যশোরে করোনার প্রকোপ বাড়ছেই, একদিনে আক্রান্ত ১০২


বিল্লাল হোসেন:
যশোরে নভেল করোনাভাইরাসের প্রকোপ বেড়েই চলেছে। প্রতিদিন নতুন করে অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছেন। সেই সাথে বাড়ছে মৃতের সংখ্যাও। পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহের দিকে এগুচ্ছে। শনিবার জেলায় নতুন ১০২ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এই নিয়ে জেলায় সাড়ে ২৭শ’ করোনা রোগী ছাড়ালো। এই অবস্থা চললেও জনসচেতনতা কমছে। কোথাও যেনো স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই। করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের মধ্যে যশোর পুলিশ ক্লাব মাঠে কৌশলে মেলার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। মেলা শুরু হলে করোনা পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। সিভিল সার্জন ডা. শেখ আবু শাহীন বলেছেন, বর্তমান করোনা পরিস্থিতি মেলার আয়োজন অবশ্যই ঝুঁকি বাড়ার সম্ভাবনা ।
যশোর সিভিল সার্জন অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত তথ্য কর্মকর্তা ডা. রেহেনেওয়াজ জানিয়েছেন, শনিবার যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) জেনোম সেন্টার থেকে দুই দফায় ফলাফল পাঠানো হয়। সকালে ১৮৫ ও বিকেলে ২২ জনের ফলাফল হাতে পেয়েছি। তাতে ৮০ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এরমধ্যে ১ জন পুরাতন রোগীর ফলোআপ ফলাফল রয়েছে। ফলে নতুন করে আক্রান্ত ৭৯ জন। এছাড়া খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (খুমেক) ল্যাব থেকে আরও ৪৪ জনের ফলাফল আসে। সেখানে ২৩ জন করোনায় শনাক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দুই ল্যাবে শনাক্ত হওয়া ১০২ জনের মধ্যে যশোর সদর উপজেলায় ৪৯ জন, শার্শা উপজেলায় ৬ জন, ঝিকরগাছা উপজেলায় ১৫ জন, চৌগাছা উপজেলায় ৫ জন, মণিরামপুর উপজেলায় ৯ জন, কেশবপুর উপজেলায় ১৩ জন ও অভয়নগর উপজেলায় ৫ জন। ডা. রেহেনেওয়াজ আরো জানান, এদিন ৪৩ জনকে করোনামুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ঝিকরগাছায় আক্রান্ত ১৫ জনের মধ্যে ৩ জন ভারতের একটি মাজার থেকে দেশে ফিরেছেন। যশোর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. আদনান ইমতিয়াজ জানান, সদর উপজেলায় আক্রান্তদের ৪৯ জনের মধ্যে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের ১ জন সেবিকা রয়েছেন। তার নাম রেশমা খাতুন (৩২) । তিনি ঘোপ বেলতলা এলাকার বাসিন্দা। এছাড়া নীলগঞ্জ সুপারিবাগান এলাকার বাসিন্দা একই পরিবারের সদস্য শরিফ হাসান (৬২), ফরিদা আক্তার (৪৯) ও আহমেদ শফি শরীফ (১৮)। আক্রান্তদের বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে। যবিপ্রবির অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও পরীক্ষণ দলের সদস্য ড. তানভীর ইসলাম জানিয়েছেন, শুধুমাত্র যশোর জেলার ২০৭ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ফলাফল সিভিল সার্জন অফিসে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এতে ৮০ জনের পজেটিভ ও ১২৭ জনের নেগেটিভ ফলাফল এসেছে।
যশোর শহর ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও সরকারের স্বাস্থ্য বিধি মানছেন না কেউ। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নিয়মের বালাই নেই। প্রতিদিন নতুন রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিও হুমকির মধ্যে পড়ছে। করোনার দাপটের মধ্যেও মানুষের মাঝে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়েনি। আগের মতোই প্রায় স্বাভাবিকভাবেই সব কার্যক্রম চলছে। সরকার মাক্স পরা বাধ্যতামূলক করলেও অধিকাংশ মানুষ তা মানছেন না। তারা মাক্স না পরেই বেপরোয়া চলাচল করছেন। সূত্রের দাবি, যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ স্বাস্থ্যবিধি