ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর , ২০২১ ● ১২ আশ্বিন ১৪২৮

ডেল্টার ভয়াবহতা এবং করণীয়

Published : Sunday 18-July-2021 22:21:41 pm
এখন সময়: মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর , ২০২১ ০৪:৪৮:০১ am

অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল কবীর জাহিদ:

এই লেখাটি যখন লিখছি তখন নিজে প্রতিদিন কাজের জন্য করোনা ওয়ার্ডে যাতায়াত করি এবং ডেল্টা ধরণ কতটা খারাপ তার নমুনা নিজের চোখে দেখি। আবার একই সময় দেখি কত অবহেলায় মানুষ ডেল্টাকে নিয়ে ভাবছে। গ্রামের মানুষের ধারণা এটি তেমন কোনো সমস্যা না। আসল বিষয় হলো সবার জন্য একই না। আমার এক সহকর্মী খুব মজা করে বলেছিলেন, “করোনা সবাইকে মেরে ফেলার চেষ্টা করে। কারও ক্ষেত্রে সে সফল হয় আর কোনো ক্ষেত্রে মানুষ সফল হয়।’’ এই ক্ষমতাটা ডেল্টার ক্ষেত্রে একটু বেশিই বলা যায়।

ডেল্টার উপসর্গ কি ভিন্ন্?

গ্রামের বাড়িতে চুরি হওয়া বেশি সহজ হয় যদি সিঁধ কেটে কেউ চুরি করে। ডেল্টার উপসর্গ অনেকটা তাই। ডেল্টার যে ধরণের জন্য গ্রামের মানুষ সহজেই ভুল করছে তা হলো, অন্য করোনা থেকে ভিন্ন উপসর্গ। দীর্ঘদিন গণমাধ্যমে বা অন্যান্য মাধ্যমে আমরা ধারণা দিয়েছি যে, জ্বর, গলাব্যাথা, শুষ্ক কাশি, গন্ধ না পাওয়া করোনার প্রধান উপসর্গ। কিন্তু ডেল্টাতে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। এ ক্ষেত্রে মাথাব্যাথা প্রধান উপসর্গ। তারপর জ্বর কিছুটা কম। সর্দি থাকে। ফলে সহজেই মানুষ বিভ্রান্ত হয়। এই ধরণে গন্ধ না পাওয়ার সম্ভবনা কম। ফলে এটিকে সাধারণ জ্বর ও সর্দিই মনে করছে মানুষ। গ্রামে যত সময় শ্বাসকষ্ট না হচ্ছে, তত সময় কাউকে বলতেও চাই না বা চিকিৎসা করাতে চায় না। চুপিচুপি আসে, তারপর ফুসফুসে বাসা বাধে। এখানেই সমস্যাটা হচ্ছে।

কেন ফুসফুসকেই বেশি আক্রান্ত করে?

সাধারণ মানুষের জন্য করোনার মিউটেশনের সংখ্যা বা ভয়াবহতা বুঝানো বেশ কঠিন। ডেল্টার প্রায় ২৩-এর অধিক মিউটেশন আছে। কিন্তু চার থেকে পাঁচটি বেশি ভয়ঙ্কর। করোনার যে নাম যার কারণে ক্রাউন, সেই স্পাইক প্রোটিনটাই এখন প্রধান খেলার হাতিয়ার এই ভাইরাসের। করোনা তার প্রধান ছলাকলাটা কিন্তু দেখাচ্ছে এ প্রোটিনটা দিয়েই। ওই স্থানে মিউটেশন করে সে চেহারা পাল্টিয়ে ফেলে। বৈজ্ঞানিক ভাষায় তিনটি বিশেষ মিউটেশন যাকে বলে এল৪৫২আর, পি৬১৪আর এবং টি৪৭৮কে জন্য এই ধরনটি খুব ভালোভাবে নাকের বিশেষ জায়গায় আংটার মত আটকিয়ে যায়। অন্য ধরণও আটকাতে পারত তবে ডেল্টার আটকানটা অনেকটা কাঁঠালের আঠার সাথে তুলনা করা যায়। মানে হলো সে বেশি আটকাবেই। একই ধরণের আটকানোর জিনিস থাকে ফুসফুসে। যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন এসিই২ রিসিপ্টর। এই দুষ্টু জায়গাটার জন্য এত যন্ত্রণা। ফুসফুসে বেশি আটকায় তাই নয়, ওখানে সে বহাল তবিয়তে অন্য ধরণের চেয়ে বেশি বেশি সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারে। ফলে ফুসফুস হচ্ছে ডেল্টা ধরণের জন্য একটি ভালো বসবাসের স্থান। তাই, যা হওয়ার তাই হচ্ছে। হাসপাতালে আসা অনেক রোগীর ৩০-৫০ শতাংশ ফুসফুস আক্রান্ত থাকছে। তখনি চিন্তার বিষয়।

ডেল্টা কি সর্বোচ্চ সংক্রামক?

