যশোর নরেন্দ্রপুরে ক্রিকেট ব্যাট তৈরির উদ্যোক্তারা পূঁজি সংকটে

নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোর সদর উপজেলার নরেন্দ্রপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হচ্ছে ক্রিকেট ব্যাট। যে কারণে সবাই চেনে ‘ব্যাটের গ্রাম’ হিসেবে। নরেন্দ্রপুর ইউনিয়নের নরেন্দ্রপুর গ্রামের মিস্ত্রিপাড়া, বটতলা, মহাজেরপাড়া, রূপদিয়াসহ কয়েকটি গ্রামে এখন তৈরি হচ্ছে ক্রিকেট ব্যাট। দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয় এই ব্যাট। কিন্তু বর্তমানে চরম পূঁজি সংকটে পড়েছে এখানকার উদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, করোনাকালে গত ৪ মাস ধরে আমাদের কোনো ব্যবসা নেই। অর্ডার না থাকায় ব্যাট তৈরি বন্ধ ছিল। এতে পূঁজি ভাঙ্গা পড়েছে।

ব্যাট প্রস্তুতকারক নিখিল ভদ্র বলেন, ‘প্রায় পাঁচ বছর ধরে ব্যাট তৈরি ও বিক্রির কাজ করছি। আমার কারখানায় ৭ থেকে ৮ প্রকারের ব্যাট তৈরি হয়। কিন্তু করোনার জন্য গত ৩-৪ মাস কোনো ব্যবসা হয়নি। ঘরে যে পূঁজি ছিল তা খেয়ে ফেলেছি। আমাদের কোনো ব্যাংক ঋণ দেয়না। আগামীতে কিভাবে চলব বুঝতে পারছিনা।

নরেন্দ্রপুর এলাকায় প্রথম ব্যাট তৈরির কার্যক্রম শুরু করেন সঞ্জিত মজুমদার, যিনি এই খাতের উদ্যোক্তা। সঞ্জিত ১৯৮৪ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তার দিদিবাড়িতে যান। সেখানে কাঠের তৈরি নানা শিল্পকর্ম দেখে মাথায় আসে নতুন কিছু করার। এরপর দেশে ফিরে ভাতিজা উত্তম মজুমদারকে সঙ্গে নিয়ে ক্রিকেট ব্যাট তৈরির পদ্ধতি শেখেন। ১৯৮৬ সালে ব্যাট তৈরি ও তা বিক্রি শুরু করেন স্থানীয় বাজারে। তার সেই পথ ধরে এখন ৫০ জন জড়িয়ে পড়েছেন এই পেশায়।

সঞ্জিত মজুমদারের ছেলে সুমন মজুমদার জানান, উত্তরবঙ্গের জেলাগুলো মূলত তাদের বাজার। দেশের ৩২টি জেলায় যশোরের তৈরি এসব ব্যাট বাজারজাত করা হতো। কিন্তু করোনায় সব নিস্তেজ হয়ে গেছে। বিগত ৪ মাস কেউ ব্যবসা করতে পারেনি। আবার এ সময় কেউ বাকি টাকাও দেয়নি। এতে চরমভাবে আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়েছি। এখনও ব্যবসা শুরু হয়নি। আমাদের এখানকার ব্যাট যারা তৈরি করে তারা সবাই দরিদ্র। যে কারণে পূঁজি ভেঙে ফেলায় সবাই নগদ টাকার সংকটে।

গ্রামের তাপস মজুমদার বলেন, আমাদের তমো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কিভাবে ঋণ পাবার আবেদন করতে হয় তা জানিনা। আবার কোন ব্যাংকের কর্মকর্তা আসেনি। ব্যাংক ঋণ পেলে সবাই খুব উপকৃত হতো। অনেকে এনজিও ঋণ নিয়ে ব্যবসা করছে। কিন্তু তারা কিস্তি আদায় করতে খুব চাপ দেয়।

গ্রামের সুমন মজুমদার জানান, এখানকার সব ব্যাট প্রস্তুতকারক হাতে তৈরি করত। গত ২-৩ বছর মেশিনে তৈরি হচ্ছে। এতে কাজের গতি বেড়েছে। স্বাভাবিক সময়ে এসব কারখানায় মাসে ৫০  হাজার ব্যাট তৈরি হয়ে থাকে।

মহাজেরপাড়ায় কারখানার মালিক তরিকুল ইসলাম বলেন, করোনার ৪ মাস কোনো জেলা থেকে কেউ ব্যাট নেবার জন্য অর্ডার করেনি। যাদের কাছে বকেয়া টাকা পেতাম তারাও কেউ টাকা দেয়নি। সরকারের সহযোগিতা না পেয়ে আমরা খুব কষ্টে আছি। অথচ স্বাভাবিক সময়ে আমাদের অর্থ কষ্ট ছিলনা।

ব্যাট তৈরিতে ব্যবহার করা হয় নিমবুত, পুয়ো, ছাতিম, কদম, নিম, জীবন, পিঠেগড়া, আমড়াসহ বিভিন্ন প্রকার দেশি কাঠ। শ্রমিকদের পাশাপাশি বাড়ির বউ-ছেলেমেয়েরাও ব্যাটে পুডিং লাগানো, ঘষামাজা, রঙ করা, স্টিকার লাগানো, প্যাকেটজাত করা ইত্যাদি কাজ করেন। কিন্তু করোনার সময়ে সেই অবস্থা চোখে  পড়েনা।

ব্যাট তৈরি উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি এখাতের নির্মাণ কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা কষ্টের মধ্যে আছেন। সোহেল রহমান নামে এক শ্রমিক জানান, একশ’ ব্যাট বানিয়ে দিলে তারা এক থেকে দেড় হাজার টাকা মজুরি পেতেন। তাদের পক্ষে সপ্তাহে চারশ’ ব্যাট তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু করোনা আসার পর কাজ না থাকায় নিদারুণ আর্থিক কষ্টে আছি। বেশিরভাগ শ্রমিক অন্যকাজে নিয়োজিত।

নরেন্দ্রপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোদাচ্ছের আলী জানান, ‘শুধুমাত্র মিস্ত্রিপাড়ায় ব্যাট তৈরির কারখানা রয়েছে প্রায় ৫০টি। করোনকালে তাদের ব্যবসা না থাকায় সংকটে পড়েছে। তাদেরকে আমরা কিছু সহায়তা দিয়েছি। আরও দেব।