না মেনে চলবে ততদিন করোনা সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। প্রতিদিন আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে চললেও মানুষের মাঝে কোনো ভীতি নেই। মানুষ করোনাকে যেন পরোয়া করছেন না। আর এতেই বাড়ছে সংক্রমণের হার। সূত্র জানায়, বর্তমানে যশোরে করোনা প্রাদুর্ভাব বেড়েই চলেছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেও শহরের গাড়িখানা রোডের পুলিশ ক্লাব মাঠে কৌশলে মেলার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে একটি চক্র। ইতিমধ্যে সেখানে দুই শতাধিক স্টল বসানো হয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যে মেলা শুরু করা হবে বলে গুঞ্জন চলছে। যশোরে করোনার ভয়াবহ এই পরিস্থিতির মধ্যে মেলা আরো স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াবে। যশোরের মানুষ এমনিতে অসচেতনভাবে চলাচল করেছে তারপরেও মেলা চালু হলে উপচে পড়া ভিড়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে করে পরিস্থিতি বেসামাল হয়ে দাঁড়ানোর আশঙ্কা প্রকাশ করে সাধারণ মানুষ রীতিমতো আতংকগ্রস্থ। সচেতন মহলের দাবি, করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত মেলার আয়োজন বন্ধ রাখা হোক।
যশোরের সিভিল সার্জন ডা. শেখ আবু শাহীন জানিয়েছেন, বেশি নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে বলে শনাক্ত বাড়ছে। তবে পূর্বের তুলনায় পরিস্থিতি একই রকম রয়েছে। তবে এমন পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে অবশ্যই জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। সরকারের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পাশাপাশি যার যার অবস্থান থেকে জনসচেতনা বাড়ানোর প্রচার চালানো উচিত। স্বাস্থ্যবিধি না মানলে করোনা সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। সব ধরণের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক গণজমায়েত এড়িয়ে চলতে হবে। পুলিশ ক্লাব মাঠে মেলার আয়োজন প্রস্তুতি সম্পর্কে সিভিল সার্জন জানান, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি অনুমোদন দেন তাহলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মেলা চালাতে হবে। তবে এই মুহূর্তে মেলা আয়োজন হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যাবে। সিভিল সার্জন আরো জানান, শনিবার পর্যন্ত জেলার ১২১৬৬ জনের নমুনা পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। ফলাফল পেয়েছি ১০৬১৪ জনের। এরমধ্যে ২৭৬৫ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। সুস্থ হয়েছেন ১৬৭৫ জন। এছাড়া ৩৮ জন মারা গেছেন। এরমধ্যে খুলনার হিসেবে ২ জনের নাম রয়েছে। যশোরের করোনা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান জানান, যশোরের করোনা পরিস্থিতি একই ভাবে চলছে। উন্নতিও নয় আবার অবনতিও নয়। নমুনা পরীক্ষার ফলাফলের উপর শনাক্তের সংখ্যা কমবেশি হচ্ছে। কিন্তু মানুষের অসচেতনতা বেড়েছে। স্বাস্থ্যবিধি না মেনে চলাচলে বেড়েছে। আইন না মানার বিষয়ে পুলিশ র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্য সদস্যরা প্রতিনিয়ত টহলে দিচ্ছে। মানুষকে সচেতনতায় বিভিন্ন প্রচার চালানো হচ্ছে। জেলা প্রশাসক আরো জানান, সবচেয়ে বড় কথা মানুষ সচেতন না হলে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ সম্ভব না। মাক্স না পরে যেসব মানুষ যেনোতেনো ভাবে চলাফেরা করছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জোরদার করা হবে। জেলা প্রশাসক আরো জানান, পুলিশ ক্লাব মাঠে মেলার আয়োজনের অনুমোদনের জন্য এখনো কোনো আবেদন তিনি পাননি। করোনা পরিস্থিতিতে সকলকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাচলের আহবান জানান জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান।