যশোরে ৩ কিশোর হত্যায় ক্ষতিপূরণ দেয়ার সুপারিশ মানবাধিকার কমিশনের

বিডিনিউজ : যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে তিন কিশোরকে পিটিয়ে হত্যা ও ১৫ জনকে আহত করার ঘটনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ১৩টি সুপারিশ করেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন।

তাদের এসব সুপারিশের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং সেই সময় সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ ও আনসার সদস্যদের বিরুদ্ধে ‘দায়িত্বে অবহেলার’ জন্য বিভাগীয় ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সচিব (ভারপ্রাপ্ত) আল-মাহমুদ ফায়জুল কবীরের স্বাক্ষরে সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে কিশোর হত্যাকা-ের ঘটনায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এসব সুপারিশ করা হয়।

গত ১৩ অগাস্ট যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে কিশোর বন্দিদের মারধর করা হলে তিন কিশোর নিহত ও অন্তত ১৫ জন আহত হয়। এ ঘটনায় ১৪ অগাস্ট রাতে নিহত পারভেজের বাবা রোকা মিয়া যশোর কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন।

এ ঘটনা তদন্তে ১৪ অগাস্ট মানবাধিবার কমিশনের গঠিত দুই সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন কমিশনের উপ-পরিচালক এম রবিউল ইসলাম। কমিটির অপর সদস্য সহকারী পরিচালক মো. আজহার হোসেন।

মানবাধিকার কমিশনের সুপারিশে বলা হয়, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০০৯ এর ১৯ (২) ধারা অনুসারে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা পরিবারকে যথাযথ সাময়িক সাহায্য দিতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করা যেতে পারে। মামলায় নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন-২০১৩ এর সংশ্লিষ্ট ধারা অন্তর্ভুক্ত করে আদালতে আবেদন করতে পুলিশকে বলা হবে।

ঘটনার দিন দায়িত্বরত পুলিশ ও আনসার সদস্যদের ‘দায়িত্বে অবহেলার’ জন্য তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানো হবে।

এছাড়া জেলা পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বরতদের (জেলা জজ, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট) শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নির্দেশ দিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এবং সুপ্রিম কোর্টে সুপারিশ করা হবে। শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের নিবাসীদের জন্য বরাদ্দ চাল-ডাল, তরকারির মান উন্নয়ন ও যশোর কেন্দ্রের ঠিকাদার পরিবর্তনের জন্যও সুপারিশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন।

কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের নিবাসীদের অপরাধী নজরে দেখা, তাদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা, তাদের দিয়ে কাজ করানো, কর্তৃপক্ষের অনুগত নিবাসী তৈরি করা ও অতিরিক্ত সুযোগ সুবিধা দেওয়া এবং ভেতরে মাদকের ব্যবহারসহ গুরুতর অভিযোগ দেখার জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ দেবে কমিশন।

অন্যদিকে কেন্দ্রের নিবাসীদের বয়স ও অভিযোগের ধরন বিবেচনায় ভিন্ন ভিন্ন কক্ষে রাখা, ১৩ অগাস্টের ঘটনার সময় উপস্থিত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের (সংশ্ষ্টি পরামর্শক, শিক্ষক, সমাজকর্মীসহ) অন্যত্র বদলি করতে কর্তৃপক্ষকে সুপারিশ করবে কমিশন।

কেন্দ্রের শিশুদের স্বাভাবিক জীবনে আসতে মানসিকতা ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং সমাজে পুনর্বাসিত করার লক্ষ্যে শিশু উন্নয়নে কেন্দ্রগুলোর শিক্ষার স্তর মাধ্যমিক পর্যন্ত উন্নীত করা, একজন চিকিৎসকের স্থায়ী পদ তৈরি এবং খাবারের মান উন্নয়নের জন্য বাজেটে বরাদ্দ বাড়াতে সরকারকে সুপারিশ করা হবে।

এছাড়াও শিশু আদালতের বিচারককে মাসে একবার শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র পরিদর্শনের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সুপ্রিম কোর্টে সুপারিশ করা এবং জেলা পর্যায়ে এ জাতীয় সব প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পরিদর্শন সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে আহ্বায়ক করে একটি করে কমিটি গঠনের জন্য সুপারিশ করবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন।

তিন কিশোরকে পিটিয়ে হত্যা এবং অন্যদের আহত করার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলা তদারকি ও পরিচালনায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন থেকে প্যানেল আইনজীবীর মাধ্যমে সহায়তা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

পুলিশ ও আনসার সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সুপারিশের সিদ্ধান্তের কারণ জানতে চাইলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত কমিটির প্রধান রবিউল ইসলাম বলেন, “ঘটনার সময় দুইজন পুলিশ ও কয়েকজন আনসার সদস্য কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের ফটকে দায়িত্বরত ছিলেন। তার কয়েক গজের মধ্যেই ওই কিশোরদের নির্যাতন করা হয়। তাদের চিৎকার আশপাশের বাসিন্দারাও শুনতে পেয়েছেন।

“তাছাড়া প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন কিশোরের ভাষ্যমতে, ঘটনার সময় সেখানে পুলিশ ও আনসার সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। তাদের এই বক্তব্যের সত্যতা আমরা যাচাই করতে পারিনি। তবে ফটক থেকে চিৎকার-আর্তনাদ শুনেও কেন তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানায়নি সেটা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।”

১৩ অগাস্ট যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে কিশোর হত্যাক-ের পরদিন দায়ের হওয়া মামলায় কেন্দ্রের সহকারী পরিচালকসহ পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

এরপর কেন্দ্রের তত্ত্ববধায়ক (সহকারী পরিচালক) আব্দুল্যা আল মাসুদ, সহকারী তত্ত্বাবধায়ক (প্রবেশন অফিসার) মাসুম বিল্লাহ, ফিজিক্যাল ইনস্ট্রাক্টর একেএম শাহানুর আলম, সাইকো সোশ্যাল কাউন্সিলর মো. মুশফিকুর রহমান ও কারিগরি প্রশিক্ষক (ওয়েল্ডিং) ওমর ফারুককে সাময়িক বরখাস্ত করে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়।