রাজনীতিতে আবারও আগুন-সন্ত্রাস !

গত ১২ নভেম্বর ছিল দুটি সংসদীয় আসনের উপনির্বাচন। ঢাকা-১৮ এবং সিরাজগঞ্জ-১ আসন দুটি শূন্য হয় যথাক্রমে সাহারা খাতুন এবং মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুতে। তারা দুজনেই ছিলেন আওয়ামী লীগের বড় নেতা এবং সাবেক মন্ত্রী। ভোট মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবেই শেষ হয়েছে। ঢাকা-১৮ আসনে জয় পেয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোহাম্মদ হাবিব হাসান এবং সিরাজগঞ্জ-১ আসনে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী তানভীর সাকিল জয়। তিনি মোহাম্মদ নাসিমের পুত্র এবং এর আগেও একবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে ঢাকার প্রার্থী হাবিব হাসান এবারই প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। দুই বিজয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দন।

উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ অংশ বিএনপি অংশ নিয়েছিল। কিন্তু ভালো ফল পায়নি। ঢাকার আসনে উপনির্বাচনে ভোট পড়েছে মাত্র ১৪ দশমিক ১৮ শতাংশ কিন্তু সিরাজগঞ্জে প্রায় ৫১ শতাংশ ভোট পড়েছে। সিরাজগঞ্জের নৌকার প্রার্থী পেয়েছেন ১ লাখ ৮৮ হাজার ৩২৫ ভোট। আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষের সেলিম রেজা পেয়েছেন মাত্র ৪৬৮ ভোট। ঢাকায় নৌকার প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট ৭৫ হাজার ৮২০ এবং ধানের শীষের এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন পেয়েছেন ৫ হাজার ৩৬৯ ভোট।

অপরিকল্পিতভাবে, হঠাৎ খেয়াল বা উত্তেজনা বা আবেগের বশে কেউ একজন বা একটি গ্রুপ এই কাজটি করেনি। যথেষ্ট হিসাবনিকাশ করেই এটা করা হয়েছে। যারা করেছে তারা টোকাই নয়, অভিজ্ঞ বা এই কাজে পারদর্শী। একটি বিষয় লক্ষণীয়, প্রতিটি বাস পুড়েছে কিন্তু দগ্ধ হয়ে হতাহতের ঘটনা নেই একটিও। আতঙ্ক ছড়ানো ছিল লক্ষ, মানুষ মারা নয়। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বাইরে ক্যাডার ছাড়া ভাড়াটে সন্ত্রাসী দিয়ে এমন অঘটন ঘটানো সম্ভব কিনা, ভাববার বিষয় সেটাও

বিএনপি দাবি করেছে, ভোট সুষ্ঠু হয়নি। মানুষ ভোট দিতে পারেনি। নির্বাচনের নামে প্রহসন হয়েছে। তাই দলটি এই নির্বাচনী ফলাফল বাতিলের দাবি জানিয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনর কে এম নুরুল হুদা মনে করেন, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। তিনি নির্বাচন নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করলেও আরেক নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার মনে করেন খুবই খারাপ নির্বাচন হয়েছে। এই সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু ও ভালো নির্বাচন সম্ভব নয়-এ কথা বিএনপি অনেক আগে থেকেই বলে আসছে। নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সংশয় আছে সাধারণ মানুষের মধ্যেও। নির্বাচনের নামে যা চলছে তা নিয়ে তর্কবিতর্ক আছে সব পর্যায়েই। কিন্তু তারপরও নির্বাচন হচ্ছে। বিএনপিও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। তবে উপনির্বাচনগুলোতে বিএনপির অংশগ্রহণ অনেকটাই দায়সারা গোছের। অন্য কোনো বিকল্প নেই, আন্দোলন করে অবস্থা বদল করা যাচ্ছে না, তাই বিএনপি উপনির্বাচনে অংশ নিয়ে যাচ্ছে এবং নির্বাচনের পর একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।

উপনির্বাচনে সরকারি দলের প্রার্থীদের পরাজয় ঘটবে- এমনটা কেউ আশা করেন বলে মনে হয় না। দেশে এখন চলছে আওয়ামী লীগের শাসন। আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নেই বললেই চলে। বিএনপিরও এখন চলছে ঘোর দুর্দিন। দলটি বলতে গেলে বেহাল অবস্থার মধ্যে আছে। দলের নেতৃত্ব সংকট চরমে। চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আপাতত মুক্ত জীবনযাপন করলেও রাজনীতি থেকে দূরে আছেন। তার জীবন চলছে সরকারি শর্তাধীনে। এক সময়ের আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়ার বর্তমান অবস্থা দলের নেতাকর্মীদের ফেলেছে চরম হতাশার মধ্যে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিদেশে থেকে স্কাইপে দল পরিচালনা করছেন। এতে দল সত্যিকার অর্থে পরিচালিত হচ্ছে কিনা সে প্রশ্ন আছে সব মহলেই।

