‘পৃথিবী যতদিন, মারাদোনা ততদিন’

ক্রীড়া প্রতিবেদক: বিষাদে নীল ফুটবল বিশ্ব। শোকে কাতর ফুটবলপ্রেমীরা। দিয়েগো মারাদোনার মৃত্যুতে প্রিয়হারা বেদনার ঢেউ আছড়ে পড়েছে বাংলাদেশের ফুটবল অঙ্গনেও। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে আলাপচারিতায় সাবেক তারকা ফুটবলাররা করলেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তির স্মৃতিচারণ।

গোলাম সারোয়ার টিপু, হাসানুজ্জামান বাবলু, শেখ মোহাম্মদ আসলাম, সালাম মুর্শেদী সামনে আনলেন জমে থাকা স্মৃতি। কেউ মারাদোনাকে পরিয়ে দিলেন ‘রাজার মুকুট’, কারো চোখে তিনি ‘চিরস্মরণীয়’, কেউ বললেন, ‘ফুটবলের নিখাদ শিল্পী’। তার চলে যাওয়া কারো কাছে ‘অপূরণীয় ক্ষতি’।

হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে গত বুধবার ৬০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন মারাদোনা। প্রায় একক প্রচেষ্টায় আর্জেন্টিনাকে ১৯৮৬ বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিলেন তিনি। তার হাত ধরেই নাপোলি মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল সেরি আয়; জিতেছিল শিরোপা। মাঠের বাইরে কোকেন, মাদকে আসক্তি, সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে গুলি ছোঁড়া, পিছিয়ে থাকা মানুষের প্রতি তার সহমর্মিতা, রাজনৈতিক দর্শন-সব কিছু মিলিয়ে তিনি ছিলেন বর্ণিল এক চরিত্র।

‘তিনি শিল্পী’

মারাদোনার জাদুর ঢেউ আর্জেন্টিনা ছাপিয়ে কীভাবে এই ভূখন্ডে আছড়ে পড়েছিল, কিশোর সমাজকে জাগিয়ে তুলেছিল এক লহমায়, জাতীয় দলের সাবেক তারকা মিডফিল্ডার টিপুর মানসচোখে ভেসে উঠছে তার সবটুকু।

“একজন দর্শক হিসেবে বলব, একেকজন আসেৃসাংস্কৃতিক অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করে। আশির দশকে সে বিরাট একটা জনগোষ্ঠীকে ফুটবলের প্রতি আকৃষ্ঠ করেছে। কাল থেকে আমি একটা চিন্তা করছিলাম, আমার বাসার পরিস্থিতি দেখছি, আমার দুইটা মেয়ে, তারপর ছেলে..তাদের যেভাবে সে উদ্বুদ্ধ করেছে, সেটা অসাধারণ।”

“বিশাল একটা কিশোর জনগোষ্ঠীকে সে ফুটবলের প্রতি টেনেছে…এই কিশোরদের অনেকের খেলাধুলার প্রতিই হয়ত কোনো আকর্ষণ ছিল নাৃসে তাদেরকে ফুটবলের দিকে নিয়ে এসেছে। সে একজন শিল্পী। নানা রকমের পায়ের কাজ দিয়ে সে ফুটবলকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।”

মাদক তার নিত্য সখা হয়ে উঠেছিল। ফুটবলার মারাদোনার ক্ষয়ে যাওয়ার সেই শুরু। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ডোপ পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়ে মাঝপথে থেমে যায় আন্তর্জাতিক আঙিনায় তার পথচলা। কিন্তু মাদক তার পিছু ছাড়েনি। তবে এই বিষাদের ক্ষণে ওসব নিয়ে যেন ভাবতেই চান না টিপু। স্পষ্টভাষী, নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠ হয়ে ওঠা মারাদোনাকেই মনে রাখতে চান তিনি।

