ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর , ২০২১ ● ১২ আশ্বিন ১৪২৮

হিজড়া

Published : Tuesday 20-July-2021 15:14:02 pm
এখন সময়: মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর , ২০২১ ০৫:১৩:২২ am

 গল্প
দুলারফিন তাপস : শহরের পাশে ছ্রোট বাজার। বাজার ঘিরে রয়েছে টিনের তৈরি বাড়ি। বাড়ির আশেপাশে তেমন কোন বসতি নেই। এই বাজারের পাশের বাড়িতে বসবাস করছে কিছু হিজড়া সম্প্রদায়ের বাসিন্দা। যাদের কাজ ছেলে-মেয়ে (শিশু) নাচানো। পোয়াতি মেয়েদের খোঁজ-খবর এরা অনেক আগে থেকেই রাখে। তাদের বাড়ির লোকজনদের কে ও এরা ভালভাবে চেনে,শুনে। নতুন হলে পরিচিত হয়ে নেয়। আগের থেকে শাড়ি-টাকার কথা বলে যায়। পরে এসে কিছু গান-বাজনা করে শিশু (ছেলে-মেয়ে) নাচিয়ে শাড়ি-টাকা পয়সা নিয়ে যায়। এতেই এদের আনন্দ। এভাবেই এরা জীবন/জীবিকা অতিবাহিত করে। এরা সাধারনত ৫/৬ জনের একটি দল করে ঘুরে বেড়াই। শারীরিক গঠনের ভিন্নতায় সমাজে এরা কিছুটা অবহেলিতো। রুপসী, লাইলা, ছন্দা,নুরি এরা সবাই এক সঙ্গে থাকে। লাইলা বাড়ির কাছের হল গেটম্যান কাদেরের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলে। মাঝে-মধ্যে ২/১ শো সিনেমা দেখে বিনে পয়সায়। মুখে সবসময় পানের খিলি থাকে। পান খেতে,খেতে দাঁত লাল হয়েগেছে, মুখে সবসময় দুর্গন্ধ। কাদের ও লাইলার সঙ্গে মাঝে-মধ্যে হলে যায়। লাইট অফ হওয়ার সঙ্গে,সঙ্গে কাদের লাইলার শরীরের সঙ্গে তার শরীর এলিয়ে দেয়। তারা মজা করে সিনেমা দেখে। শো শেষ হলে বাড়ি ফিরে যায়। কাদের মনে মনে ভাবে ক্যেন যে এই হিজড়াটার সঙ্গে পরিচয় হলো। একটা মেয়ে মানুষ হলে ভাল হতো। তারপর ও সে লাইলা কে খুব কাছের মনে করে। অনেকদিনের সখ্যতায় তাদের মাঝে অন্যরকম সর্ম্পক সৃষ্টি হয়েছে। একজন আরেক জনের সুখ-দু:খের সাথি। কাদেরের চোখ বেয়ে অজান্তে পানি গড়ে পড়ে। লাইলা যেখানে থাকে কাদের ও ঠিক তার পাশে বাসা ভাড়া করে থাকে।
রুপসী,লাইলা,ছন্দা,নুরি আজ যাবে শহর থেকে দূরে। সেখানে এক ধর্নাঢ্য পরিবারে অতি সম্প্রতি শিশু প্রসব করেছে। ছেলে সন্তান। তাই তাদের আনন্দের শেষ নেই। বেশ ভাল মোটা অংকের টাকা ও শাড়ী পাবে এই ভেবে খুব আগ্রহের সাথে চার জন বাসে চড়ে। বাসের ভিতর কন্টাকটারের সাথে ভাড়া নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়। সবসময় এরা কম মূল্য দেয়ার চেষ্টা করে। সমাজ ও ওদের কে ঠিক এইভাবে দেখে। কন্টাকটারও ভাড়া কম রাখে। বাসের ভিতর অন্যরকম পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
