শিশু আলআমিনের কি দোষ? ঘুমন্ত অবস্থায় পুড়লো শরীরের ৭০ ভাগ, নানি অক্ষত

 

বিল্লাল হোসেন ও এম আলমগীর : বৃহস্পতিবার দুপুর ১ টা। যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে ও আল্লাহ গো আল্লাহ গো বলে চিৎকার করছে শিশু আলআমিন (৫)। অবুঝ এই শিশুর কান্না শুনে অন্য রোগীর স্বজনরা চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। নিষ্ঠুর এ ঘটনার সাথে যারা জড়িত থাকুক না কেনো তাদের চিহ্নিত করে কঠিন শাস্তির দাবি করেন উপস্থিত মানুষ। তার মা ও নানীর অভিযোগ, ঘুমন্ত শিশু আলআমিনকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছে। আর এই অভিযোগের তীর শিশুর পিতা দাউদ সরদারের দিকে। তবে দাউদ সরদার ও তার পরিবারের সদস্যরা এ অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেছেন। এদিকে. একই মশারীর নিচে ঘুমিয়ে থাকা শিশু আলআমিনের শরীরের ৭০ ভাগ আগুনে পুড়ে গেলেও তার নানি অক্ষত থাকার বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। বুধবার গভীররাতে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার শংকরপুর ইউনিয়নের বাকুড়া গ্রামে ঘটনাটি ঘটেছে।

আলআমিনের মা তামান্না খাতুন জানান, অভাবেব সংসার হওয়ায় আমার মা সাকিরন নেছা বিগত দিনে বাকুড়া গ্রামের দাউদ সরদারের বাড়িতে কাজ করতেন। মা অসুস্থ হয়ে পড়ার আমি ওই বাড়িতে কাজ করা শুরু করি। দাউদ গাজী নানা প্রলোভন দেখিয়ে আমার সাথে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। আমি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে তিনি ঘটনা অস্বীকার করেন। তারপরেও আমি সন্তান নষ্ট না করে প্রসব করার সিদ্ধান্তে অনড় ছিলাম। সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বাচ্চা প্রসবও করি। কিন্তু কোন ভাবেই স্বীকৃতি দেয়নি দাউদ সরদার। এ ঘটনায় ২০১৫ সালের ২০ অক্টোরর  আমার মা সাকিরন নেছা বাদী হয়ে দাউদ সরদারের বিরুদ্ধে যশোর নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেন। মামলা নং-২২৩১৭। বর্তমানে মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালে-২ এ বিচারাধীন। দাউদ সরদার বরাবরই ঘটনা অস্বীকার করে আসছেন। বাদীর আবেদনের প্রেক্ষিতে বাচ্চার ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। রিপোর্টে প্রমাণ মেলে গর্ভের সন্তান দাউদ সরদারের।

তামান্না খাতুন আরো জানান, আদালতের নির্দেশে সন্তানের দায়িত্ব নিয়ে দায় এড়ান তিনি। তাকে লালন পালনের জন্য দিয়ে দেন হাজিরবাগ গ্রামের নাসিমা নামে এক নারীর কাছে।  আড়াই বছর পর সন্তানকে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনার পর আমার মা তাকে দেখভাল করতেন।

নানি সাকিরননেছা জানান,বর্তমানে আমাদের সদর উপজেলার দেয়াড়া ইউনিয়েনের এড়েন্দা গ্রামে বসবাস। মেয়ে তামান্নাকে অন্যত্র বিয়ে দেয়া হয়েছে।  নাতি আলআমিনকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি বাকুড়া গ্রামে বেড়াতে যায়। বুধবার রাতে নাতি ও আমি এক মশারির নিচে ঘুমিয়ে ছিলাম। রাত ১ টার দিকে আলআমিনের চিৎকার শুনে ঘুম ভেঙে যায়। এসময় দেখতে পায় মশারিতে আগুন জ্বলছে। আগুনে আলআমিনের শরীর পুড়ে গেছে। তখন আমি মশারি থেকে বের হয়ে ঘরের দরজা খুলে চিৎকার দিলে আশপাশের লোকজন এসে আলআমিনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। মা তামান্না ও নানি সাকিরননেছার অভিযোগ, দাউদ সরদার ইটের ফাঁক দিয়ে মশারিতে আগুন দিয়ে শিশু আলআমিনকে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে। এদিকে, যোগাযোগ করা হলে দাউদ সরদার ছেলেকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা চেষ্টার ঘটনা মিথ্যা দাবি করে জানান, আমাকে ফাঁসানোর জন্য নতুন করে নাটক করা হয়েছে। তিনি জানান,