উত্তরটা বলা কঠিন আবার কঠিন না। যদি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট দেখি, তাহলে দেখব আগের কোনটিই গ্রামে তেমন যেতে পারেনি। কিন্তু ডেল্টা গ্রামে গিয়ে তার সকল ক্ষমতা দেখানো প্রায় শেষের পথে। কি বলছেন বিজ্ঞানীরা? এ যাবৎকালের সবচেয়ে ছোঁয়াচে ধরণ এটি। কিভাবে? বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন এটি আলফা বা আমরা যাকে আগে ইউকে বলতাম তার চেয়ে ৬০ শতাংশ ছোঁয়াচে। আলফা নিজেই ছিল মূল চায়নিজ আসল উহানের তুলনায় ৫০ গুণ ছোঁয়াচে। সুতরাং চায়নার আসল ভাইরাসের তুলনায় ডেল্টা বা ভারতীয় ধরণ কতটা সংক্রামক বা ছোঁয়াচে চিন্তা করে দেখুন। এই কারণেই সে বিশ্বের ৯০টির বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের গ্রামেও ছড়িয়ে গেছে। এ ছাড়াও ফিউরিন ক্লিভেজ সাইট বলে একটা জায়গা আছে সেটিও আবশ্য সেই বিখ্যাত স্পাইক বা কাঁটায়। ডেল্টার ওই স্থানে একটি মিউটেশনের জন্য বেশি বেশি সংক্রমণের ক্ষমতা বেশি। আমার মনে হয় এ জন্য কম ডেল্টা ভাইরাস থাকলেও রোগ সৃষ্টি হচ্ছে। তাই বিখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেটের তথ্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ডেল্টা গ্রামের খোলা স্থানেও ছড়াচ্ছে । ল্যানসেটে বলা হয়েছিল যে, খোলা স্থানে করোনা কম হবে। প্রকৃত বাস্তবতা হলো-ভ্যাকসিন ও মাস্ক। সেই প্রসঙ্গে পরে আসব। কোনো বাক্তি উহান ধরণ দিয়ে আক্রান্ত হলে, আশপাশে কোনো প্রতিরোধ ব্যাবস্থা না নিলে কমপক্ষে দুই জনকে আক্রান্ত করে। সেখানে আলফা আক্রান্ত করে চার জনকে।  কিন্তু ডেল্টা আক্রান্ত করে কিছু বিজ্ঞানী বলছেন ছয় জন, কেউ বলছেন আট জন পর্যন্ত। এই কারণে গ্রামে কম মাস্ক ব্যবহার ও ভ্যাকসিন নেয়ার পরিমাণ কম বলে বেশি ছড়িয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রেও কম ভ্যাকসিন নেয়া এলাকায় ডেল্টা বেশি ছড়িয়েছে। 

ডেল্টায় মৃত্যুহার বেশি কেন?

আমরা সকলেই গণমাধ্যমের কল্যাণে এবং যারা সরাসরি রোগীদের সাথে সংশ্লিষ্ট তারা দেখছেন যে, এই ধরনটিতে মৃত্যুহার বেশি। সাম্প্রতিক যুক্তরাজ্য ও স্কটল্যান্ডের দুইটি গবেষণাতে প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, ডেল্টা ধরণে হাসপাতালে যাওয়ার হার আলফা বা ইউকে ধরণের তুলনায় আড়াই গুণ বেশি। যে সকল দেশে পর্যাপ্ত সামগ্রী আছে হাসপাতালে বা উন্নত ধরণের চিকিৎসা ব্যাবস্থা সেখানেই যদি আড়াই গুণ হয়, তাহলে আমদের দেশে কত হওয়া উচিত? উন্নত দেশগুলোতে মৃত্যুহার পূর্বে যা ছিল ১ দশমিক ৯ ভাগ তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ২ ভাগ। সেখানে আমাদের আরও বেশি হবে নিশ্চই। যারা হাসপাতালে চিকিৎসা দিচ্ছেন তারা দেখেছেন, হাসপাতালে ভর্তিকৃত রোগীর বেশিরভাগের ফুসফুসের সংক্রমণ ও ক্ষতিগ্রস্ত হার বেশি। যদিও বাংলাদেশের এখন পর্যন্ত কোনো গবেষণা নাই এই বিষয়ে। বেশিরভাগের রোগীর ফুসফুসের সংক্রমণের কারণে অক্সিজেন লাগছে বেশি। গ্রামের মানুষ শ্বাসকষ্ট শুরু হলেই হাসপাতালে যায় এমন না। যখন যায় তখন এত বেশি সংক্রমণ হয়ে যায় যে অনেক ক্ষেত্রে আর বাঁচানো যায় না। এ ছাড়া গ্রামের মানুষ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গ্রাম্য চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা নেয়। কিন্তু অক্সিজেন স্যাচুরেশন না মাপতে পারলে কোনো কারণে অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৭৫-এর নিছে নামলে তখন রোগীকে বাঁচানো অনেক কঠিন। চিকিৎসকরা ৯০-এর নিচে আসলেই হাসপাতালে আসতে বলেন। কিন্তু গ্রামের অনেক ক্ষেত্রে সেটা মাপা সম্ভব না হওয়ার কারণে জটিলতা হয়। এ ছাড়া অনেক দূর থেকে হাসপাতালে আসতেও সময় লাগে। এতেও কিছু সমস্যা হচ্ছে এবং রোগী মারা যাচ্ছে। এ ছাড়াও হাসপাতালগুলোর পক্ষে এত বিশাল অক্সিজেনের চাপ নেয়াও অনেক কঠিন হয়ে যাচ্ছে। যদিও আমরা সৌভাগ্যবান যে, এখনও এদেশে অক্সিজেন সংকটে পড়েনি। ফলে দেরি করে হাসপাতালে আসায় রোগী মারা যাচ্ছে।

