চান্দুটিয়ায় কথিত জ্বিন কবিরাজ আমেনা ও বিল্লালের প্রতারণা!


# ভারণে বসে দিচ্ছেন প্রেম-বিচ্ছেদ তাবিজ>
বি এইচ মোহাম্মদ:
যশোর সদর উপজেলার দেয়াড়া ইউনিয়নের চান্দুটিয়া গ্রামে জ্বীনের কবিরাজ পরিচয়ে আমেনা বেগম ও বিল্লাল হোসেনের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। তারা ভারণে বসে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি ও বিচ্ছেদসহ নানা রোগের দোয়া তদবির দিচ্ছেন। প্রতিদিন তাদের আস্তানায় অসংখ্য সহজ সরল মানুষ ছুটছেন। কারো হাতে পানির বোতল, গোলাপ জল, আবার কারো হাতে তেলের বোতল, আরো আছে মাদুলি ও কালো সুতো। আবার তদবিরে কাজ না হওয়া অনেকেই কবিরাজের বাড়ি ধর্ণা দিচ্ছেন দিনের পর দিন। অভিযোগ রয়েছে, জ্বিন কবিরাজ আমেনার অপচিকিৎসায় পা হারাতে বসেছেন সাবিনা নামে এক নারী। আরেক কবিরাজ বিল্লালের অপচিকিৎসায় বিগত দিনে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিলেন গোবিন্দপুর গ্রামের গৃহবধূ রেবেকা বেগম।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, আমেনা বেগম নাম হলেও তিনি বাকেরের বউ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেছেন। বর্তমানে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ তাকে এই নামে চেনেন। কবিরাজ আমেনা খাতুনের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, বাড়ির প্রধান গেট পেরিয়ে বাম পাশে তৈরি করেছেন টিন ও চাটাই দিয়ে ঘেরা একটি ছোট ঘর। সেখানে কথিত কবিরাজ আমেনা জ্বিন ভারণে বসেন। তার আসনের চারপাশে রয়েছে গোলাপ জ্বল, তাবিজ লেখার জন্য কাগজ-লাল কলম, একটি সাদা পাত্রে ভরা পানি, বিভিন্ন গাছের শেকড়, আরছটি গাছ। তাকে ঘিরে বসে আছে অসংখ্য নারী ও পুরুষ। আমেনা বেগম ভারণে বসে আটছটি দিয়ে মানুষের ঝাঁড় ফুক করছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে দিচ্ছেন দোয়া তাবিজ। ভারণে বসা অবস্থায় সাংবাদিক ছবি তোলার পর আমেনা বেগম আসন ছেড়ে চলে যান। পরে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তার দেখা মেলেনি। সেখান থেকে যাওয়া হয় জ্বিনের কথিত আরেক কবিরাজ বিল্লাল হোসেনের বাড়িতে। কবিরাজের খোঁজ করতেই পরিবারের লোকজন জানান তিনি মাঠের আবাদ দেখতে গেছেন। তবে স্থানীয় দুইজন জানান, কবিরাজ আমেনার বাড়িতে সাংবাদিক এসেছে খবরে বিল্লাল জ্বিন ভারন আসন থেকে ওঠে গেছেন। কবিরাজ আমেনার ও বিল্লাল হোসেনের বাড়ি চান্দুটিয়া মধ্যপাড়ায় রাস্তার এই পাশ আর ওই পাশে। বিল্লালের বাড়ি গিয়ে দেখা গেছে, বাড়ি প্রবেশের ডান পাশে টিনশেডের একটি কক্ষ রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, ওই কক্ষে বিল্লাল গামছায় মুখ ঢেকে জ্বিন ভারণে বসেন। সেখান থেকে দেয়া হয় দোয়া ও তদবির। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কবিরাজ বিল্লাল ও আমেনা মানুষের গোপন রোগ, হৃদরোগ, আলসার, হাপানিসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা করে থাকেন। তারা আবার জ্বিন তাড়ানোর ব্যবস্থা দেন। তবে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি- বিচ্ছেদ, গর্ভে সন্তান না আসা এমন তদবির দিয়ে মোটা অংকের টাকা আদায় করেন। পরে কাজ না হলে ভুক্তভোগীদের ভারণে বসে জানানো হয় সঠিকভাবে তদবির প্রয়োগ করতে পারেননি। তাই কাজ হয়নি। ফের তদবির নিয়ে সঠিকভাবে প্রয়োগ করেন কাজ হয়ে যাবে। কিছু সময় পর ভারণ ছেড়ে ভুক্তভোগীদের বলেন কি বললো জ্বিন। যা বলেছে সেই অনুযায়ী কাজ করেন। এক