কিশোরকে বলে লিম্ফোমা ব্যাক করেছে।’

লিপিকা আরও লেখেন, ‘কিশোর ডাক্তারকে বলে, তুমি আজই আমাকে রিলিজ করো, আমি আমার দেশে মরতে চাই, এখানে না, আমি কাল দেশে ফিরব। আমাকে বলে, আমি তো মেনে নিয়েছি, সব ঈশ্বরের ইচ্ছা, আমি তো কাঁদছি না। তুমি কাঁদছ কেন? কিশোর খুব স্বাভাবিক ছিল, মানসিকভাবে আগে থেকে প্রস্তুত ছিল। যেদিন থেকে জ্বর এসেছিল সেদিন থেকে। কিশোর হাইকমিশনে ফোন করে বলে, কালই আমার ফেরার প্লেন ঠিক করে দেন। আমি মরে গেলে আপনাদের বেশি ঝামেলা হবে, জীবিত অবস্থায় পাঠাতে সহজ হবে। ১০ জুন বিকালে হাসপাতাল থেকে ফিরি এবং ১১ জুন রাতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে দেশে ফিরে আসি আমরা।’

তিনি লেখেন, ‘ঈশ্বরের কি খেলা, ১০ জুন আমরা সম্পূর্ণ পজিটিভ রেজাল্ট নিয়ে ফিরতে চেয়েছিলাম। অথচ ১১ জুন ফিরলাম পুরো নেগেটিভ রেজাল্ট নিয়ে। আমি ডাক্তারের কাছে জানতে চেয়েছিলাম আর কতদিন? সে এটা লিখেছিল- ভবিষ্যৎবাণী করা কঠিন। তবে সাধারণত মাস থেকে বছর।’

‘এখন কিশোর কোন কথা বলে না। চুপচাপ চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে। আমি বলি কি ভাব, বলে কিছু না, পুরানো কথা মনে পড়ে আর ঈশ্বরকে বলি আমাকে তাড়াতাড়ি নিয়ে যাও, বেশি কষ্ট দিও না।’ – লেখেন লিপিকা।

স্বামীর জন্য দোয়া চেয়ে লেখেন, ‘ক্যানসারের লাস্ট স্টেজ খুব যন্ত্রনাদায়ক ও কষ্টের হয়। এন্ড্রু কিশোরের জন্য সবাই প্রাণ খুলে দোয়া করবেন। যেন কম কষ্ট পায় এবং একটু শান্তিতে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে যেতে পারে। আমার মনে হল, কিশোর শুধু আমার বা আমাদের সন্তানের বা আমাদের পরিবারের নয় বরং দেশের মানুষের একটা অংশ বা সম্পদ। তাই এই কথাগুলো দেশের ভক্ত স্রোতাদের বলা বা জানানো আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।’

এ ব্যাপারে এটা শেষ পোস্ট উল্লেখ করেন লিপিকা। লেখেন, ‘এটাই শেষ পোস্ট, এর পর আর কিছু বলা বা লেখার মত আমার মানসিক অবস্থা থাকবে না। এখনও মাঝে মাঝে দুঃস্বপ্ন মনে হয়। কিশোর থাকবে না অথচ আমি থাকব। মেনে নিতে পারছি না। এই অসময়ে সবাই সাবধানে থাকবেন। নিজের প্রতি যত্ন নিবেন, সুস্থ থাকবেন, ভাল থাকবেন। আর এন্ড্রু কিশোরের প্রতি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টি রাখবেন। প্রাণ খুলে দোয়া করবেন।’

১৯৫৫ সালের ৪ নভেম্বর রাজশাহীতে জন্মগ্রহণ করেন এন্ড্রু কিশোর। সেখানেই কেটেছে তার শৈশব ও কৈশোর। এন্ড্রু কিশোর প্রাথমিকভাবে সংগীতের পাঠ শুরু করেন রাজশাহীর খ্যাতনামা ওস্তাদ আবদুল আজিজ বাচ্চুর কাছে। একসময় গানের নেশায় রাজধানীতে ছুটে আসেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, আধুনিক গান, লোকগান ও দেশাত্মবোধক গানে রেডিওর তালিকাভুক্ত শিল্পী হন।

রাজশাহীতে জন্ম নেয়া এন্ড্রু কিশোর ১৯৭৭ সালে ‘মেইল ট্রেন’ চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে প্লেব্যাকে যাত্রা শুরু করেন। এরপর আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। নিজেকে নিয়ে গিয়েছেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। ‘জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প’, ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’, ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’, ‘আমার সারা দেহ খেও গো মাটি’, ‘আমার বুকের মধ্যে খানে’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় বাংলা গান উপহার দিয়েছেন শ্রোতাদের।

প্লে ব্যাক সম্রাট এন্ড্রু কিশোর সব সময় সাদামাটা জীবনযাপন করেছেন। কখনও তাকে নিয়ে কোন বিতর্ক ওঠেনি। তার শরীরে ক্যানসার ধরা পড়ার আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে চিকিৎসার জন্য ১০ লাখ টাকা সহায়তা করেছিলেন। পাশাপাশি ‘গো ফান্ড মি’ নামে এক ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করা হয়। সহশিল্পীদের মধ্যেও অনেকে তার পাশে দাঁড়ান। কিন্তু চিকিৎসায় তার সুস্থতা আসেনি। বাংলাদেশের জনপ্রিয় এই শিল্পীর এই প্রস্থান তাই কেউ যেন আর মানতে পারছেন না।