আলমডাঙ্গায় সবুর হত্যাকাণ্ড  আদালতে  স্বীকারোক্তি দিলেন বোমারু জামাল

আলমডাঙ্গা অফিস: আলমডাঙ্গার হারদী গ্রামের পান ব্যবসায়ী আব্দুস সবুর (৩৭) হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবাবন্দি দিয়েছেন হারদী গ্রামের জামাল হোসেন ওরফে বোমারু জামাল ওরফে শুটার জামাল (৩৭)। শুধুমাত্র বেতনের পাওনা টাকা পরিশোধের প্রতিশ্র“তি পেয়ে গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে। শুক্রবার রাতে  পুলিশ জামাল ও একই গ্রামের কাবের আলীকে (৪০) আটক করে।  আটকের পর রোববার তাদেরকে আদালতে হাজির করা হয়। ইতোপূর্বে ২৩ নভেম্বর এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে নিহতের চাচা শ্বশুর ও পারিবারিক ভ্যানচালক কিরণকে আটক করে পুলিশ। পরে তাদের স্বীকারোক্তি মোতাবেক জামাল ও কাবের আলীকে আটক করা হয়।

আব্দুস সবুরের স্ত্রী সালমা খাতুন জানান, আব্দুস সবুর যে রুমে রাত কাটাতেন তার পাশের রুমে সন্তানসহ তিনি (স্ত্রী) থাকতেন। বন্ধুদের সাথে আড্ডা শেষে আব্দুস সবুর সাধারণত রাত ১টা / দেড়টার দিকে বাড়ি ফিরতেন।  ২১ জুন রাত ১০টার দিকে আব্দুস সবুর বাড়ি থেকে খেয়ে তার কাছ থেকে ১ শ টাকা চেয়ে নিয়ে বাইরে যায়। কখন ফিরে এসেছিলেন তা তিনি জানতে পারেননি। ভোর ৩টার দিকে একটা শব্দ শুনে তার ঘুম ভেঙে যায়। সে সময় তিনি নিজের রুম থেকে বের হয়ে স্বামীর ( আব্দুস সবুরের) রুমে যেতে চেষ্টা করেও পারেননি। কেউ বাইরে থেকে তার রুমের দরজার শেকল আগে থেকে আটকে দিয়েছিল। সে সময় তার চিৎকারে প্রতিবেশিরা ছুটে গিয়ে তার রুমের শেকল খুলে দেয়। তিনি রুম থেকে বের হয়ে দেখেন স্বামীর রুমের দরজা খোলা। ভেতরে খাটে শুয়ে থাকা অবস্থায় স্বামী আব্দুস সবুরের গুলিবিদ্ধ লাশ দেখতে পান। হাসপাতালের ময়নাতদন্তে  আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাক্তার শামীম কবীর জানান, শর্টগান অথবা ওয়ান শুটার গানের গুলিতে আব্দুস সবুরের মৃত্যু হয়েছে। তার মস্তিষ্কের ভেতরে শর্টগান বা ওয়ান শুটার গানের গুলির ৩৬টি স্পিন্ডার পাওয়া গেছে।

এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে ওই সময় আলমডাঙ্গা থানায় অজ্ঞাত আসামিদের নামে এজাহার দায়ের করেন। তবে পুলিশ ঘটনার দিনে আব্দুস সবুরের বন্ধু হারদী গ্রামের মৃত কালু মন্ডলের ছেলে মনির ও একই গ্রামের মৃত কলিম উদ্দীনের ছেলে আতিয়ারকে আটক করে।

পুলিশ নিহত সবুরের মোবাইলের কললিস্ট ও পারিবারিক অশান্তির সূত্র ধরে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মাসুদুর রহমান তদন্তে নামে। সবুর হত্যাকাণ্ডের ১০/১২দিন আগে পল্লীবিদ্যুত সমিতির আলমডাঙ্গা অফিসের কর্মরত তার স্ত্রী সালমা খাতুরকে মারপিট করে। তদন্তে বিষয়টি সামনে নেয় তদন্তকারী কর্মকর্তা।

২৩ নভেম্বর রাতে পুলিশ এ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত সন্দেহে সবুরের চাচা শ্বমুর মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলার কুমারীডাঙ্গা গ্রামের মৃত জহির উদ্দীনের ছেলে শফি উদ্দীনকে (৫০) আটক করে। একই রাতে নিহতের পরিবারিক ভ্যান চালক হারদী গ্রামের রিকন শেখের ছেলে কিরণ শেখকে (২১) আটক করেছে। তারা এ হত্যাকাণ্ডের সাথে নিজেদের জড়িত থাকার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। তাদের স্বীকারোক্তি মোতাবেক ২৭ নভেম্বর রাতে পুলিশ পরিদর্শক তদন্ত মাসুদুর রহমানের নেতৃত্বে একদল পুলিশ হারদী গ্রামের কাতব আলীর ছেলে জামাল হোসেন ওরফে বোমা জামাল ওরফে শুটার জামালকে তার মামাবাড়ি আলমডাঙ্গার গোবিন্দপুর থেকে আটক। একই রাতে হারদী গ্রামের মেছের আলীর ছেলে ডাকাত কাবেরকে আটক করে।

রোববার আদালতে হাজির করা হলে জামাল হোসেন নিজেকে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে তদন্তকারী কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

একাধিকসূত্রে জানা যায়, সবুর হত্যাকাণ্ডের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত জামাল হোসেন ওরফে বোমা জামাল ওরফে শুটার জামাল ও ডাকাত কাবের দুজনই নিহত সবুরের ঘনিষ্ঠজন। তারা তিনজন এক সময় আন্ডার ওয়াল্ডের নটরাজ হারদী গ্রামের সন্ত্রাসী আরিফের সহযোগী ছিলেন। বোমাঘাতে আরিফ নিহত হওয়ার পর সবুর পান ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসার কর্মচারী হিসেবে রাখেন পুরনো বন্ধু বোমারু জামাল ও ডাকাত কাবের আলীকে। মাদকসেবী সবুর নেশার জন্য ব্যবসার পূজি, স্ত্রীর বেতনের সমুদয় টাকা খরচ করে ফেলায় সংসারে অশান্তি সৃষ্টি হয়। এমনকি দোকানের কর্মচারী জামাল ও কাবের আলীর কয়েক মাসের বেতন বকেয়া পড়ে যায়।

পুলি জানায় নিহত হওয়ার ১০/১২ দিন আগে সবুর স্ত্রীকে পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠায়। এরপর সবুর হত্যার  চুড়ান্ত নকশা তৈরি হয়। হত্যার জন্য সবুরের চাচা শ্বশুর শফি উদ্দীন আগ্নেয়াস্ত্র সরবরাহ করেন। সবুরের পারিবারিক পাখিভ্যান চালক কিরণ গিয়ে চাচা শ্বশুরের বাড়ি থেকে কাঠালভর্তি দুটি বস্তা নিয়ে সবুরের বাড়িতে যায়। একটি বস্তায় আগ্নেয়াস্ত্র একটি ওয়ান শুটারগান লুকিয়ে নিয়ে আসা হয়। আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে আসার জন্য ওই দিন হত্যার নেপথ্য অবস্থানকারী পাখিভ্যান চালক কিরণকে অসংখ্য বার রিং দেন। ঘটনার রাতে জামাল, কাবের, কিরণসহ ১০/১২ জন যুবক সবুর আলীকে কৌশলে রাত ১০টা সাড়ে ১০টার দিকে মাঠে নিয়ে যায়। তাকে উপর্যুপরি মাদ পান করায়। এক পর্যায়ে সবুর সম্পূর্ণ অজ্ঞান হয়ে পড়েন। অজ্ঞান অবস্থায় ঘাড়ে করে তাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। পথের ভেতর অজ্ঞান অবস্থায় বমি করেন। পরে নিজের ঘরের বেডে শুইয়ে রাখা হয়। সে সময় সবুর ছিল মৃতপ্রায়। ঘাতকদের ধারণা ছিল –  এমনিতে সবুরের অবস্থা এতটাই শোচনীয় ছিল যে তিনি মারা যেতেন। কিন্তু ঘাতকরা কোনো রিস্ক নিতে চায়নি। তাই মাথায় নল ঠেকিয়ে ঠান্ডা মাথায় তাকে খুন করে। কাবের নিজে শুট করে। ঘাতকরা চলে যাওয়ার আগে সবুরের স্ত্রীর রুমের দরজার শেকল  বাইরে থেকে তুলে দেন। আলমডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ আলমগীর হোসেন জানান, জামাল, কাবের ও কিরণ নিহত সবুরের নিকট কয়েক মাস বেতন পেতেন। শুধুমাত্র বকেয়া বেতন পরিশোধের প্রতিশ্র“তি পেয়ে ঘাতকরা এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়। তবে কে প্রতিশ্র“তি দিয়েছিল সে সম্পর্কে মুখ খোলেন নি।