নিউরোসায়েন্সে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটে দিশেহারা রোগীরা

স্পন্দন নিউজ ডেস্ক : রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের কারণে দিশেহারা রোগীর স্বজনরা। রাজধানী ও এর বাইরে থেকে আসা রোগীদের স্বজন ও অ্যাম্বুলেন্স চালকদের জিম্মি করে টাকা আদায় করে সিন্ডিকেট সদস্যরা। এখান থেকে রোগী নিয়ে ফিরতে হলে দিতে হয় মোটা অংকের কমিশন। এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে শেরেবাংলা নগর থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মো. আসাদুজ্জামান আসাদ।

জানা গেছে, ঢাকার বাইরে থেকে অনেক অ্যাম্বুলেন্স চালক এখানে আসার পর সিন্ডিকেটের হাতে মার খেয়ে আহত হয়েছেন। প্রতিনিয়ত বাইরের চালকদের মারপিট করে সিন্ডিকেটের সদস্যরা। এখান থেকে মাসে কমিশন তোলা হয় প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা। এর সবটাই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে যায় সভাপতি আসাদের কাছে।

সরেজমিনে ঘুরে ও অ্যাম্বুলেন্স চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাসপাতালের সামনে ও পাশে ৪০-৫০টি অ্যাম্বুলেন্স রাখা হয়। এখানে যেই হোক রোগী ও লাশ নিয়ে ফিরতে হলে তাদের গাড়িতে নিতে হবে, আর না নিতে চাইলেই চালকদের মারপিট শুরু করেন আসাদের লোকজন।

এই সিন্ডিকেটে রয়েছেন নুর জামাল, রবিউল, নুরু, নজরুল, শহীদ, পারভেজ ও জামালসহ অনেকে। তাদের দৌরাত্ম্যে অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের পথে বসার অবস্থা। এ সিন্ডিকেট ঢাকা ও ঢাকার বাইরে থেকে বেশিরভাগ অ্যাম্বুলেন্স চালকের কাছ থেকে ভাড়ার কমিশন আদায় করে।

Ambulance-3.jpg

বাইরের জেলা থেকে কেউ যদি ভাড়া ঠিক করে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে আসে, ফেরার সময় ওই অ্যাম্বুলেন্স আটকে দেয় আসাদের লোকজন। কারণ সিন্ডিকেট নতুন করে তাদের অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া দেবে। তা না হলে রোগীর স্বজনরা ওই অ্যাম্বুলেন্স যত টাকা ভাড়া চুক্তিতে এনেছে, তা হিসাব করে কমিশন দিয়ে তারপর যেতে হবে। কোনো চালক যদি ৮ হাজার টাকা চুক্তি করে রোগী নিয়ে আসে, তাহলে তাদের ওই টাকার মধ্য থেকে কমিশন দিতে হবে। এভাবেই প্রতিদিন কমিশন নেয় এই সিন্ডিকেট। এ নিয়ে প্রায়ই মারামারির ঘটনা ঘটে।

অ্যাম্বুলেন্স মালিক মো. মাসুদ বলেন, “আমার কয়েকটি গাড়ি রয়েছে। আমার বাড়ি মাগুরা হওয়ার সুবাদে জেলার এমপির পিএস একদিন আমাকে ফোন দিয়ে বলেন, একটি গাড়ি লাগবে। আমি সিন্ডিকেটের কথা তাকে জানাই। তিনি (পিএস) বলেন, ‘সেখানে আমি নিজে উপস্থিত আছি, কোনো সমস্যা হবে না’। তখন আমি ঢাকার বাইরে ছিলাম। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্স যাওয়ার পরে সেই সিন্ডিকেটের লোকেরা বাধা দেয়। এরপর মারধরের ঘটনা ঘটে। আমার ড্রাইভারকে মারপিট করে তারা। পরে সেই ড্রাইভার চাকরি ছেড়ে চলে যায়। ওই সিন্ডিকেটের লোকজনের সঙ্গে পারা যায় না। থানা-পুলিশও কারো অভিযোগ কানে নেয় না।”

অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট নিয়ে মারামারির ঘটনায় আহতদের একজন ইমরান আহমেদ। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার মামার অ্যাম্বুলেন্স নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে রোগী আনতে যায়। সেখানে যাওয়ার পর তাকে মারধরের শিকার হতে হয়। এরপর আমাকে মামা ফোন দিলে আমি আসাদ ভাইয়ের সাথে কথা বলি। তিনি বিষয়টি মীমাংসা করতে বলেন। আমি যাওয়ার পর সিন্ডিকেটের নজরুল, রবিউল, নুর জামাল, শহীদ,পারভেজ ও নুরুসহ অনেকে আমাকে মেরে রক্তাক্ত করে। আমি হাসপাতালে ভর্তি হই। এ ব্যাপারে থানায় জিডিও (সাধারণ ডায়েরি) করি। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাইনি।’

Ambulance-3.jpg

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রোগীর স্বজন বলেন, ‘গাজীপুর থেকে আমার চাচাকে ডাক্তার দেখানোর জন্য নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে এনেছিলাম। কিন্তু ডাক্তার দেখিয়ে বাড়ি ফেরার সময় ওই অ্যাম্বুলেন্স আর যেতে চায় না। কারণ জানতে চাইলে চালক জানান, এখান থেকে রোগী নিতে হলে নতুন করে আবার ভাড়া ঠিক করতে হবে। তাছাড়া আপনাদের নিয়ে যাওয়া যাবে না। পরে তাদের ভাড়া, যা তার অর্ধেক কমিশন দিয়ে চাচাকে নিয়ে বাড়ি ফিরি।’

সিন্ডিকেটের সদস্য রবিউলের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখানে কোনো সিন্ডিকেট-মিন্ডিকেট নেই। আমরা কোনো কমিশন নিই না। কে আমাদের কথা বলেছে তাকে আমাদের সামনে নিয়ে আসেন।’

আরেক সিন্ডিকেট সদস্য নুরু বলেন, ‘আমরা কামলা, ডিউটি করি হাজিরা নিই।’ এসব সিন্ডিকেটের সাথে শেরেবাংলা নগর থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আসাদুজ্জামান আসাদ জড়িত কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এতে আসাদ ভাই জড়িত নন।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শেরেবাংলা নগর থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, ‘এখানে কোনো গন্ডগোল হয় না। এলাকার ছেলেরা করে খায়।’