“ব্যক্তি মারাদোনাকে নিয়ে আমি তেমন কিছু বলতে চাই না। শুধু বলতে চাই, সে যেটা বলতে চাইত, সোজাসাপ্টা বলত। ইংল্যান্ড যখন ফকল্যান্ড আক্রমণ করল, ওই প্রেক্ষাপটে আমি যতদূর জানি, সে কখনও ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করত না। তার মধ্যে কোনো ভ-ামি ছিল না। তার একটা রাজনৈতিক বিশ্বাস ছিল, সেটা প্রকাশ করতে কুণ্ঠাবোধ করত না। একটা কাকতালীয় ব্যাপার, ২৫ নভে¤॥^র ফিদেল কাস্ত্রোর মৃত্যু হয়েছিল, একই দিনে সে চলে গেলৃকাস্ত্রো তাকে চিকিৎসা করিয়েছিলেন। তার তুলনা সে-ই। তার সম্পর্কে পেলে বলেছে-ওপারে গিয়ে একসঙ্গে ফুটবল খেলব। এরচেয়ে সুন্দর মন্তব্য আর কী হতে পারে?”

“৯৪-এ যখন ড্রাগ টেস্টে আবার ধরা পড়ল। তখন তো তার সমালোচনার কথা ছিল মানুষের। কিন্তু মানুষের প্রতিক্রিয়া হলো উল্টো। আমাকে অনেকে প্রশ্ন করেছে-টিপু ভাই, এটা কি অন্যরকম কিছু কিনাৃতার ড্রাগ নেওয়া নিয়ে মানুষের উল্টো সন্দেহ তৈরি হয়েছে! এগুলো তার স্বার্থকতা। সে নিজে গরীব ঘরের ছেলে, কিন্তু সে তা ভোলেনি। গরীবের কষ্ট সে ভোলেনি। যতদিন ফুটবল থাকবে, তার নাম উচ্চারণ করতেই হবে।”

‘পৃথিবী যতদিন মারাদোনা ততদিন’

জাতীয় দলের সাবেক তারকা মিডফিল্ডার বাবলুকে জেঁকে ধরেছে দুই শোক। ক’দিন আগে হারিয়েছেন দীর্ঘদিনের সতীর্থ বাদল রায়কে। এবার চলে গেলেন মারাদোনা। বাবলুর আক্ষেপ, মারাদোনা যদি আরেকটু সতর্ক হতেন, জীবন নিয়ে ছিনিমিনি না খেলতেন, তাহলে হয়ত আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতে পারতেন।

“এই মুহূর্তে আসলে কোনো কিছু নিয়ে কথা বলার মতো মানসিকতাই আমার নাই। বাদল চলে গেছে। বয়সের তিন বছরের ব্যবধান থাকলেও বাদল আমার সতীর্থ-বন্ধু। এরপর গতকাল মারাদোনাও চলে গেল। বলার অপেক্ষা রাখে না, পৃথিবীতে ফুটবল যতদিন থাকবে, ততদিন মারাদোনা থাকবে। শতাব্দীতে এমন খেলোয়াড় দু-একজন আসে। যারা আসে, তারা শতাব্দী থেকে শতাব্দী পর্যন্ত আলো ছড়িয়ে যায়। বলতে গেলে আমাদের দেশের মানুষ আর্জেন্টিনাকে ওভাবে জানতই না। মারাদোনার মাধ্যমে আর্জেন্টিনা সারা বিশ্বে এবং বাংলাদেশের পরিচিত হয়েছিল। আমাদের দেশে আর্জেন্টিনার যে এত সমর্থক, তার কারণ মারাদোনা।”

“সে এক কথায় ঐশ্বরিক প্রতিভা। সৃষ্টিকর্তা সবার ভেতরেই প্রতিভা দেন। কিন্তু এদের মধ্যে এমনভাবে ঢেলে দিয়েছিলেনৃসর্বকালের সেরা হিসেবে পৃথিবীতে তাদের আবির্ভাব ঘটেছিল। এত অল্প বয়সে সে চলে যাবে, বিশ্ব ফুটবলের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। এত অল্প বয়সে চলে যাওয়ার কারণে মারাদোনা নিজেও অনেকাংশে দায়ী। সে ঈশ্বর প্রদত্ত প্রতিভা, সহজাত প্রতিভা, সে যদি আরেকটু সংযত, সতর্ক হত, তাহলে তিনি হয়ত আমাদের মাঝে আরও অনেক দিন থাকত।”

‘মারাদোনা একটা প্রতিষ্ঠান’