বিগত দিনে ঝিকরগাছা থানা পুলিশের মাধ্যমে আট লাখ টাকা দিয়ে আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা মীমাংসা করে নেয়ার অঙ্গিকার করে। কিন্তু বাদী পক্ষ কোর্টে নারাজি দাখিল করেন। ফলে মামলার নিষ্পত্তিতে ব্যর্থ হয়। চলতি বছরের ছয় মাস আগে কোর্টের মাধ্যমে দাউদ সরদার বাদী সাকিরনকে আরও পাঁচ লাখ টাকা দেন মামলাটি মামলা নিষ্পত্তির জন্য। বাদী মামলা নিষ্পত্তি করে নেয়ার জন্য এফিডেভিট করে দেন। এফিডেভিটের কপি আদালতে জমা দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি দুই পক্ষের শুনানিতে বাদি আদালতে মামলা নিষ্পত্তি করে নেয়ার জন্য রাজি হন। তবে বাদীর হুমকি ধামকির অভিযোগে বিচারক আমাকে সতর্ক করে বলেন, আগামী ১ নভেম্বর মামলার রায় হবে। এরমধ্যে শিশু আলআমিনের কিছু হলে বুঝে দিতে হবে। দাউদ সরদারের দাবি, মামলার রায় হওয়ার আগেই শিশুকে আগুনে পুড়িয়ে আমার ওপর দায় চাপানো হচ্ছে। দাউদ সরদারের প্রশ্ন, একই বিছানার মশারির নিচে নানির সাথে ঘুমিয়ে ছিলো আলআমিন। আগুনে তার শরীরের ৭০ ভাগ পুড়ে গেলো আর নানি সাকিরননেছা কিভাবে অক্ষত রয়েছেন। নিরপেক্ষভাবে ঘটনার তদন্ত করলে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা চেষ্টার সাথে কারা জড়িত তা বেরিয়ে আসবে। এ বিষয়ে সাকিরন নেছাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, দেয়ালের গা ঘেঁষেই আলআমিন ঘুমিয়ে ছিলো। আর আমি বিছানার এই প্রান্তে ছিলাম। মশারিতে আগুন লাগার পর তা আলআমিনের শরীরে জড়িয়ে গিয়েছিলো। আর আমি বিছানা থেকে উঠেই বাইরে চলে আসার কারণে আগুন আমাকে স্পর্শ করতে পারেনি। হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, আলআমিনের পাশে বসে রয়েছে তার নানি সাকিরননেছা। তার শরীরের কোথাও আগুনের ক্ষত নেই। তিনি কান্নাকাটি করে বলছেন দাউদ সরদার আমার সোনাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে। দাউদের ছেলে-মেয়েরা অনেক বড়, উচ্চ শিক্ষিত ও বিভিন্ন জায়গায় চাকরি করেন। ৫ বছরের ছোট বাচ্চা যখন তাকে আব্বা-আব্বা বলে ডাকে, তখন তাদের সম্মানে বাধে। যে কারণে অবুঝ শিশুকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছে। মুঠোফোনে কথা হলে দাউদ সরদারের এক মেয়ে জানান, নিজেরা এ ঘটনা ঘটিয়ে আমার পিতাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। ওই মেয়ে জানান, মামলা নিষ্পত্তি হয়ে গেলে বাদী সাকিরন নেছার অর্থ বানিজ্য বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে এটা তাদের নতুন পরিকল্পনা। যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শিশু আলআমিনের শরীরের ৭০ ভাগ আগুনে পুড়ে গেছে। তার উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন। যে কারণে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে তাকে রেফার্ড করা হয়েছে। ঝিকরগাছা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুর রাজ্জাক জানান, সন্ধ্যার পর সাংবাদিকদের মাধ্যমে বিষয়টি শুনেছি। এ ঘটনায় কেউ অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।