যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের সুপার বরখাস্ত: সংঘর্ষ নয়, পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ


# কেন্দ্রের ১০কর্মকর্তা পুলিশ হেফাজতে, অজ্ঞাত আসামি করে মামলা >
নিজস্ব প্রতিবেদক:
গত বৃহস্পতিবার যশোর পুলেরহাট শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে সংঘর্ষে নয় তিন কিশোরকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ ও নিহতের স্বজনরা এই তথ্য দিয়েছেন।
তিন কিশোর নিহত ও ১৪ জন আহত হওয়ার পর থেকে বৃহস্পতিবার রাত ও শুক্রবার সারা দিন কর্তৃপক্ষ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক যিনি কেন্দ্রটির দায়িত্বে ছিলেন তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সাথে তাকেসহ ১০ কর্মকর্তাকে পুলিশ হেফাজতে নিয়েছে। গঠিত হয়েছে দুটি তদন্ত কমিটি।
শুক্রবার রাতে অজ্ঞাত আসামিদের নামে নিহতের এক স্বজন মামলা করেছেন। একই রাতে নিহতদের লাশ হাসপাতাল থেকে স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাতেই খুলনা থেকে যশোর আসেন অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক নাহিদুল ইসলাম। অন্যদিকে নিহতের ঘটনায় সমাজসেবা অধিদপ্তর দুই সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে এ কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একই সাথে স্থানীয়ভাবে আরো একটি তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এদিকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নিহত তিন কিশোরের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। নিহতের পক্ষে খুলনার দৌলতপুরের রোকা মিয়া (নিহত পারভেজ হাসান রাব্বির পিতা) যশোর কোতয়ালি থানায় অজ্ঞাত আসামি দিয়ে একটি মামলা (মামলা নম্বর-৩৫) করেছেন। অবশ্য বৃহস্পতিবার রাতেই সমাজ সেবা অধিদফতরের সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মাসুদসহ ১০জনকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এছাড়া ওই কেন্দ্রে আরো দুই আনসার সদস্য পুলিশের নজরদারিতে আছে।
১৪ আগস্ট সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শেখ রফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, যশোরে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে বৃহস্পতিবার ৩ বন্দি কিশোর নিহত ও চারজন আহত হওয়ার সুষ্ঠু তদন্ত করার জন্য দুই সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা হলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) সৈয়দ মো. নুরুল বসির ও উপপরিচালক ( প্রতিষ্ঠান-২) এসএম মাহমুদুল্লাহ। তিন কর্মদিবসের মধ্যে মহাপরিচালকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এদিকে যশোর জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, যশোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ আবু লাইছের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে । এছাড়া সদস্যসচিব সমাজসেবা অধিদপ্তর যশোরের উপ-পরিচালক অসিত কুমার সাহা এবং সদস্য করা হয়েছেন জেলা পুলিশ সুপারের একজন প্রতিনিধি, যিনি এএসপি পদমর্যাদার নিচে নন। কমিটিকে আগামী ৫ কার্যদিবসের মধ্যে তাদের তদন্ত রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।
এদিকে শুক্রবার দুপুরে যশোর জেনারেল হাসপাতালের ডাক্তার আহম্মেদ তারেক সামস নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হাফিজুল হকের উপস্থিতে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেছেন।
হাসপাতালে ভর্তি ১৪ জন হলো, নোয়াখালীর চাঁদখালী উপজেলার মোমিনপুর গ্রামের ইকরামুলের ছেলে পাভেল, ঢাকার বিক্রমপুরের আবু বক্কার সিদ্দিকীর ছেলে আরমান, লালমনিরহাটের মফিজুলের ছেলে হৃদয়, নাটোরের গুরুদাসপুরের মিলন ভক্তের ছেলে সাকিব, যশোর সদর উপজেলার বসুন্দিয়ার ফারুক শেখের ছেলে ইমান, চুয়াডাঙ্গা মতিয়ার রহমানের ছেলে পাভেল, গোপালগঞ্জের মুকসেদপুরের, মহিদুল ইমলামের ছেলে শরিফুল, খুলনার সোনাডাঙ্গা এলাকার জাহিরের ছেলে সাব্বির, যশোর শহরের ঘোপ জেল রোডের রনির ছেলে হৃদয়, ধর্মতলা এলাকার আসাদুজ্জামানের ছেলে মাহিন, লোন অফিসপাড়ার আসলামের ছেলে রাকিব, বগুড়ার বিল্লালের ছেলে সাব্বির এবং গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার ঘোষগাতী গ্রামের ঋজু ফকিরের ছেলে নাঈম খান।
যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত চুয়াডাঙ্গার পাভেল জানিয়েছে, গত ৩ আগস্ট কেন্দ্রের হেড গার্ড (আনসার সদস্য) নূর ইসলাম তার চুল কেটে দিতে বলে। সে ক্লান্ত থাকায় পরে চুল কেটে দেয়া হবে জানালে সে ক্ষিপ্ত হয়ে গালিগালাজ করে এবং গন্ডগোল বাঁধিয়ে দেয়। সে সময় কয়েকজনের মারপিটের শিকার হয় নুর ইসলাম। সে বিষয়টি হেড গার্ড অফিসে জানায়। সেখানে নূর ইসলাম মিথ্যা অভিযোগ করে। বলে বন্দিরা নেশা করে তাকে মারপিট করে।
গত বৃহস্পতিবার বেলা ১২টার দিকে ১৭/১৮ জনকে অফিসে ডাকা হয় এবং এসব বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু নেশা করিনি জানালে কর্তৃপক্ষ বিশ্বাস করেনি। উল্টো কেন্দ্রের সহকারী তত্ত্বাবধায়ক মাসুম বিল্লাহ, প্রবেশন অফিসার মুশফিকসহ অন্য স্যাররা আমাদের জানালার গ্রিলের সাথে বেঁধে মুখ কাপড় গুঁজে বেধড়ক মারপিট করে।
নোয়াখালীর জাবেদ হোসেন জানায়, ‘স্যাররা ও অন্য বন্দি কিশোররা আমাদের ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্প, লোহার পাইপ, বাটাম, কাঁঠ দিয়ে ইচ্ছা মতো মেরেছে। অচেতন হয়ে গেলে বাইরে গাছ তলায় ফেলে আসে। জ্ঞান ফিরলে ফের একই কায়দায় মারপিট করে।’
যশোরের বসুন্দিয়া এলাকার বন্দি ঈশান বলছে, ‘নিহত রাসেল আর আমি একই রুমে থাকতাম। আগামী মাসেই তার (রাসেলের) মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। স্যারদের বেদম মারপিট আর চিকিৎসা না পেয়ে সে মারা গেছে।’
নিহত রাসেলের ভাই সাইফুল ইসলাম নান্টু, নিহত রাব্বির পিতা খুলনা জেলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের প্রচার সম্পাদক রোকা মিয়া জানিয়েছেন, টেলিভিশনে সংবাদ দেখে শুক্রবার যশোরে এসে হাসপাতালে গিয়ে লাশ দেখতে পাই। পরে শুনেছি, নিহত তিনজনসহ আহত ১৪জনকে বেধড়ক মারপিট করা হয়েছে। আহত হওয়ার পরও তাদের কোনো চিকিৎসা দেয়া হয়নি। বরং মাঠে ফেলে রাখা হয়েছিল। মৃত্যু তাদের বিকেলেই হয়। কিন্তু কর্তৃপক্ষ দিশেহারা হয়ে যায়। তারা কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না। পরে লাশ হাসপাতালে পাঠায়।
রোকা মিয়া জানিয়েছেন, ‘যদি ছেলেরা অপরাধ করে তার জন্য শাস্তি আছে। তবে মেরে ফেলতে হবে? আর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র মানে কি মৃত্যু ফাঁদ। ভালবেসে তাদেরকে সংশোধন করা যায় না। এর আগেও এই কেন্দ্রে হত্যার ঘটনা ঘটেছে।
ঘটনার পরপরই শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক জানিয়েছিলেন সম্প্রতি কেন্দ্রে বন্দি কিশোরদের দুই গ্রুপের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এরই জেরে বৃহস্পতিবার বিকেলে তারা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। পরে আহতের উদ্ধার করে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু তিনজন মারা যায়।
কিন্তু জেনারেল হাসপাতালের ডা. অমিয় দাশ বলেছেন, হাসপাতালে আনার আগেই তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে কি কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে তা ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ছাড়া বলা যাবে না।
নিহতরা হলো, খুলনার দৌলতপুর থানার মহেশ্বরপাশা পশ্চিম সেনপাড়ার রোকা মিয়ার ছেলে পারভেজ হাসান রাব্বি (১৮) (রেজিষ্ট্রেশন নম্বর ১১৮৫৫৩), বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলার মহিপুর গ্রামের আলহাজ নুরুল ইসলাম নুরুর ছেলে রাসেল ওরফে সুজন (১৮) (রেজিষ্ট্রেশন নম্বর ৭৫২৪) এবং একই জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার তালিপপুর পূর্বপাড়ার নানু প্রামাণিকের ছেলে নাঈম হোসেন (১৭) (রেজিস্টেশন নম্বর ১১৯০৭)্ এদের মধ্যে নাঈম হোসেন ও রাসেল নারী নির্যাতন দমন মালার আসামি এবং রাব্বি হত্যা মামলার আসামি ছিল।
কোতয়ালি থানার ওসি মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, লাশ হাসপাতালে নেয়ার পর আমরা জানতে পারি। যদি দুপুরে জানতে পারতাম তাহলে আহতের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেতো। ঘটনাস্থল থেকে আলামত হিসাবে হকিস্টিক, ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্প, লোহার পাইপ, কাপড়, কাঠ জব্দ করা হয়েছে।
তিনি আরো জানিয়েছেন, ওই কেন্দ্রের ১০জন কর্মকর্তা কর্মচারীকে পুলিশের হেফাজতে নেয়া হয়েছে। তাদের ঘটনার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আর নিহতের পক্ষে রাব্বির পিতা রোকা মিয়া থানায় অজ্ঞাত আসামি দিয়ে মামলা করেছেন।