বুয়েন্স আইরেসের দরিদ্র পরিবারে জন্ম। এরপর এক বাঁ পায়ের জাদুতেই ফুটবলপ্রেমীদের মণিকোঠায় চিরদিনের জন্য স্থায়ী আসন পেতে বসা মারাদোনাকে নিয়ে আসলামের মুগ্ধতার শেষ নেই। আবাহনী ও মোহামেডানের এই সাবেক তারকা স্ট্রাইকার আর্জেন্টাইন কিংবদন্তিকে একটি প্রতিষ্ঠান বলে মনে করেন।

“সে একটা প্রতিষ্ঠান। জন্ম দরিদ্র পরিবারে এবং সেই দারিদ্রতাই তাকে মারাদোনা হতে সাহায্য করেছে, সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসা অর্জন করতে সাহায্য করেছে। মানুষের মনের মণিকোঠায় সে জায়গা করে নিয়েছে। আমি বলব, এটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। সবাই আর্জেন্টিনা বলতে মারাদোনাকেই বোঝে। যতদিন পৃথিবী থাকবে, তাকে মনে না রাখার কোনো কারণই নেই। সবাই তাকে খুব শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।”

“সে বাঁ পায়ে খেলত। এক পায়ে খেলেই সারা বিশ্বকে টালমাটাল করে দেওয়া একজন মাত্র মানুষ মারাদোনা। সে যদি কখনও ডান পায়ে বলটা রিসিভও করত, তাহলে দেখা যাচ্ছে হুট করেই ডান পা থেকে বলটা বাঁ পায়ে নিয়ে আসত। বল পায়ে, বল ছাড়া এত সবলীল খেলোয়াড় ছিল, তার মতো আর কেউ আসবে কিনা আমার সন্দেহ আছে। বিশ্ব ফুটবলকে আরও চমকপ্রদ করার জন্য মারাদোনার প্রচেষ্টা আমরা আজীবন স্মরণ করব।”

‘আক্ষেপ থেকে গেল’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে ব্রাজিলের তারকা গোলরক্ষক জুলিও সিজারকে এনেছিল বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন। শোনা গিয়েছিল মারাদোনাকে নিয়ে আসার কথাও। কিন্তু আর্জেন্টাইন গ্রট পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যাওয়ায় আক্ষেপে পুড়ছেন ১৯৮২ সালের লিগে রেকর্ড ২৭ গোল করা সালাম।

“গত রাত ছিল ফটবলের জন্য কালোরাত। ফুটবলের জন্য সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদের রাত। ফুটবলের যিনি রাজা, তিনি রাজত্ব ছেড়ে যে এত দ্রুত চলে যাবেন, এই বয়সে সারা পৃথিবীকে দুঃখে ভাসিয়ে চলে যাবেন, এটা কেউ ভাবতে পারিনি। তিনি অসাধারণ খেলোয়াড়। আর্জেন্টিনার হয়ে যখন খেলেছে…একক প্রচেষ্টায় তিনি কেবল দেশকে ১৯৮৬ বিশ্বকাপের শিরোপাই এনে দেননি, গড়পড়তা একটা দল নিয়েও পরেরবার ফাইনালে উঠেছেন। সেটা সম্ভব হয়েছিল তার নেতৃত্ব এবং ফুটবলের প্রতি নিবেদনের কারণে।”

“তার তো অনেক দেখার মতো গোল আছে। কিন্তু আমার চোখে সবচেয়ে বেশি লেগে আছে ৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করা দ্বিতীয় গোলটি। সে গোল করতে পারত, করাতেও ছিল দারুণ পারদর্শী। অনেক খেলোয়াড় ক্লাবে ভালো করে, কিন্তু জাতীয় দলে ভালো করে না। কিন্তু মারাদোনা ছিল অন্যরকম। সে ক্লাব, জাতীয় দল সব জায়গাতেই সফল। তার নেতৃত্ব ছিল অসাধারণ।”

“আমাদের খুব শখ ছিল, পরিকল্পনা ছিল মুজিব শতবর্ষে তাকে আনারৃএর আগে আমরা ব্রাজিলের গোলরক্ষক জুলিও সিজারকে এনেছিলামৃ.করোনাভাইরাসের কারণে বিঘ্ণ না ঘটলে সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চলতৃআমরাও হয়ত তাকে আনতে পারতাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য সেটা হলো না। এই আক্ষেপটুকু থেকে গেল।”