জলবায়ূ উদ্বাস্তু ৬০০ পরিবার বুঝে পেলো ফ্ল্যাটের চাবি

বিডিনিউজ : তিন দশক আগে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে ঘরবাড়ি হারিয়ে কক্সবাজার বিমানবন্দর লাগোয়া সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় উদ্বুস্তু জীবন কাটানো ছয়শ পরিবার পেল নতুন ঠিকানা।

কক্সবাজার সদরের খুরুশকুলে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্পে তারা বুঝে পেলেন নতুন ফ্ল্যাট।

বৃহস্পতিবার সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। আর অনুষ্ঠানের কক্সবাজার প্রান্তে জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারগুলোর হাতে তুলে দেওয়া হয় ফ্ল্যাটের চাবি।

তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে বলেন, “খুরুশকুলে আলাদা একটি সুন্দর শহর গড়ে উঠবে। আপনারা এতদিন যেভাবে ছিলেন কষ্টের মধ্যে, আমি নিজে গিয়েছি, আমি দেখেছি সেই জায়গা, কাজেই আপনারা এখানে সুন্দরভাবে বসবাস করতে পারবেন। আপনাদের ছেলেমেয়েরাও ভালোভাবে বড় হবে, মানুষের মত মানুষ হবে, সেটাই আমরা চাই।”

কেবল কক্সবাজার নয়, সারা দেশে যেখানেই ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষ আছে, সরকার তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে জানান শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, “আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে যেমন ঘর করে দিচ্ছি, পাশাপাশি যাদের জমি আছে, তাদের ঘর করে দেওয়ার জ্য গৃহায়ন তহবিল নামে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটা তহবিল করা আছে, সেখান থেকে যে কোনো প্রতিষ্ঠান টাকা নিয়ে ঘর করতে পারে।

“আমরা নিজেরাও আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে যাদের ভিটা আছে, কিন্তু ঘর নাই, তাদের ঘর করে দিচ্ছি। অর্থাৎ আমরা জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করছি।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “জাতির পিতার স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশ হবে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ। আমরা জাতির পিতার সেই স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। আর সেই লক্ষ্য আমাদের অর্জন করতে হবে। এভাবে আমরা কিন্তু সমস্ত পরিকল্পনা হাতে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।

“জাতির পিতার জন্মশতবর্ষে আমাদের লক্ষ্য, বাংলাদেশে একটি মানুষও গৃহহারা থাকবে না। প্রত্যেকটা মানুষকে আমি যেভাবে পারি, গরিবানা হালে হলেও মাথা গোজার ঠাঁই আমরা করে দেব।”

খুরুশকুলের আশ্রয়ণ প্রকল্পে ফ্ল্যাট পাওয়া পরিবারগুলোর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আজকে যাদের ঘরবাড়িগুলো করে দেওয়া হল, মনে রাখবেন, এগুলো আপনাদের নিজের। সেভাবে যতœ নিয়ে ব্যবহার করবেন, সুন্দরভাবে যাতে থাকে সেটা দেখবেন।”

করোনাভাইরাসের মহামারীতে দেশের অগ্রগতিতে বাধার সৃষ্টি করেছে মন্তব্য করে সবাইকে স্বাস্থ্য বিষয়ক নির্দেশনাগুলো মেনে চলার আহ্বান জানান সরকারপ্রধান।

শোষিত বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবন সংগ্রামের কথা তুলে ধরে তাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করার ঘটনাও স্মরণ করেন তার মেয়ে শেখ হাসিনা।

অনুষ্ঠানের গণভবন প্রান্তে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস, সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়াসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

আর কক্সবাজার প্রান্তে ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার এবিএম আজাদ, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেনসহ মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

কক্সবাজার শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে খুরুশকুলে বাঁকখালী নদীর তীরে ২৫৩ একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে এই ‘বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্প’। পুরো এলাকাকে চারটি জোনে ভাগ করে ১৩৯টি পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে সেখানে।

সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ১৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের পুরো কাজ শেষ হলে এসব ভবনে বসবাসের সুযোগ পাবে ৪ হাজার ৪০৯টি জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবার, যারা কক্সবাজার বিমানবন্দরের পালে ফদনার ডেইল, কুতুবদিয়া পাড়া ও সমিতি পাড়ায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন বহু বছর ধরে।

১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর বাস্তুহারা মানুষ বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে কক্সবাজার বিমানবন্দরের পাশে এসব এলাকায় সরকারি খাস জমিতে আশ্রয় নেয়। পরে বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত আরও অনেক পরিবার যোগ দেয় তাদের সঙ্গে।

১৯৯৭ সালের ১৯ মের ঘূর্ণিঝড়ের পর তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওইসব এলাকা পরিদর্শন করে গৃহহীন ও ছিন্নমূল মানুষের পুনর্বাসনের তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেন।

সেই প্রেক্ষাপটে ১৯৯৭ সালে ‘আশ্রয়ণ’ নামে প্রথম প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ওই প্রকল্পের মাধ্যমে ভূমিহীন, গৃহহীন, ছিন্নমূল ৩ লাখ ১৯ হাজার ১৪০টি পরিবার ঘর পেয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের আবাসনের জন্য খুরুশকুলে নতুন এই বিশেষ আশ্রয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ভূমি উন্নয়নের কাজ শেষে শুরু হয় ভবন নির্মাণ।

