আদালতে আটক ৪জনের স্বীকারোক্তি ‘স্ত্রীর পরকীয়ার বলি মান্নাত’

নিজস্ব প্রতিবেদক : স্ত্রীর পরকীয়ার কারণেই খুন হন যশোরের স্কেভেটর শ্রমিক ইসরাফিল হোসেন মান্নাত (৪২)। তার ভগ্নিপতি শাহ আলমসহ ৭জন ওই হত্যার সাথে জড়িত। এদের মধ্যে আটক করা হয়েছে ৪ জনকে। একইসাথে উদ্ধার করা হয়েছে হত্যাকাজে ব্যবহৃত লোহার পাইপ, ইট ও একটি মোটরসাইকেল। সোমবার দুপুরে পুলিশ সুপার নিজ কার্যালয়ের আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ হত্যা সম্পর্কে নানা তথ্য জানান।

আটককৃতরা হলো, যশোর সদর উপজেলার মাহিদিয়া গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে আল আমিন ওরফে গ্যারেজ আল-আমিন (১৯), পুরাতন কসবা কাঁঠালতলা (নান্টুর বাগান) এলাকার আবু তাহেরের ছেলে রিফাত (১৯), সুজলপুরের আব্দুর রশিদ শেখের ছেলে রায়হান শেখ (২২) ও শফিকুল ইসলাম বাবুর ছেলে নয়ন হোসেন (২০)।

এদিকে আটক চারজনই সোমবার আদালতে এই হত্যাকান্ড সম্পর্কে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ আশরাফ হোসেন প্রেসব্রিফিং এ জানান, গত ২৩ অক্টোবর রাতে নিজের বাইসাইকেল নিয়ে বের হয়েছিলেন মাটিকাটা স্কেভেটরের হেলপার মান্নাত। রাতে আর বাড়িতে ফেরেননি তিনি। পরের দিন সকালে কারবালা এলাকার রাস্তার পাশ থেকে তার মাথা থেতলানো মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহতের মা আনোয়ারা বেগম ৪ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরো ৬/৭জনের নামে মামলা করেন।

আসামি করা হয় তার জামাই শহরের পুরাতন কসবা কাজীপাড়া এলাকার শফিয়ার রহমানের ছেলে শাহ আলম (৪২), তার ভাগ্নে ধর্মতলা এলাকার সলেমানের ছেলে শামীম (২৫), নিহত মান্নাতের স্ত্রী বকচর চৌধুরী পাড়ার নজরুল ইসলামের মেয়ে শারমিন সুলতানা সুমি (২৮) এবং সুমির মা সুফিয়া বেগমকে (৪৮)। এরপর ডিবি পুলিশ তদন্ত শুরু করে।

পুলিশ সুপার আরো জানান, মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে রোববার যশোর অভয়নগর উপজেলার চেঙ্গুটিয়া এলাকা থেকে হত্যায় জড়িত আল আমিনকে এবং যশোর শহরের চাঁচড়া চেকপোস্ট এলাকা থেকে রায়হান শেখ, রিফাত ও নয়ন হোসেনকে আটক করা হয়। পরে তাদের স্বীকারোক্তি মতে হত্যাকাজে ব্যবহৃত জিআই পাইপ, একটি ইট ও মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, আটককৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানাগেছে, নিহত মান্নাতের ভগ্নিপতি শাহ আলমের সাথে পরকীয়া সম্পর্ক ছিল তার স্ত্রী শারমিন সুলতানা সুমির। এই নিয়ে ওই সংসারে অশান্তি লেগে থাকতো। মান্নাত-সুমির সংসারে দুইটি সন্তান আছে। আর শাহ আলম-শরিফা বেগমের সংসারে তিনটি সন্তান আছে। শাহ আলমের বেশ কয়েকটি গাড়ি আছে। এছাড়া মাটি কাটার মেশিন স্কেভেটর আছে বেশ কয়েকটি। ওই ব্যবসা করে শাহ আলম কোটি টাকার মালিক বনে যায়। অশিক্ষিত-নিরক্ষর শাহ আলম গোপনে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে তার ভাবি সম্পর্কের সুমির সাথে। তাদের মধ্যে দৈহিক সম্পর্ক হয়। এই নিয়ে বিরোধ তৈরি হয় সংসারে। মাস তিনেক আগে সুমি গোপনে তালাক দেয় তার স্বামী মান্নাতকে। এরপর তারা ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে বাড়ি ভাড়া করে সেখানে বসবাস করতে থাকে। কিন্তু মান্নাত তার স্ত্রীকে খোঁজ করতে থাকে। একদিকে স্ত্রী অন্যদিকে বোনের স্বামী। দুইটি সংসার শেষ হতে চলেছে এই ভেবে খোঁজার এক পর্যায়ে কোটচাঁদপুরে তাদের সন্ধান পান। সেখানে গিয়ে মান্নাত জানতে পারেন তাকে তালাক দিয়েছে সুমি এবং বিয়ে করেছে শাহ আলমকে। পরে সেখানকার স্থানীয় ইউপি মেম্বার ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে গত ২ অক্টোবর এক সালিসে একটি সুরাহা হয়। ওই শালিসে সুমি তালাক দেন শাহ আলমকে। সুমি কোটচাঁদপুরে থেকে যান। আর শাহ আলম যশোরে ফিরে আসে।