সন্তান নাচিয়ে শাড়ী,টাকা পয়সা নিয়ে তারা চারজন আবার ফিরে আসে বাড়িতে। ওখান থেকে আজ তাদের বেশ বড় অংকের টাকা এসেছে। তাই তারা আজ একটু ভালমন্দ খাবারের আয়োজন করে রাতে। কাদের কে দাওয়াত দেয় লাইলা। কাদের ও মনে করে অনেকদিন ভালমন্দ কিছু খাওয়া হয়না, চান্স যখন পেয়েছি তখন গিয়ে খেয়ে আসি,একটু ফুর্তি করে আসি এই ভেবে সে বাজারের ছলুর দোকানে যায়। ছলুর দোকানে বাংলা মদ কিনতে পাওয়া যায়। এইটা সে অনেক আগেই জানে। দু-তিন বার সে হলের ম্যানেজারের সাথে এসেছে। বাংলা মদ খাওয়ার অভ্যাস তার অনেক আগের থেকেই আছে। ছলুর দোকানে গিয়ে ২ বোতল বাংলা মদ কিনে কাদের লাইলাদের ওখানে দাওয়াত খেতে যায়। লাইলার বাড়িতেই সমস্ত আয়োজন করা হয়েছে।  রুপসী, নুরি, ছন্দা এসেছে। নতুন শাড়ী পরেছে সবাই। গতানুগতিক ভাবে মেয়েরা যেভাবে শাড়ী পরে ঠিক সেভাবে তারা শাড়ী পরে না । তাদের শাড়ী পরার স্টাইল টা ভিন্ন। শরীর দেখা যায়, সবসময় বক্ষ উন্মোচিত হয়ে থাকে, ব্লাউজের বোতাম খোলা থাকে, সবমিলিয়ে আকর্ষনীয় না হয়ে দেখতে একটু খারাপ ই লাগে।
তারপরেও কাদেরের কাছে লাইলার আবেদন রয়েছে, শারীরিক তৃপ্তি না পেলেও মানসিক তৃপ্তিতে সে তুষ্ট। কাদের লাইলাদের ঘর থেকে মাতাল অবস্থায় নিজের ঘরে ফিরে আসার সময় রাস্তায় এক দূর র্স্পকের আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা হয়। নওশাদ নামের ভদ্রলোক দেখতে শুনতে বেশ ভাল চেহারার। শরীরের গঠন সুঠাম,গায়ের রং শ্যামলা। কাদেরের আপন চাচাতো ভাইয়ের শ্যালা। অনেক আগে একবার তার সঙ্গে কাদেরের পরিচয় হয় তার চাচাতো ভাইয়ের বাসায়। কাদের কে সে মাতাল অবস্থায় দেখে বুঝতে পারে যে সে কিছুটা অসচেতন অবস্থায় আছে। নওশাদ কাদের কে সঙ্গে করে বাসায় পৌছিয়ে দিয়ে আসতে চায়। কাদের এতে রাজি না হয়ে বলে আমি একাই যেতে পারবো, আপনি আপনার কাজে যান, পরে কথা হবে। নওশাদ সাহেব কিছুটা দূরে যেয়ে একটি মুদির দোকানে চা-সিগারেট খেতে বসে যায়। চা-সিগারেট খেয়ে এক প্যাকেট গোল্ডলিফ সিগারেট কিনে বাসায় ফিরে। নওশাদ সাহেবের ¯্রী একটি র্গামেন্টস এ চাকরি করে। নওশাদ সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটি সিগারেট বের করে ধরাতে,ধরাতে বলে আজ কাদেরের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তাকে কেমন যেন অস্থির লাগলো। নওশাদের ¯্রী বললো তাকে একটা বিয়ে দিয়ে দেওয়ায় ভাল,নওশাদ সাহেব বলল, আমিও তাই ভাবছি। ভাল মেয়ে টেয়ে তোমার খোঁজে আছে নাকি। আছে তবে সবাই  র্গামেন্টস এর মেয়ে ছেলে। ভাল দেইখ্যা একটা মেয়ের লগে ওরে বিয়ে দিয়ে দেও। কাদেরের হলের ডিউটিরত অবস্থায় নওশাদের সঙ্গে আবার দেখা হয়ে যায়। নওশাদ বলে, তোমাকে আমার বিবি বাসায় যেতে বলেছে। কাদের বলে আমি যাব, তবে একটা শর্ত আছে। আমাকে বিয়ে টিয়ের কথা বলবেন না। আমি এখন বিয়ে করবো না। জীবনে বিয়ে করবো কিনা তাও জানি না। শুধু বেড়ানোর জন্য হলে একবার ঘুরে আসতে পারি। হলের শো ভাঙ্গলে নওশাদ বিদায় নিয়ে চলে যায়। পরবর্তি শো শুরু হওয়ার আগে লাইলা এসে হাজির। আজ সে এক শো সিনেমা দেখবে বিনে পয়সায়। কাদের লাইলা কে হলের ভিতর ঢুকিয়ে দিয়ে চলে আসে, বলে