দলের সিনিয়র নেতাদের মধ্যে আছে মতবিরোধ, অবিশ্বাস, সন্দেহ এবং সমন্বয়হীনতা। দলের ভেতরে গ্রুপিং না কমে দিন দিন তা বাড়ছে। অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলা করে বিএনপি আবার কবে, কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে- সেটা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছেও একটি বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। ধারণা করা হচ্ছে অপেক্ষার পালা যত দীর্ঘ হবে, বিএনপির রাজনীতিতে অস্থিরতাও তত বাড়বে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যতই বলুন না কেন যে, নির্বাচন ছাড়া ক্ষমতায় যাওয়ার অন্য কোনো পথ নিয়ে বিএনপি ভাবে না, তার এই বক্তব্য বিএনপির সব নেতাকর্মীও মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন কিনা সন্দেহ। বিএনপি ক্ষমতাকেন্দ্রিক দল। বছরের পর বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা এই দলের জন্য তাই অসম্ভব।

গণআন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে নত করতে না পারলে বিএনপির মধ্যেও নানা ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হবে না তা কে নিশ্চিত করে বলতে পারে? এটা মনে রাখা দরকার যে, বিএনপি কোনো আদর্শবাদী দল নয়। নানা মত-পথের মানুষের সুবিধা আদায়ের একটি প্লাটফরম হলো বিএনপি। তাই বিএনপিতে একমুখী চিন্তার প্রভাব স্থায়ী হওয়ার কথা নয়। যখন যেটা সুবিধাজনক মনে হবে সেটার অনুসরণই দলটি করতে পারে।

তবে আওয়ামী লীগবিরোধিতা, ভারতবিরোধিতা, সাম্প্রদায়িকতা, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার– এই বিষয়গুলো থেকে বিএনপি যে দূরে থাকবে না, সেটা জোর দিয়েই বলা যায়। আর সাধারণ মানুষের মধ্যেও এইসব প্রবণতা ক্রমবর্ধমান। মানুষের মধ্যে অসহিষ্ণুতা বাড়ছে। মানুষ ক্রমেই সহনশীলতা হারাচ্ছে। গুজবনির্ভরও হয়ে পড়ছে। এগুলো ভালো লক্ষণ নয়। কেন এমন হচ্ছে তার রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক কারণ অসুসন্ধানের চেষ্টা কাউকে করতে দেখা যাচ্ছে না। কাছের জিনিস নিয়েই মাতামাতি সবার। একটু দূরে দেখার সময় ও ধৈর্য কারো মধ্যেই তেমন সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। আলোর প্রত্যাশা আছে কিন্তু সাধনা চলছে আঁধারের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার।

গত ১২ নভেম্বর উপনির্বাচনের দিন আবার নতুন করে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে কমপক্ষে ১১ টি বাসে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনাটি রাজনীতিতে কিছুটা নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে পাঁচ বছর বিরতি দিয়ে রাজনীতিতে কি আবারও আগুন-সন্ত্রাস ফিরে আসছে? দিনভর ১১ টি বাসে প্রায় অভিন্ন কায়দায় আগুন ধরিয়ে দেওয়ার বিষয়টিকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।

অপরিকল্পিতভাবে, হঠাৎ খেয়াল বা উত্তেজনা বা আবেগের বশে কেউ একজন বা একটি গ্রুপ এই কাজটি করেনি। যথেষ্ট হিসাবনিকাশ করেই এটা করা হয়েছে। যারা করেছে তারা টোকাই নয়, অভিজ্ঞ বা এই কাজে পারদর্শী। একটি বিষয় লক্ষণীয়, প্রতিটি বাস পুড়েছে কিন্তু দগ্ধ হয়ে হতাহতের ঘটনা নেই একটিও। আতঙ্ক ছড়ানো ছিল লক্ষ, মানুষ মারা নয়। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বাইরে ক্যাডার ছাড়া ভাড়াটে সন্ত্রাসী দিয়ে এমন অঘটন ঘটানো সম্ভব কিনা, ভাববার বিষয় সেটাও।

