সুদের টাকা নিয়ে বিরক্ত মামুন খুন করে গোলাম মোস্তফাকে

নিজস্ব প্রতিবেদক : সুদে ২ লাখ টাকা নিয়ে ১০ লাখ টাকা পরিশোধ করেও ঋণমুক্ত হননি স মিল মালিক আব্দুল্লাহ আল মামুন (৩৩)। অতিষ্ঠ হয়ে বন্ধু সহিদুল ইসলামকে সাথে নিয়ে গলাকেটে হত্যা করে যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি বাগডাঙ্গা সরদার পাড়ার কাঠ ব্যবসায়ী গোলাম মোস্তফাকে (৫৫)।

পুলিশের হাতে আটক আব্দুল্লাহ আল মামুন ও সহিদুল ইসলাম হত্যা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে। তারা বৃহস্পতিবার বিকেলে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুদ্দীন হোসাইনের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। বিচারক তাদের জবানবন্দি ১৬৪ ধারায় রেকর্ড করেছেন। এর আগে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এক প্রেসব্রিফিং এ পুলিশ সুপার আশরাফ হোসেন হত্যার মূল কারণ সম্পর্কে সাংবাদিকদের অবহিত করেন। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি চাকু, একটি মোটরসাইকেল এবং নিহত গোলাম মোস্তফার মোবাইল ফোন সেট উদ্ধার করে পুলিশ।

আব্দুল আব্দুল্লাহ আল মামুন (৩৩) চুড়ামনকাটি এলাকার আব্দুর রহমানের ছেলে। আর সহিদুল ইসলাম (৩৭) সদর উপজেলার শাঁখারীগাতি গ্রামের মাজেদ মোল্লার ছেলে।

পুলিশ সুপার আশরাফ হোসেন জানান, চুড়ামনকাটি এলাকার বাগডাঙ্গা গ্রামের কাঠ ব্যবসায়ী গোলাম মোস্তফা গত ২৪ অক্টোবর বিকেল ৪টার দিকে বাড়ি থেকে বের হন। এরপর আর বড়িতে ফেরেননি। পরদিন ২৫ অক্টোবর সকাল সাড়ে নয়টার দিকে তার লাশ নদে ভাসতে দেখে স্থানীয় লোকজন পুলিশে সংবাদ দেয়। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে। এই ঘটনায় নিহতের স্ত্রী অজ্ঞাত আসামি করে একটি মামলা করেন।

প্রেসব্রিফিং এ বলা হয়, আব্দুল্লাহ’র একটি স মিল আছে চুড়ামনকাটি বাজারে। সে কারণে কাঠ ব্যবসায়ী গোলাম মোস্তফার সেখানে উঠাবসা আছে। গোলাম মোস্তফা কাঠ কেনাবেচার পাশাপাশি সুদে প্রচুর টাকা দিতেন মানুষকে। দাদন ব্যবসাও করতেন তিনি। আব্দুল্লাহ এক সময় তার প্রয়োজনে সুদে দুই লাখ টাকা নেয়। ওই টাকা চক্রবৃদ্ধিহারে পরিশোধ করতে থাকেন। ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত দিয়েছে মোস্তফাকে। কিন্তু টাকা পরিশোধ হয় না। সর্বশেষ ৩৭ হাজার টাকা দাবি করেন মোস্তফা। এ নিয়ে মহাবিরক্ত হয় আব্দুল্লাহ। তাদের মধ্যে চাচা-ভাতিজার সম্পর্ক। মোস্তফা ফেনসিডিল ও গাঁজা সেবন করতেন। মাঝেমধ্যে আব্দুল্লাহকে সাথে নিয়ে যেতেন। মোস্তফার কারণে আব্দুল্লাহ মাদক সেবন শেখে। গত ২৪ অক্টোবর বিকেলে আব্দুল্লাহ তার বন্ধু সহিদুলের সাথে দেখা করার জন্য মণিহার প্রেক্ষাগৃহ এলাকায় আসেন। সহিদুল রোজিনা পরিবহনের চালক। সহিদুলকে সাথে নেয়ার জন্য আব্দুল্লাহ পীড়াপিড়ি করলে সহিদুল জানায় তার ট্রিপ আছে। সে সময় আব্দুল্লাহ প্রলোভন দেখায় ট্রিপের চেয়ে বেশি টাকা পাওয়া যাবে তার সাথে গেলে। আব্দুল্লাহ ও সহিদুল সন্ধ্যার দিকে চুড়ামনকাটি বাজারে যায়। সেখানে গিয়ে আব্দুল্লাহ ফোন করে মোস্তফাকে। বলা হয় একজন মেহগুনি কাঠ কিনবেন বেশি দামে। সংবাদ পেয়ে মোস্তফা বাজারে আসেন। এরপর তারা তিনজন মোটরসাইকেলে করে চৌগাছা উপজেলার সুলয়া বাজারে যায়। সেখানে গিয়ে তারা ফেনসিডিল সেবন করে। পরে সন্ধ্যার দিকে ফের চুড়ামনকাটি বাজারে আসে। সেখান থেকে একশ’ গ্রাম গাঁজা কিনে চলে যায় ঘোনা গ্রামের ভৈরব নদের পাড়ে। সেখানে বসে গাঁজা সেবনের পর মোস্তফা উঠতে যান। সে সময় আব্দুল্লাহ পেছন থেকে একটি বার্মিজ চাকু দিয়ে গলায় টান দেয়। মোস্তফা তখনই হাত ধরে ফেলে এবং দুইজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। পরে নদের পাড় থেকে মোস্তফা নদের ঢালে পড়ে যান।  সে সময় দুইজনই ঢালে গিয়ে সহিদুল পা চেপে ধরে আর আব্দুল্লাহ চাকু দিয়ে গলাকেটে হত্যা করে। মৃত্যুর পর নদের মধ্যে লাশ ফেলে দিয়ে ওপরে কচুরিপানা দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। পরে ওই মোটরসাইকেল নিয়ে তারা চলে আসে এবং নদের পাশের একটি কালভার্টের নিচে মোস্তফার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি ফেলে দেয়।

পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, ঘটনার পর পুলিশ ব্যাপক অনুসন্ধান চালায়। বিভিন্ন সোর্স ও তথ্য প্রযুক্তির সহযোগিতা নিয়ে আব্দুল্লাহ ও সহিদুলকে আটক করে গত বুধবার। আব্দুল্লাহর বাড়ি থেকে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত চাকু ও মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। এছাড়া নিহতের মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করা হয়েছে। মূলত সুদের টাকা লেনদেন নিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এই হত্যাকাণ্ডে এখন পর্যন্ত দুইজনের সম্পৃক্ততার কথা জানতে পেরেছে পুলিশ।

প্রেসব্রিফিং এ অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) সালাউদ্দিন সিকদার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) তৌহিদুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক সার্কেল) গোলাম রাব্বানী, সহকারী পুলিশ সুপার অপু সরোয়ার, জেলা গোয়েন্দা শাখার পরিদর্শক-১ মশিউর রহমান, ডিবি পুলিশের ওসি ইন্সপেক্টর সোমেন দাস, সাজিয়ালি পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই কামরুজ্জামান প্রমুখ।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের এসআই নুর ইসলাম জানিয়েছেন, আটক দুই আসামি বৃহস্পতিবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুদ্দীন হোসাইন ওই জবানবন্দি রেকর্ড করেছেন।