আজ তুই একা একা সিনেমা দেখ, আমার মুড নেই । লাইলা কাদেরের শার্ট টেনে ধরে বলে না, তোকেও আমার সঙ্গে সিনেমা দেখতে হবে। কাদের ও লাইলার মধ্যে ধস্তা ধস্তি শেষে কাদের জোর করে লাইলার কাছ থেকে চলে আসে। কাদের মনে,মনে ভাবে এই হিজড়াটার সঙ্গ ত্যাগ করতে হবে, আস্তে,আস্তে তাকে দূরে সরিয়ে দিতে হবে। লাইলার সঙ্গে মিলামিশা বাদ দিতে হবে। কিন্তু এত দিনের একটা গভির স্পর্ককে কিভাবে সে বাদ দিবে তাই ভাবতে থাকে। তাদের সখ্যতা প্রচন্ড আবেগপ্রবন, একে অন্যের সুখ,দু:খের সঙ্গে অতোপ্রতো ভাবে জড়িত। যদিওবা সে অন্যসম্প্রদায়ের লোক তাতে কি। কাদের ভাবতে থাকে কিভাবে লাইলার সঙ্গ ত্যাগ করা যায়। লাইলা এ সবের কিছুই টের পায় না। সে ভাবে প্রতিনিয়তই এরকম ধস্তা ধস্তি, কথা কাটা কাটি একটি ব›ধুত্ব সুলভ ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে, আমরা তো এই ভাবেই প্রতিনিয়ত আমাদের প্রতিটিদিন পার করে দিচ্ছি। আমাদের ভাল,মন্দ,সুখ,দু:খের কোন দাম ই নেই উচ্চবিত্ত শ্রেনীর লোকদের কাছে। আমরা একপ্রকার অবহেলিত। এর পরও কাদের যে আমাকে এতটা ভালবেসেছে, কাছে টেনেছে এটাই ঢের বেশি বৈ কম নয়।
দেখতে দেখতে দূর্গা পূজার সময় এসেছে। দূর্গা পূজায় হিজড়ারা যেখানে থাকে তার পাশে কোলকাতা থেকে বাবুরা প্রতিবছর পূজা করতে আশে। ব্রাক্ষণ বংশিও এ বাবুদের বিরাট একটা বাড়ি রয়েছে এখানে। পুরাতন ইট-পাথরের গড়া বাড়িটি এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় দালান বাড়ি। ধোয়া মুছার কাজ করছে ডোম মর্জিনা আর সাথে আছে রিনা। প্রতি বছর তারা এ কাজটি করে থাকে। বাবুদের সাথে তাদের পরিচয় অনেকদিনের। আর বাবুরাও তাদের দিয়ে ধোয়া মুছার কাজটা করাই প্রতিবছর,অন্যকাউকে দেয় না। যদিও তারা ভিন্ন সম্প্রদায়ের লোক। মর্জিনা আর রিনা কাজ করতে,করতে ভাবে এবার পূজায় বাংলা মদ খাওয়া যাবে ঢের বেশি, বাবুরা বেশ মোটা অংকের টাকাও দেবে। ডোম মর্জিনা,রিনা বলে জানিস এই বাড়িতে প্রতিরাতে কি হয়? রিনা বলে কি আর হবে, পাড়ার কিছু বকাটে ছেলে এখানে প্রতিরাতে মদ খায়,আমোদ ফুর্তি করে। ডোম মর্জিনা বলে, এর থেকে ভয়াবহ খারাপ কাজ হয় এখানে,প্রতিরাতে রেপ হয়।
রুপসী, নুরি কে বলে আমাদের দুইটা বেটা ছেলে কে দলে নিতে হবে। তাহলে আমাদের দলের কাজ করতে সুবিধা হবে, লোক বাড়বে, তাদের কে আমরা যেসব লোকদের কাছে যেয়ে পাত্তা পাই না সেসব লোকদের কাছে পাঠানো যাবে। দরকার হলে তারা আমাদের ঘরের কাজ-বাজও করতে পারবে। রান্না-বান্নার কাজও করানো যাবে। রুপসী আর নুরি লাইলার কাছে যায়। দলের জন্য দুইটা বেটা ছেলে খোঁজার কথা বলে। লাইলা বলে, কাদের কে দিয়ে আমি দুইটা বেটা ছেলের ব্যাবস্তা আমি করবো ও নিয়ে তোমাদের ভাবতে হবে না। পূজায় কার,কার কাছে যাবে, কোন কোন বাড়িতে ছেলে মেয়ে নাচাবে এ সমস্ত কিছু নিয়ে তারা একে অপরের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে। সন্ধা হলে লাইলা কাদের কে দুইটা বেটা ছেলে খুঁজে দেওয়ার কথা বলে। কাদের লাইলা কে বলে আমি খুঁজে দিতে পারবো কিন্তু আমাকে টাকা দিতে হবে, ম্যাগনা লোক খুঁজে দিতে পারবো না। লাইলা বলে টাকা-পয়সা দেওয়া যাবে তবে লোক খুঁজে দেওয়ার পরে। কাদের বলে ঠিক আছে।
