৫ কর্মকর্তা পুলিশ রিমান্ডে : ‘পৈশাচিক নির্যাতনে মারা যায় যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের ৩ বন্দি’

নিজস্ব প্রতিবেদক : পৈশাচিক নির্যাতনে যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের  ৩ বন্দি নিহত ও ১৫জন আহত হয়। উন্নয়ন কেন্দ্রের ৫ কর্মকর্তার নেতৃত্বে ওই নির্যাতন চালানো হয়েছিল। এদের সাথে আরো কয়েকজন বন্দি (কর্মকর্তাদের অনুসারী) রয়েছে। ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত করে যশোরের পুলিশ সুপার আশরাফ হোসেন শনিবার এক প্রেসব্রিফিংয়ে এ সম্পর্কে তথ্য দেন।

এদিকে এ মামলায় শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের ৫ কর্মকর্তাকে আটক দেখানো হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের আদালতে চাওয়া রিমান্ডও মঞ্জুর হয়েছে।

আসামিরা হলেন, তত্ত্বাবধায়ক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, সহকারী তত্ত্বাবধায়ক মাসুম বিল্লাহ, কারিগরি প্রশিক্ষক (ওয়েল্ডিং) ওমর ফারুক, ফিজিক্যাল ইন্সট্রাক্টর একেএম শাহানুর আলম ও সাইকো সোস্যাল কাউন্সিলর মুশফিকুর রহমান।

এদের মধ্যে আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, মাসুম বিল্লাহ ও মুশফিকুর রহমানকে ৫দিন করে এবং শাহানুর আলম ও ওমর ফারুককে ৩দিন করে রিমান্ড দিয়েছেন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহাদী হাসান। এর আগে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চাঁচড়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক রকিবুজ্জামান ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করেন। এছাড়া মামলার ৫ সাক্ষীর জবানবন্দি বিচারক ১৬৪ ধারায় গ্রহণ করেছেন। তারা হলেন, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের কর্মচারি তারভীর হোসেন, বাবুল হোসেন, মোসলেহ উদ্দিন, জাহাঙ্গীর আলম ও রফিকুল আলম।

শনিবার দুপুরে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন ব্রিফিংকালে জানান, ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ৩ আগস্ট। এদিন কিশোর বন্দি হৃদয়কে চুল কেটে দিতে বলেন কেন্দ্রের নিরাপত্তা প্রধান নূর ইসলাম। ঈদের আগে হৃদয় প্রায় দু’শ বন্দির চুল কাটায় তার হাত ব্যথা হয়েছে। এ কারণে পরে চুল কেটে দেয়া হবে বলে জানালে ক্ষুব্ধ হয় নুর ইসলাম। তিনি কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, সহকারী তত্ত্বাবধায়ক মাসুম বিল্লাহর কাছে মিথ্যা অভিযোগ করেন যে- হৃদয়সহ বেশ কয়েকজন নেশা করেছে। এছাড়া হৃদয়ের সাথে বন্দি পাভেলের সমকামী সম্পর্ক আছে। ওই নালিশ শুনে ফেলে অপর বন্দি নাইম। সে বিষয়টি পাভেলকে জানায়। তখন পাভেলসহ তার অনুসারীরা ক্ষুব্ধ হয়। এবং নুর ইসলামকে মারপিট করে। এতে নুর ইসলামের হাত ভেঙে যায়।

তিনি আরো জানিয়েছেন, জাতীয় শোকদিবস পালন উপলক্ষে ১৩ আগস্ট যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ১৯ জন কর্মকর্তা কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন। এই সভায় ‘নূর ইসলামের ওপর হামলাকারীদের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে শনাক্ত করা হয়। এবং শাস্তির সিদ্ধান্ত হয়। ওই ৫ কর্মকর্তার সাথে তাদের অনুগত আরো ৭/৮জন বন্দি ওই ১৩জনকে মারপিট করে। মুখে গামছা ঢুকিয়ে জানালা দিয়ে হাত বাইরে বের করে টেনে ধরে পেছনে লোহার রড, ক্রিকেট স্ট্যাম্প ইত্যাদি দিয়ে বেধড়ক মারপিট করা হয়। অচেতন হওয়ার পর জ্ঞান ফিরলে ফের মারপিট করা হয়। পালাক্রমে এভাবে মারপিটের পর গুরুতর জখম অবস্থায় এদের একটি ঘরে ফেলে রাখা হয়। একজন ‘কম্পাউন্ডার’ দিয়ে সামান্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেও এদের হাসপাতালে না পাঠিয়ে প্রায় ৬ ঘণ্টা ফেলে রাখা হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে মৃতপ্রায় অবস্থায় একজনকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতাল থেকে খবর পেয়ে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, সিভিল সার্জনসহ কর্মকর্তারা সেখানে গিয়ে এক অবর্ণনীয় পরিবেশ দেখতে পান। নির্যাতনের শিকারদের দুপুরে খাবার না দিয়ে, চিকিৎসা না দিয়ে গরমের মধ্যে গাদাগাদি অবস্থায় ফেলা রাখা হয়েছিল। এরই মধ্যে আরও দু’জনকে হাসপাতালে পাঠানো হলে তারাও মারা যায়। পরে ডরমেটরিতে ঢুকে দেখি আরো ১৩/১৪জন কাতরাচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্স ও পুলিশের পিকআপে করে ১৪ জনকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরদিন আরও একজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এনিয়ে এই মর্মান্তিক ঘটনায় তিনজন নিহত ও ১৫ জন আহত হয়েছিল।