প্রেসব্রিফিং এ আরো জানানো হয়, ২ অক্টোবর দিবাগত রাত তিনটার দিকে মান্নাতকে বকচর করিম পাম্পের সামনে বেশ কয়েকজন মারপিট করে। সে সময় তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে ৫/৬জনকে ধরে ফেলে এবং তাদের উল্টো মারপিট করে। মারপিটের শিকার হয় আটক ৪জনও। সে সময় শাহ আলম ক্ষিপ্ত হয় এবং মান্নাতকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে।

এদিকে মান্নাতের বোন শরিফা বেগম পরিবারের সদস্যদের জানায়, শাহ আলম বাড়িতে ঠিকমতো আসে না। পরিবারের সাথে ঠিকমতো যোগাযোগ রাখে না। তাহলে ফের সুমির সাথে হয়তো যোগাযোগ আছে। বিষয়টি মান্নাত খোঁজ খবর নেয়ার জন্য শাহ আলমের প্রাইভেটকার চালক আল আমিনকে (২৫) কাজে লাগায়। আল আমিন রামনগর খাঁপাড়ার ছমেদ আলীর ছেলে। আল আমিন বিষয়টি তার মালিক শাহ আলমকে জানালে শাহ আলম সুযোগ খুঁজতে থাকে। শাহ আলম উল্টো চালক আল আমিনকে কাজে লাগায়। গত ২৩ অক্টোবর রাত সাড়ে ১০টার দিকে মান্নাত বকচর বিহারী কলোনী এলাকার রয়েলের দোকানে চা পান করছিলেন। সে সময় আল আমিন কথা আছে বলে মান্নাতকে ফোনে জানায়। আল আমিনের কথায় বিশ্বাস স্থাপন করে মান্নাত বাইসাইকেল নিয়ে যান দড়াটানায়। সেখানে ৪/৫জনের সাথে কথা হয় মান্নাতের। ওই কথাবলা দেখতে পায় মান্নাতের ছোট ভাই বাবর আলী। পরে মান্নাত বাইসাইকেলে করে এবং ওই ৪/৫জন অজ্ঞাত যুবক একটি প্রাইভেটকারে করে কারবালার দিকে চলে যায়। কারবালা এলাকার সিঅ্যান্ডবি রোডের কৃষিবিদ শাহ আলমের বাড়ির সামনে ইট দিয়ে ও একটি জিআই পাইপ দিয়ে শাহ আলমকে পিটিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায় আসামিরা।

এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেছেন, ওই হত্যাকাণ্ডের সাথে ৭ জন জড়িত। বাকি ৩জনকে আটকের চেষ্টা চলছে। এই মামলার মূল আসামি শাহ আলম পলাতক রয়েছে। আর নিহতের স্ত্রী শারমিন আকতার সুমি এই হত্যা মামলার আসামি হবেন। তার কারণে এই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত। তিনি বলেছেন, শাহ আলমের ড্রাইভার আল আমিন পলাতক রয়েছে। তার ভূমিকায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তাকেও আটকের চেষ্টা করা হচ্ছে।

এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের এসআই মফিজুল ইসলাম বলেছেন, আটক ৪ জনই সোমবার সন্ধ্যার দিকে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুরুল ইসলামের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। বিচারক তাদের জবানবন্দি ১৬৪ ধারায় রেকর্ড করেছেন।