দুই ব্যবসায়ী গ্রেফতারের প্রতিবাদে যশোরে সব ফার্মেসি সারাদিন বন্ধ

বিল্লাল হোসেন : দুই ফার্মেসি মালিককে আটকের ঘটনায় রোববার সারাদিন যশোর শহরের সকল ওষুধের দোকান বন্ধ ছিল।  আটককৃতদের মুক্তির দাবিতে  ব্যবসায়ীরা ধর্মঘট পালনছাড়াও জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেয়।  ওষুধের প্রয়োজনে রোগী ও স্বজনদের দিকবিদিক ছুঁটতে দেখা গেছে। ওষুধের অভাবে কয়েক রোগীর অপারেশন হয়নি।

পুলিশের দাবি, নকল ওষুধসহ কাশিমপুর সার্জিক্যাল এন্ড মেডিসিন হাউজের মালিক সদর উপজেলার কাশিমপুর গ্রামের আব্দুল জলিল সরদারের ছেলে ইব্রাহিম সরদার ও জমজম ড্রাগ হাউজের মালিক চৌগাছা উপজেলার আন্দারকোটা গ্রামের নুরুল আলমের ছেলে জহির আহম্মেদ সুইটকে হাতেনাতে আটক করা হয়। সদর ফাঁড়ির এস আই শরিফুল ইসলাম বাদি হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলাও করেছেন।  অবশ্য মামলায় ৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। বাকি দুইজন আাসামি অজ্ঞাত।

মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২১ নভেম্বর (শনিবার) অভিযান চালিয়ে জেলরোডের কাশিমপুর সার্জিক্যাল অ্যান্ড মেডিসিন হাউজ থেকে ১৪৩ পিস নকল মনটেয়ার-১০ ট্যাবলেট ও  মাইকপট্টি এলাকার জমজম ড্রাগ হাউজ থেকে ১০টি মনটেয়ার-১০ ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। তারা দীর্ঘদিন ধরে নকল ওষুধ বিক্রি করে আসছিলেন। ক্রেতা সেজে নকল ওষুধ ব্যবসায়ীদের আটক করে পুলিশ। আব্দুল জলিলের দেয়া তথ্য অনুযায়ী জমজম ড্রাগ হাউজে অভিযান চালিয়ে নকল ওষুধ উদ্ধার করা হয়। ট্যাবলেটের বক্সে মন্টিলোকাস্টের স্থলে মন্টিউকাস্ট লেখা। আসল ওষুধের পাতাগুলোতে হালকা রংয়ের স্পষ্ট  অক্ষরে নাম লেখা । আর জব্দকৃত নকল ওষুধের পাতায় গাড় রংয়ের অস্পস্ট অক্ষরে নাম লেখা ছিলো।

বাংলাদেশ কেমিস্টস এন্ড ড্রাগিস্ট সমিতির যশোর শাখার সভাপতি আব্দুস শহীদ চাকলাদার পান্নু জানান, নির্বাহী ম্যাজিস্টেট ও ওষুধ প্রশাসনের কোনো প্রতিনিধি ছাড়াই পুলিশ খামখেয়ালীভাবে অভিযান চালিয়ে দুইজন ব্যবসায়ীকে আটক করে নিয়ে যায়। পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়া পুলিশ কিভাবে নিশ্চিত হলো জব্দকৃত ওষুধগুলো আসল কি নকল। এটা ওষুধ ব্যবসায়ীদের উপর পুলিশের এক ধরণের অত্যাচার ছাড়া আর কিছু না। আব্দুস শহীদ চাকলাদার পান্নু আরো জানান, এ ঘটনার প্রতিবাদে রোববার সকাল থেকেই ধর্মঘট শুরু করেন ওষুধ ব্যবসায়ীরা। জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপিও প্রদান করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক বিষয়টি তদন্তপূর্বক সঠিক সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। যে কারণে বিকেল ৪ টার পর ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়েছে। সঠিক সমাধান না হলে আরো কঠোর কমসূচিতে নামবেন ব্যবসায়ীরা।

কেমিস্টস এন্ড ড্রাগিস্ট সমিতির যশোর শাখার সিনিয়র সহসভাপতি আব্দুল হামিদ চাকলাদার ইদুল জানান, কোনও ফার্মেসিতে যদি নকল ও ভেজাল ওষুধ থাকে, তবে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। তার মানে এই না পুলিশ অভিযানের নামে যা ইচ্ছা তাই করবে। কাশিমপুর ও জমজম ফার্মেসী সুনামের সাথে চলে আসছে। অথচ পুলিশ দুই ব্যবসায়ীকে নকল ওষুধের ব্যবসায়ী হিসেবে আখ্যায়িত করলো। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা অথবা ওষুধ প্রশাসনের কর্মকর্তারা ছাড়া পুলিশ এভাবে অভিযান চালাতে পারেনা। পুলিশের এ অভিযান ও মামলার তীব্র নিন্দা জানান তিনি। এদিকে ওষুধের দোকান ঘন্টার পর ঘন্টা বন্ধ থাকায় রোগী ও স্বজনদের মারাত্মক দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। অনেক রোগী হাসপাতালে ছটফট করলেও ওষুধের অভাবে চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত হয়েছেন। চৌগাছা উপজেলার জামুলতা গ্রামের মঞ্জুরা খাতুন জানান, ‘আমার মেয়ে বুশরাত (১১) শারীরিক যন্ত্রণায় ছটফট করছেন।  যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অপারেশনের প্রয়োজন। অপারেশনের জন্য ওষুধের লিস্ট দেয়া হয়েছে। কিন্তু দোকান খোলা না থাকায় ওষুধ কিনতে পারিনি।’

যশোর সদর উপজেলার দেয়াড়া ইউনিয়নের ফরিদপুর গ্রামের মামুন জানান, তার বোন শিরিনের চিকিৎসার জন্য ওষুধ কিনেত এসে দেখতে পায় সব দোকান বন্ধ।  শহরের বারান্দীপাড়ার ফাতিমা ইয়াসমিন জানান,  তার মা রোকেয়া বেগম জরায়ুর সমস্যার ভুগছেন। একটি প্রাইভেট হাসপাতালে তার অপারেশন করার জন্য টেবিলে নেয়া হয়েছে। ওষুধ কিনতে এসে দেখতে পায় সব দোকান বন্ধ। ১টি মাত্র দোকান খোলা থাকলেও সেখানে দীর্ঘ ভিড়। যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জানান,  কাশিমপুর ও জমজম ফার্মেসীতে অভিযান পরিচালনার সময় ইনসেপ্টা কোম্পানির একজন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। ওই প্রতিনিধি উদ্ধারকৃত ওষুধ  ইনসেপ্টা কোম্পানির না বলে তিনি নিশ্চিত করেন। অথচ জব্দকৃ ওষুধ ইনসেপ্টা কোম্পানির বলে ব্যবসায়ীরা দাবি করছিলেন। নকল ওষুধ উদ্ধারের পর ওই দুই ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়। পুলিশ আইনের গতিতে কাজ করেছে। এতে ধর্মঘট করা মানে নকল ওষুধ ব্যবসায়ীদের উৎসাহ দেয়া। যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ তমিজুল ইসলাম খান জানিয়েেেছন, বাংলাদেশ কেমিস্টস এন্ড ড্রাগিস্ট সমিতির যশোর শাখার নেতৃবৃন্দ একটি স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন। ফার্মেসীতে বেআইনী অভিযান এবং মালিকদের গ্রেফতার ও হেনস্তার দাবি করা হয়েছে স্মারকলিপিতে। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।