মণিরামপুরে ভাগ্নি ‘ধর্ষণ’ কাণ্ডে তোলপাড়

নুরুল হক, মণিরামপুর (যশোর) : যশোরের মণিরামপুর উপজেলার দেবিদাসপুর গ্রামে দিনের পর দিন ভাগ্নিকে ‘ধর্ষণ’ করার অভিযোগ ফাঁস হয়ে যাওয়ায় তোলপাড় চলছে। ঘটনা ধামাচাপা দিতে ভাগ্নিকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে স্থানীয় প্রশাসনের লোকজন ওই বাড়িতে গিয়ে মেয়েটির সাথে কথা বলেছেন। তাকে তার আরেক মামা ও স্থানীয় চেয়ারম্যানের জিম্মায় রেখেছে প্রশাসনের কর্মকর্তারা। ওই মেয়ে নির্যাতিত হয়েছে বলে প্রশাসনের কাছে জানিয়েছে। আজ (মঙ্গলবার) মেয়েটির মা ভারত থেকে এসে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানাগেছে।

মণিরামপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) খোরশেদ আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, ৫ম শ্রেণিতে পড়া একটি মেয়ে তার মামা কর্তৃক ধর্ষণের শিকার হয়েছে এমন সংবাদের প্রেক্ষিতে দেবিদাসপুর গ্রামে গিয়ে মেয়েটির সাথে কথা হয়। তার সাথে ছিলেন, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মৌসুমি আকতার, মণিরামপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মতিউর রহমানসহ অন্যান্য কর্মকর্তা।

খোরশেদ আলম জানিয়েছেন, ‘মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা ওই মেয়েটির সাথে কথা বলেছেন। মেয়েটি জানিয়েছে, ৬/৭ মাস ধরে তার ওপর নির্যাতন চালিয়েছে তার মামা শফিকুল ইসলাম। শিশুকাল থেকে মেয়েটি লালন পালন করেছে তার মামা শফিকুল। মেয়েটির মায়ের প্রথম ঘরের সন্তান সে। তার মায়ের প্রথম বিয়ে হয়েছিল সিলেট। সেই ঘরে শিশুটির জন্ম। পরে ওই সংসার টেকেনি। পরে তার মা আরেকটি বিয়ে করে ভারতে চলে যান। বর্তমানে ভারতে আছেন। আর শিশু মেয়েটিকে রেখে যায় ভাই শফিকুলের কাছে।’

তিনি বলেছেন, ‘আমরা সেখানে গিয়ে জানতে পেরেছি, ওই মেয়েকে দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতন করা হয়। গত রোববার তার এক মামি বিষয়টি দেখে ফেলে এবং সংবাদ রটে যায়। তবে শফিকুলকে পাওয়া যায়নি। ওই পরিবারের কেউ এই বিষয়ে পুলিশে কাছে মামলা করতে রাজি হয়নি। শেষে মেয়েটির আরেক মামা তরিকুল ইসলাম ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের জিম্মায় রেখে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া ওই মেয়েকে অন্য কোথাও নেয়া যাবে না। মেয়েটির মা মঙ্গলবার ভারত থেকে এসে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে পরিবারের লোকজন জানালে সেখান থেকে চলে আসি।’

এলাকাবাসী জানিয়েছে, রোববার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শফিকুল ভাগ্নিকে আবারও ধর্ষণ করে। এ সময়ে ঘরের পাশ দিয়ে প্রতিবেশী এক নারী মেয়েটির গোংরানোর শব্দ পেয়ে টিনের ফাঁক দিয়ে ধর্ষণের বিষয়টি দেখে ফেললে জানাজানি হয়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় তোড়পাড়ের সৃষ্টি হয়। কিন্তু অপরাধী আপন মামা হওয়ায় ঘটনা ধামাচাপা দিতে মামার বাড়ির লোকজন মেয়েটিকে অবরুদ্ধ করে রাখে। গণমাধ্যমকর্মীরা জানতে পেরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে মেয়েটির সাথে কথা বলে বিষয়টি নিশ্চিত হয়।

এদিকে নির্যাতনের শিকার ছাত্রী জানিয়েছে, ‘তার মায়ের সাথে বাবার ডিভোর্স হয় ১০ বছর আগে। বাবা তাদের ছেড়ে চলে গেছে। জীবিকার তাগিদে মা বাইরে থাকে। এরপর মায়ের পাঠানো টাকা দিয়ে মামার বাড়িতে তৈরিকৃত আলাদা ঘরে সে বসবাস করে আসছে। ৬ মাস আগে থেকে সুযোগ পেলে ছোট মামা শফিকুল ইসলাম ঘরে ঢুকে গলায় দা ঠেকিয়ে জোর করে তার উপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে আসছে। কাউকে বললে রাতে বালিশ চাপা দিয়ে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। এছাড়া তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখানো হতো।’

রোববার সকালে বিষয়টি ফাঁস হয়ে পড়ে। এসময় ওই ছাত্রী তার নিকটাত্বীয়সহ গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে তার উপর চালানো পাশবিক নির্যাতনের পুরো ঘটনা খুলে বলে।

এদিকে ঘটনা প্রকাশ হয়ে পড়লে নির্যাতিতার মামার বাড়ির লোকজন পরিবারের মান সম্মানের কথা বিবেচনা করে মেয়েটিকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে বলে এলাকাবাসী  জানিয়েছেন। মেয়েটি গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে মুখ খোলায় তাকে অন্যত্র সরিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র করছে। তাছাড়া সে যেন প্রশাসন বা গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে ধর্ষণের বিষয়ে কোনো কিছু প্রকাশ না করে সে জন্য হুমকি-ধামকিসহ নানা রকম ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

শফিকুল ও তার ভাই তরিকুল সাংবাদিকসহ যারা মেয়েটির পক্ষে কথা বলবে তাদেরকে দেখে নেয়ার হুমকি দিচ্ছে।

এদিকে এ বিষয়ে শফিকুল ইসলামের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। তিনি ফোন রিসিভ করে সাংবাদিক পরিচয় দিলে ফোনটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরবর্তীতে তাকে একাধিকবার কল করলেও ফোন আর রিসিভ করেননি।

স্থানীয় ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন মোল্লা বলেছেন, ‘মামা শফিকুল ইসলাম প্রায় তার ভাগ্নির উপর এমন পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে আসছে বলে একাধিক ব্যক্তির মারফত জানতে পেরেছি। আমি নিজে থানায় ফোন দিয়ে পুলিশকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছি।’

থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এ ঘটনায় থানায় এখনও কেউ অভিযোগ করেনি। সংবাদ পেয়ে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। এছাড়া প্রশাসনের একটি টিম সেখানে গিয়েছিল। পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’