এখন প্রশ্ন হলো, কারা এমন একটি সিদ্ধান্ত নিলো? এতে কার লাভ বা কার কি ক্ষতি হলো? এই ধরনের হঠকারিতা থেকে কারো ফায়দা হাসিলের খুব একটা সুযোগ থাকে কি? মানুষ এসব পছন্দ করে না, এসব যারা করে তাদের পেছনে সাধারণ জনগণ দাঁড়ায় না। ২০১৪ এবং ২০১৫ সালে আমরা দীর্ঘ সময়ধরে দেশের মধ্যে এই আগুন-সন্ত্রাস আমরা দেখেছি। নির্বাচন ভণ্ডুল করা এবং সরকারের পতন ঘটানোর জন্য ওই দুই বছর বিএনপি-জামায়াত জোট ওই আগুন-সন্ত্রাস চালিয়েছিল। বাস-ট্রেন-লঞ্চে আগুন দিয়ে জীবিত মানুষকে পুড়িয়ে মারার মতো নৃশংসতাও তখন আমরা দেখেছি। কিন্তু ওসব করে নির্বাচনও বন্ধ করা যায়নি, সরকারেরও পতন ঘটেনি। উল্টো বিএনপি-জামায়াতের জনবিচ্ছিন্নতা বেড়েছে। ওই সর্বনাশা আন্দোলনে নেমে বিএনপি যে মুখ থুবড়ে পড়ছে গত পাঁচ বছররেও আর হাঁটু সোজা করে দাঁড়াতে পারছে না। সরকারকে দুর্বল করতে গিয়ে নিজেরাই এতটা দুর্বল হয়েছে যে কোনো টনিকেও আর বল ফিরে পাচ্ছে না।

এই বাস্তবতা মনে রেখে বিএনপি বা জামায়াতের আর আগুন-সন্ত্রাসের পথে হাঁটার কথা নয়। তাহলে এবার রাজধানীতে বাসে আগুন দিলো কারা? সরকার এবং আওয়ামী লীগ দুষছে বিএনপিকে। আবার বিএনপি দুষছে আওয়ামী লীগকে, সরকারকে। কেউ বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-প্রমাণ হাজির করতে পারছে তা কিন্তু নয়। সরকার বা আওয়ামী লীগ কোনো চাপে নেই। বিএনপি নিয়ে কোনো ভয় বা আতঙ্ক আছে বলেও মনে হয় না। তাহলে শান্ত রাজনৈতিক পরিবেশকে সরকার বা সরকারি দল হঠাৎ করে উত্তপ্ত করতে যাবে কেন? এটা করে সরকারের লাভ কি? বিএনপিকে আরও কোণঠাসা করা? কিন্তু অভিযোগ যদি প্রমাণ করা না যায়, অযথা যদি বিএনপির নেতাকর্মীদের মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করা হয়, তাহলে সেটা কি সরকারের সবলতার পরিচয় বলে মনে হবে? মানুষ কি সেটা ভালোভাবে নেবে?

আবার খাদে পড়া বিএনপির পক্ষেও কি বর্তমান অবস্থায় এমন কাজ করা সম্ভব? বিএনপির অতীত পর্যালোচনা করে কেউ হয়তো এ প্রশ্নের হ্যাঁ সূচক জবাব দেবেন। সব মিলিয়ে সন্দেহের তীর বিএনপির দিকেই বেশি। কারণ তাদের এ ব্যাপারে অভিজ্ঞতা আছে। অতীতে তারা এমন করেছে। এখন কিছুই যেহেতু করতে পারছে না, তাই নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিতে, তারা যে নিঃশেষ হয়ে যায়নি, তা দেখাতে এক বা একাধিক মাথাগরম নেতা এমন হঠকারিতা করলেও করতে পারে।

বিএনপিতে এখন চেইন অফ কমান্ডের ঘাটতি আছে। দিন কয়েক আগে এক মানববন্ধন কর্মসূচিতে বিএনপির মধ্যম সারির কয়েক নেতাকে চরম উস্কানিমূলক বক্তৃতা করতে শোনা গেছে। তবে সব পক্ষকেই তথ্যপ্রমাণ দিয়ে কথা বলা উচিত। উস্কানি পরিহার করে চলা উচিত। শুধু সন্দেহের বশে এমন কিছু করা উচিত নয় যার জন্য পরে পস্তাতে হয়। যারা ক্ষমতায় থাকেন ধৈর্য ও সংযম দেখাতে হয় তাদেরই বেশি। সতর্কতাও সরকার পক্ষের কাছেই বেশি কাম্য। কারণ মানুষের জানমাল রক্ষার দায়িত্ব মূলত সরকারেরই। দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কোনো অস্বাভাবিক আচরণ প্রত্যাশিত নয়! সবারই শুভবুদ্ধির উদয় হোক।

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক।