ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মশতবার্ষিকী

স্পন্দন বিনোদন ডেস্ক : বাংলা চলচ্চিত্রের সর্বকালের অন্যতম সেরা একজন অভিনেতা সাম্যময় বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় নামেই সমধিক পরিচিত। তার জন্ম ১৯২০ সালের ২৬ আগস্ট।
কমেডিয়ান ঘরানার চরিত্রে অভিনয় করলেও মূলত তার ভূমিকা ছিল চার্লি চ্যাপলিনের মতো। হাস্যরসের মধ্য দিয়েও বলিষ্ঠভাবে তিনি সমাজের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন।

‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’, ‘ভানু পেলো লটারী’, ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘৮০তে আসিও না’, ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট’, ‘মিস প্রিয়ংবদা’সহ একের পর এক চলচ্চিত্রে অনবদ্য অভিনয় করে দর্শক-ভক্তদের হৃদয় জয় করে নিয়েছিলেন তিনি।

পাড়ায় ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটকে চাণক্য হওয়ার সুবাদে সোজা বিভূতি চক্রবর্তীর ‘জাগরণ’ (১৯৪৭) সিনেমায় এক দুর্ভিক্ষপীড়িত চরিত্রে আত্মপ্রকাশ করেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। তার আগে অবশ্য সংগীতশিল্পী নীলিমা দেবীর সঙ্গে বিবাহপর্ব সারেন ১৯৪৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। সকলের নজরে আসেন ১৯৫০ সালের ‘তথাপি’ সিনেমায়। তারপর ১৯৫২ সালে ‘পাশের বাড়ি’ ও ‘বসু পরিবার’-এ তার সাফল্য ঊর্ধ্বমুখী হয়। আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৫৩ সালে নির্মল দে পরিচালিত ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ সিনেমাতে তার বলা ‘মাসিমা, মালপোয়া খামু’ সংলাপটি আজও অমর। এই দৃশ্যটি নিখুঁতভাবে তুলে ধরতে তাকে ২৪টি মালপোয়া খেতে হয়েছিল।

ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণ করে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এইসময়’কে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের বর্ষীয়ান অভিনেতা পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘মানুষকে সত্যি করে আনন্দ দেওয়ার যে উপাদান, তা আমরা নিয়ে জন্মাই। পরে শাণিত হয়। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় যখন জন্মেছেন, তখনই ওর মধ্যে এই উপাদানগুলো শাণিত ছিল। তিনি ব্যতিক্রমী। ওকে যারা কমেডিয়ান বলতেন, তাদের কাছে আর অন্য শব্দ ছিল না। কিন্তু ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় কমেডিয়ান নন। একজন পূর্ণাঙ্গ অভিনেতা। তবে দর্শক ভালোবেসেই কমেডিয়ান বলতেন। আসলে কমেডিয়ান হতে গেলে সবদিক পরিক্রমা করে আসতে হয়। যিনি হাসাতে পারেন, তিনি দর্শকের চোখে জলও আনতে পারেন। যেমন চার্লি চ্যাপলিন। দেখে হাসছেন, কিন্তু কখন যে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়বে, বুঝতে পারবেন না। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ও তেমন। ’

তিনি বলেন, ‘ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ্যান্টেনা ছিল দারুণ স্ট্রং। কেউ চোখের পাতা এপাশ ওপাশ করলে ধরে ফেলতে পারতেন, মনের মধ্যে কী চলছে। কথা বলার ফাঁকে গলা সামান্য কাঁপলে বুঝে যেতেন সত্য বলছে নাকি অসত্য। তার প্রশংসা করা মানে সোনার অলঙ্কারের ওপর সোনালি রং করা। ওর প্রশংসা করার ধৃষ্টতা আমার নেই। বাঙালি ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। আমিও তাই। ভানুদাকে রসবোধ অর্জন করতে হয়নি। তবে শুধুমাত্র যে রসবোধ ছিল তা নয়, সাংঘাতিক সেনসিটিভ মানুষ ছিলেন। ’

পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘এখন তো আমি পেকে দরকচা মেরে গিয়েছি। অভিনয় বিচার করা বা গল্প দেখার জন্য ছবি দেখি না। ছোট-ছোট কাজ দেখি। ‘গৃহপ্রবেশ’ ছবিতে একটা দৃশ্য আছে। বাড়ি নানা লোক ভানুকে ডাকছে। যখনই এক দিকে যেতে যাচ্ছে অন্য জন আবার ডাকছে। এ ভাবে কর্তার সামনে যখন পড়ে, ‘হ্যাঁ’ বলে না-এর ভঙ্গিমা করছে। আবার ‘না’ বলে হ্যাঁ-এর ভঙ্গিমা করছে। এ সময় ক্লোজ শট দেখার মতো। যেভাবে গাল নাড়াত, তারও টেকনিক রয়েছে। অনেকে নিজে হেসে দর্শককে হাসায়। ভানুদা কথা বললেই দর্শক হাসতেন। ’

‘মিস প্রিয়ংবদা’ বা ‘আশিতে আসিও না’-র মতো কিছু ছবিতে একেবারে অন্য ধরনের চরিত্র করেছেন। সে সব ছবি দেখতেও আমার বেশ লাগে। কখনও আফসোস করতে দেখিনি ভানুদাকে। অনেক ঝড় এসেছে জীবনে। তবে সমবেদনা চাননি। কারও কাছে হাতজোড় করে সাহায্য প্রার্থনা করেননি। তিনি লড়াকু মানুষ ছিলেন,’ যোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে আসলে নকল করা যায় না। তার থেকে উত্তাপ নেওয়া যায়। ’