উদ্বেগের ধরন কি?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি প্রথম উদ্বেগের ধরনের সংজ্ঞা দেয়। এখন পর্যন্ত সকল ধরনকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। আবার এই ভাগের একটিতে কেউ নাই। বাকি দুইটির যেটি বেশি ভয়াবহ তা হলো উদ্বেগের ধরন। অন্যটির নাম আগ্রহের ধরন। এই উদ্বেগের ধরনে আছে চার ভাই। নাম আলফা, বেটা, গামা ও ডেল্টা। যাদের আগের নাম ছিল যথাক্রমে ইউকে, সাউথ আফ্রিকা, ব্রাজিল ও ভারতীয়। চার ভাইয়ের মধ্যে দেখা গেল ডেল্টা ভাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। কি যোগ্যতা আছে তাদের? বেশি ছোঁয়াচে, বেশি বেশি হাসপাতালে পাঠায়, রোগের প্রকোপ বেশি, ভ্যাকসিন কাজ করে কম, প্লাজমা ট্রিটমেন্ট বা অ্যান্টিবডি দিয়ে কাজ করে কম, অনেক ক্ষেত্রে শনাক্ত হয় কম। এই চরিত্রগুলো যার সব চেয়ে বেশি সেটিই হল ডেল্টা। এই কারণে আমি না, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে এ যাবৎকালের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বলে আখ্যা দিয়েছে।

এর শেষ কোথায়?

এখন কিছুটা বিজ্ঞানীরা আশার বাণী শোনাচ্ছেন।  যেহেতু সবচেয়ে ভয়ঙ্করটির মোকাবিলা কমবেশি হয়ে গেছে এ জন্যে বিজ্ঞানীরা বলছেন এখন মহামারী হিসাবে কমে যাবে। যে দেশগুলো ৬০ থেকে ৭০ ভাগ মানুষ ভ্যাকসিন নিয়েছে সেখানে সমস্যা কম এমনকি ডেল্টা দিয়েও। যতগুলো ভয়ঙ্কর সম্ভাবনা ছিল সেটি নাকি কমে আসবে এমন ধারণা বিজ্ঞানীদের।

কি করণীয়?

বাংলাদেশ একটি ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের দেশ, সুতরাং দ্রুত ভ্যাকসিন প্রদান একমাত্র সমাধান। বর্তমানে এখানকার ৬৫ ভাগ মানুষের বয়স ১৫ থেকে ৬৪ মধ্যে। বাংলাদেশের এই অবস্থা থাকবে মাত্র ২০৪০ পর্যন্ত। তাই, তবে গণমাধ্যমে দেখলাম সামনে ৭ কোটি মত ভ্যাকসিন আসবে সুতরাং ৫০-৬০ ভাগ মানুষকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে পারলে সমস্যা সমাধান হবে। নইলে কর্মক্ষম এই বিপুল জনগোষ্ঠী এক সময় আমদের জন্য  বোঝা হয়ে যাবে। একই সাথে অন্য কোনো স্বাস্থ্যবিধি না মানলেও ন্যূনতম মাস্ক ব্যবহার সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা বড় প্রয়োজন। ফেসবুকে এক ব্যক্তির স্ট্যাটাস দেখে খুব মজা পেয়েছি। তিনি বলেছেন, “করোনা কতই বোকা মাস্ক পরে থাকলে সে মাস্কের নিচের দিক দিয়ে যেতে পারে না। সে কি সোজা ছাড়া চলতে পারে না। এই বোকার সাথেও মানুষ পারছে না কেন?”  কারণ মানুষ আরও বোকা ও অহংকারী। আমাকে কি দেখা যায় না যে নিয়ন্ত্রণ করবে? সেটা কি হয়? কিন্তু বাস্তবতা হল, মাস্ক পরলে নিচ দিক দিয়ে যেটুকু যাবে সেটুকু রোগ সৃষ্টির  জন্য যথেষ্ট না। 

লেখক

অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ এবং

সহযোগী পরিচালক, জিনোম সেন্টার

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়।