সময় প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে তারা আর আসেননা। জানা গেছে, ভারণ ও তদবির বাবদ তারা আলাদা টাকা হাতিয়ে নেন। তদবির নিতে আসা মানুষের কাছ থেকে সর্বনি¤œ ২শ টাকা নিচ্ছেন তারা। আগে ভারণ বাবদ ৫ টাকা নেয়া হলেও বর্তমানে নেয়া হয় ১০ টাকা। বিল্লাল হোসেনের কাছ থেকে প্রেম সম্পর্ক তৈরির তাবিজ নিয়ে প্রতারিত হয়েছেন নলডাঙ্গা গ্রামের এক যুবক। তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কয়েক দফায় দোয়া তদবির দিয়ে তার কাছ থেকে সাড়ে ৭ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। কোনো কাজ হয়নি। লোক লজ্জার ভয়ে তিনি বিল্লাল কবিরাজের ভণ্ডামির কোনো প্রতিবাদ করেননি। চুড়ামনকাটি গ্রামের এক গৃহবধূ জানান, আমার গর্ভে তখন ১ মাসের সন্তান। কবিরাজ বিল্লালের কাছে যাই ভারণ দিতে। ভারণে তার কাছে জানতে চাওয়া হয় কি কারণে এসেছেন। তখন আমি বলি সন্তানের বিষয়ে। এ সময় ভারণ থেকে বলা হয় তেল পড়া নিয়ে প্রতিদিন পেটে মালিশ করবেন। দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে। সেই থেকে তিনি বিল্লালকে ভুয়া কবিরাজ হিসেবে মানি। সূত্র জানায়, বিল্লালের অপচিকিৎসায় বিগত দিনে মৃতু পথযাত্রী হয়েছিলেন গোবিন্দপুর গ্রামের ফজলুর রহমানের স্ত্রী রেবেকা খাতুন। জ্বিন তাড়নো চিকিৎসার নামে তাকে ব্যাপক পিটানো হয়। গত সোমবার আমেনার কাছে তদবির নিতে আসা চৌগাছা উপজেলার এক নারী জানান, মেয়ের সংসারে অশান্তি তাই তদবির নিয়েছেন। আগেও এসেছি। কাজ না হওয়ায় দ্বিতীয় বারের মতো আসলাম। প্রতিবার দোয়া তদবির দেয়ার সময় টাকা গুণতে হয়। ঝাউদিয়া গ্রামের এক নারী জানান, সংসারে অশান্তি। স্বামী অন্য নারীর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন। আমেনার কাছ থেকে তিন বার তদবির নিয়েছেন কোনো কাজ হয়নি। তিনবারে দেড় হাজারের বেশি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। কাজী নজরুল ইসলাম কলেজের এক ছাত্র জানান, প্রেমের সম্পর্ক গড়ে দেয়ার জন্য তদবির দিয়েছেন ৫ বার। কিন্তু কাজ হয়নি। তদবির নিতে আসলে ভারণে বসে বলা হয়। মেয়েটা ক্রমেই আমার প্রতি দুর্বল হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত কাজের কাজ কিছু হয়নি। শুধু টাকা গুনতে হয়েছে। চুড়ামনকাটি গ্রামের জসিম উদ্দিন জানান, তার স্ত্রী সাবিনার পায়ে কি যেনো একটা ফুটে যায়। মাছের কাটা হবে বলে ধারণা। এরপর পা ফুলে যায়। লোক মাধ্যমে খবর পেয়ে কবিরাজ আমেনার কাছে যায়। তিনি চিকিৎসা দেন। প্রয়োগ করার পর কম হয়নি। বরং পায়ে পচন ধরেছে। গুরুতর অবস্থায় সাবিনা যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসক বলেছেন পচে যাওয়া পা কেটে ফেলা হতে পারে। এরপর তিনি হতাশ হয়ে পড়েছেন। কবিরাজ আমেনা ও বিল্লালের প্রতারণার বিষয়ে কথা হলে স্থানীয় ইউপি সদস্য গোলাম মোস্তফা জানিয়েছেন, তারা দুইজন জ্বিনের কবিরাজ পরিচয়ে দোয়া তদবির দেন বলে জানি। তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে খুব বেশি অবগত নন তিনি। তাদের প্রতারণার ব্যাপারে কেউ কিছু বলেননি। যশোরের সিভিল সার্জন ডা. শেখ আবু শাহীন জানিয়েছেন, জ্বিনের নাম ব্যবহার করে অপচিকিৎসার বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। যশোরের জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান জানান, জ্বিনের কবিরাজ পরিচয়ে আমেনা ও বিল্লালের প্রতারণা ও অপচিকিৎসার বিষয়ে শুনলাম। তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।