নিহতরা হলো, বগুড়ার শিবগঞ্জের তালিবপুর পূর্বপাড়ার নান্নু পরমানিকের ছেলে নাঈম হোসেন (১৭), একই জেলার শেরপুর উপজেলার মহিপুর গ্রামের আলহাজ নুরুল ইসলাম নুরুর ছেলে রাসেল ওরফে সুজন (১৮) এবং খুলনার দৌলতপুরের মহেশ্বরপাশা পশ্চিম সেনপাড়ার রোকা মিয়ার ছেলে পারভেজ হাসান রাব্বি (১৮)।

পুলিশ সুপার বলেছেন, ঘটনার পর পুলিশ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মামলাটি পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়। যাতে প্রকৃত চিত্র ও প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে আদালতে উপস্থাপন করতে পারেন। যেহেতু তারা সরকারী কর্মকর্তা।

১৪ আগস্ট রাতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যশোর কোতয়ালি থানায় মামলা করেন নিহত পারভেজ হাসান রাব্বির (১৮) পিতা খুলনার দৌলতপুরের মহেশ্বরপাশা পশ্চিম সেনপাড়ার রোকা মিয়া। মামলায় শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র কর্তৃপক্ষকে বিবাদী করা হয়। মামলার পর পুলিশ হেফাজতে নেয়া ১০ কর্মকর্তা কর্মচারীর মধ্যে ৫ জনকে আটক করে।

এদিকে, শুক্রবারই ‘বন্দী’ তিন কিশোর নিহত হওয়ার ঘটনায় কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক আব্দুল্লাহ আল মাসুদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পাশাপাশি গঠন করা হয় দু’টি তদন্ত কমিটি। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব শুক্রবার বিকেলে তিন সদস্যবিশিষ্ট এই কমিটি গড়ে দেন। যশোরের জেলা প্রশাসক মো. তমিজুল ইসলাম খান বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটির প্রধান করা হয়েছে যশোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ আবুল লাইছকে। এছাড়া সদস্য সচিব সমাজসেবা অধিদপ্তর যশোরের উপ-পরিচালক অসিত কুমার সাহা এবং সদস্য করা হয়েছে জেলা পুলিশ সুপারের একজন প্রতিনিধি, যিনি এএসপি পদমর্যাদার নিচে নন। কমিটিকে আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।

এরআগে সমাজসেবা অধিদপ্তর দুই সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে বিজ্ঞপ্তি জারি করে। ওই কমিটির প্রধান করা হয় সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) সৈয়দ মোহাম্মাদ নুরুল বসিরকে। তার সাথে তদন্তকাজে সহায়তা করবেন উপপরিচালক (প্রতিষ্ঠান-২) এসএম মাহমুদুল্লাহ। আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে এ কমিটিকে মহাপরিচালকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেয়া হয়।

প্রেস ব্রিফিং এ অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মো. তৌহিদুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গোলাম রাব্বানী, যশোর কোতয়ালি থানার ওসি মনিরুজ্জামান, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর রকিবুজ্জামান প্রমুখ।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিদর্শক রকিবুজ্জামান জানিয়েছেন, সাক্ষী ৫জনই হত্যার সাথে জড়িত আটক ৫ আসামির নাম বলেছে। এছাড়া আরো ৭/৮জন বন্দি কিশোরের (কর্মকর্তাদের অনুগত) নাম উল্লেখ করেছে। শনিবার রাত নয়টার পর্যন্ত সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন বিচারক।