অস্থির পেঁয়াজ বাজার: একদিনে যশোরে বাড়লো কেজিতে ৩০ টাকা

আবদুল কাদের: ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের সাথে সাথে যশোরে পেঁয়াজের বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। মজুতদারদের কারসাজিতে একদিনের ব্যবধানে ৫৫ টাকার দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৯০-৯৫ টাকায়। আর ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়। কেজি প্রতি বেড়েছে ৩০ টাকা। আর এক মাস আগে পেঁয়াজের দাম ছিল ৩০-৩২ টাকা। পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ভোক্তারা। তারা বলছেন, মজুতদারদের কাছে পেঁয়াজ রয়েছে। তবে একদিনের ব্যবধানে কি করে দাম বাড়লো। বিষয়টি খোঁজখবর নিতে মাঠে রয়েছে প্রশাসন।

এদিকে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির কারণে মঙ্গলবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আড়তদারদের সাথে সভা করেছে জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক মো: তমিজুল ইসলাম খানের সভাপতিত্বে সভায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সালাউদ্দিন শিকদার, জেলা বাজার কর্মকর্তা সুজাত হোসেন খানসহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন।

শহরের বড়বাজারের তাপস স্টোরের মালিক আশিষ দাস জানান, ভারত তাদের পেঁয়াজের রফতানি বন্ধের কারণে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। আড়তদাররা সাথে সাথে দাম বাড়িয়েছে। দেশি পেঁয়াজ আমরা বিক্রি করছি ৯০ টাকা এবং ভারতীয় পেঁয়াজ ৬০ টাকা কেজিতে। খুচরা ব্যবসায়ী শংকর দাস জানান, সোমবার ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করেছে। অথচ একদিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৩০ টাকা বেড়েছে। বাজারে দেশি পেঁয়াজের কোনো সংকট না থাকলেও দাম বাড়ছে।

শহরের বেজপাড়ার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশে যে পরিমাণ পেঁয়াজ মজুদ আছে আগামী এক মাসেও সংকট হবে না কিন্তু ভারত রফতানি বন্ধের ঘোষণা দেয়ার পরই আমাদের দেশে দাম বেড়ে গেছে হু হু করে। বর্তমানে অস্থির হয়ে উঠেছে পেঁয়াজের বাজার। এজন্য প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে মজুতদারদের বিরুদ্ধে। একই সাথে ভোক্তাদেরও সচেতন হতে হবে। বারান্দিাপাড়ার বাসিন্দা ব্যাংকার ইমরুল হাসান জানান, ভোক্তাদের দাম বৃদ্ধির খবরে হুমড়ি খেয়ে বাজারে গিয়ে পেঁয়াজ কেনা থেকে বিরত থাকতে হবে। কেননা ক্রেতাদের ভিড়ের কারণে মজুতদাররা দাম বাড়িয়ে দেন। একই সাথে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে প্রশাসনকে।

যশোর জেলা বাজার কর্মকর্তা মো: সুজাত হোসেন খান জানান, মঙ্গলবার ৩২ জন পেঁয়াজ ব্যবসায়ীকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ডাকা হয়েছিল। ৩০ জন উপস্থিত ছিলেন। তাদেরকে বলা হয়েছে আপনাদের কাছে পেঁয়াজ মজুত রয়েছে, তাহলে কিভাবে একদিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম বাড়লো।

শহরের বড় বাজারের পেঁয়াজের আড়তদার আমিন এন্ড সন্সের মালিক বাদশা মিয়া বলেন, আমরা বাইরে  থেকে যেভাবে ক্রয় করি, সেই অনুপাতে বাজারে বিক্রি করছি। প্রশাসন যদি জরিমানা করে তাহলে পেঁয়াজের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে। পেঁয়াজ বেশি আমদানি হয় ভোমরা বন্দর দিয়ে। সেখানে প্রশাসন খোঁজ নিয়ে দেখতে পারে।

যশোরের জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান জানান, আমাদের মোবাইল কোর্ট মাঠে রয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে। কোনোভাবে পেঁয়াজের দাম বাড়লে তা সহ্য করা হবে না। একই সাথে ভোক্তাদের সচেতন হতে হবে। দাম বাড়তে পারে এই আশঙ্কায় যেন পেঁয়াজ বেশি না কেনে। কেননা দেশে পেঁয়াজের কোনো ঘাটতি নেই।

যশোরর আঞ্চলিক কৃষি অফিসের উপপরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস জানান, ২০১৯-২০ অর্থবছরে এক হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছিল। যা থেকে উৎপাদন হয়েছিল ১৭ হাজার ৯১৯ টন।

যশোর বড় বাজার সূত্রে জানা গেছে, আলুপট্টি ও কালীবাড়িতে ১৩টি পেঁয়াজের আড়ৎ রয়েছে। এসব আড়ত থেকে প্রতিদিন ১৫০ বস্তা করে পেঁয়াজ বিক্রি হয়। খুচরা বিক্রেতারা আড়ত থেকে এসব পেঁয়াজ কিনে থাকেন। যশোরে দেশি পেঁয়াজ আসে ঝিনাইদহ, ফরিদপুর ও কুষ্টিয়া জেলার বিভিন্ন মোকাম থেকে। আর ভারতীয় পেঁয়াজ আসে বেনাপোল ও ভোমরা বন্দর দিয়ে। এছাড়া কোনো কোনো ব্যবসায়ী অন্যান্য মোকাম থেকেও সংগ্রহ করেন। বেনাপোল বন্দরের উপপরিচালক মামুন কবীর তরফদার জানান, গত ১৩ দিনে বেনাপোল বন্দর দিয়ে ৬৫০ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানি হয় ভারত থেকে। সোমবার বেনাপোল বন্দর দিয়ে ২৫ মেট্রিক টন ২শ’ কেজি আমদানি হয় পেঁয়াজ। যার রপ্তানি মূল্য ছিল প্রতিটন ২১৮ ডলার। ভারতের নাসিক, হরিয়ানা, ও কালনা থেকে বেশির ভাগ পিঁয়াজ আমদানি হয় এই বন্দর দিয়ে।

বেনাপোলের ওপারে পেট্রাপোল রফতানিকারক সমিতির পক্ষে ব্যবসায়ি কার্তিক ঘোষ বলেন, আমদানি বাণিজ্য শুরুর পর থেকে ২২০-২৫০ ডলারে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি হয়ে আসছে। কিন্তু বন্যার কারণে ভারতের নাসিকে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ায় পেঁয়াজ রফতানিকারকরা স্থানীয় বাজারদর হিসাবে ৭৫০ ডলারের নীচে বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি করবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর আটকে দেয়া হয় বাংলাদেশে ঢোকার অপেক্ষায় থাকা পেঁয়াজবোঝাই ট্রাকগুলো।

বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার আজিজুর রহমান বলেন, ভারত কোনো ঘোষণা ছাড়াই মূল্যবৃদ্ধির দাবিতে বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে। হঠাৎ নেয়া এমন সিদ্ধান্তে বিপাকে পড়েছেন এপারের আমদানিকারকরা।