প্রকল্প পরিচালক মো. মাহবুব হোসেন বলেন, এটাই দেশের সবচেয়ে বড় আশ্রয়ণ প্রকল্প এবং জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য দেশের প্রথম আশ্রয়ণ প্রকল্প।

“জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারগুলোর জন্য এখানে যে পুনর্বাসন, এটাকে আমরা বিশ্বের বৃহত্তম জলবায়ু পুনর্বাসন প্রকল্প বলতে পারি।ৃ এ ধরনের প্রকল্প পৃথিবীতে বিরল।”

সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের মাধ্যমে প্রথম পর্যায়ের ২০টি ভবনের মধ্যে ১৯টির কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। প্রতিটি পাঁচতলা ভবনে রয়েছে ৪৫৬ বর্গফুট আয়তনের ৩২টি করে ফ্ল্যাট।

১০০১ টাকার নামমাত্র মূল্যে এসব ফ্ল্যাটই বৃহস্পতিবার বুঝিয়ে দেওয়া হল জলবায়ু উদ্বাস্তু হয়ে জীবন কাটানো পরিবারগুলোকে।

জেলা প্রসাশক কামাল হোসেন জানান, কক্সবাজার বিমানবনন্দর সম্প্রসারণের সময় ৪ হাজার ৪০৯টি পরিবারের তালিকা করা হয়। তারাই এ প্রকল্পে বসবাসের সুযোগ পাবে।

এই প্রকল্প দেখভাল ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জেলা প্রসাশকের নেতৃত্বে একটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পুরো এলাকাজুড়ে চলছে নির্মাণযজ্ঞ। শহর থেকে খুরুশকুল বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্পে যাওয়ার জন্য সুপ্রশস্ত রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। প্রকল্পের ভেতরের রাস্তা নির্মাণের কাজও শেষ হয়েছে। কাটা হয়েছে পুকুর। জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষার জন্য নদীর পাশে সাত মিটার উঁচু বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।

নির্মাণ কাজ শেষ হওয়া ভবনগুলোর কোনোটির নাম দেওয়া হয়েছে ইনানী, কোনোটির নাম বাঁকখালী। সাম্পান, ঝিনুক, কোরাল-এরকম নামও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীই এসব নাম ঠিক করে দিয়েছেন বলে জানান প্রকল্প পরিচালক।

তিনি বলেন, ৪৫৬ বর্গফুট আয়তনের প্রতিটি ফ্ল্যাটে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস সিলিন্ডারের সুবিধা রয়েছে। প্রকল্প এলাকায় থাকবে ফায়ার স্টেশন, পুলিশ ফাঁড়ি। প্রতিটি ভবনের ওপর সৌর বিদ্যুতের প্যানেল স্থাপন করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পের সঙ্গে নদীর ধারে ঝাউবন করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান মাহবুব হোসেন।

প্রকল্পের নির্মাণ কাজের দায়িত্বে থাকা সেনাবাহিনীর দশম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি এবং এরিয়া কমান্ডার মো. মাঈন উল্লাহ চৌধুরী জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে এ প্রকল্পকে সুরক্ষিত করতে মাটি উঁচু করা হয়েছে। প্রতিটি ভবনের নিচের তলায় কোনো ফ্ল্যাট রাখা হয়নি। ফলে ঘূর্ণিঝড় হলে জলোচ্ছ্বাসের পানি ঢোকার আশঙ্কা নেই।

সুপেয় পানির জন্য ইতোমধ্যে ১০টি গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। দুটি পুকুরও খনন করা হয়েছে। স্কুল তৈরি করা হয়েছে। প্রচুর তালগাছ ও ঝাউগাছ লাগানো হয়েছে।

২০২৩ সালে পুরো প্রকল্পের যখন শেষ হবে, তখন এখানে যে কেবল ৪ হাজার ৪০৯টি পরিবার আশ্রয় পাবে, তা নয়। প্রায় ১০০ একর জমির ওপর গড়ে তোলা হবে আধুনিক পর্যটন জোন।

১৪টি খেলার মাঠ, সবুজ জায়গা, মসজিদ, মন্দির, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পুলিশ ও ফায়ার স্টেশন, তিনটি পুকুর, নদীতে দুটি জেটি, দুটি বিদ্যুতের সাবস্টেশন থাকবে এখানে।

প্রকল্পের আবাসিক ভবনগুলো সব ৫ তলা হলেও একটি ভবন হবে দশ তলা, যার নাম হবে শেখ হাসিনা টাওয়ার। এই ভবনের অবস্থান হবে পর্যটন জোনে।

২০ কিলোমিটার অভ্যন্তরীণ রাস্তা, ৩৬ কিলোমিটার ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বর্জ্য পরিশোধন ও নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা, তীর রক্ষা বাঁধ, ছোট সেতু, ঘাটলা ও খাল থাকবে পুরো প্রকল্প এলাকায়।

প্রকল্প পরিচালক জানান, আশ্রয়ণ কেন্দ্রে যারা ফ্ল্যাট পাবেন তাদের ঋণ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা হবে।

যারা ফ্ল্যাট পাচ্ছেন, তাদের অধিকাংশই মৎস্যজীবী। সে কারণে সেখানে একটি শুঁটকি মহালও থাকবে। সেজন্য বিক্রয় কেন্দ্র ও প্যাকেজিং শিল্পও গড়ে তোলা হবে।