দূর্গা পূজার মা দূর্গার দশ হাত বিশিষ্ট প্রতিমা তৈরিতে ব্যাস্ত শিল্পিরা। শিল্পির তুলির ছোয়ায় মা দূর্গা যেন সত্যিই হিন্দুদের কাছে মা রুপে আর্বিভাব হয়ে আসে। এদের কয়েক জনের সঙ্গে পরিচয় আছে কাদেরের। সে এবার বাবুদের জন্য প্রতিমা কেনার কাজে সবার সঙ্গে সে ও থাকবে। বিভিন্ন পূজা মন্ডপের প্রতিমা তৈরিতে প্রতিযোগীতার ব্যাবস্থা করে থাকে পূজা উদযাপন কমিটি। তাই শিল্পিরাও একে ওপরের সঙ্গে প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হয়, কে কত সুন্দর প্রতিমা বানাতে পারে। কাদের যেয়ে শিল্পি নন্দিলালের কাছে বাবুদের জন্য প্রতিমার অর্ডার দিয়ে আসে। নন্দিলাল বলে, প্রতিবারের মত এবারও মন্ডপে যেয়ে আমি নিজে প্রতিমা বানিয়ে দিয়ে আসবো কিন্তু এবার দাম একটু বেশি দিতে হবে। ঠিক আছে দেওয়া যাবে, এই বলে কাদের চলে আসে। আসার পথে দুইটা বেটা ছেলের খোঁজ নেয় ঋষি পাড়ায়।
কিছুদিন পর নন্দিলাল তার দলবল নিয়ে বাবুদের বাড়ির পূজা মন্ডপে প্রতিমা বানিয়ে দিয়ে আসে। চারিপাশে পূজা উদযাপনের জন্য আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়ে গেছে। কিছুদিন পর পূজা । বাবুরা কোলকাতা থেকে পূজা করার জন্য দেশে এসেছে। বিশাল এক গাড়ির বহর, ২ টি কার গাড়ি ও একটি মাইক্রোবাস। সঙ্গে বিলাতি কুকুর রয়েছে। বাবুর নাম মহতাব, ইনি বড় বাবু তার ভাই কেষ্ট। সঙ্গে রয়েছে দুই মেয়ে ও তাদের জামাই বাবুরা। সবমিলিয়ে একটি সুখি হিন্দু পরিবার।
দশমির দিন মা দূর্গাকে বিসর্জন দিয়ে বাবুরা আবার ফিরে যাবেন কোলকাতায়। তাই অষ্টমির দিন সমস্ত আয়োজন করা হয়েছে, এই দিন সবাই আমোদ ফুর্তিতে মজে থাকবে, সারারাত গানবাজনা হবে। গানের শিল্পিদের ভাড়া করে নিয়ে আসা হয়েছে। আশেপাশের এমনকি দূর থেকেও অনেকে এখানে পূজা দেখতে আসেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশাপাশি মুসলিমরাও পূজায় অনেক আনন্দ করে থাকে। অষ্টমির রাতে, লাইলা প্রচুর বাংলা মদ খেয়েছে, মদে প্রচুর পরিমানে স্প্রিট মেশানো তাই সামাল দিতে পারেনি,মুখে ফেনা উঠেগেছে। সকালে কাদের লাইলা কে পূজা মন্ডপের পাশে অচেতন অবস্থায় দেখে আতকে ওঠে। কাছে গিয়ে নাকের কাছে নাক নিয়ে সে উপলব্দি করে লাইলার শ্বাস বন্দ হয়ে গেছে, লাইলা আর বেঁচে নেই। কাদের লাইলার বুকের উপর পড়ে থেকে শুধু কাঁদতে থাকে। রুপসী,নুরি,ছন্দা এসে কাদের কে টেনে হেচড়ে দাঁড় করিয়ে শান্তনা দেয়। কাদের কিছুতেই লাইলার মৃত্যু কে মেনে নিতে পারে না। বাবুদের মাইক্রোতে নুরি,রুপসী আর ছন্দা কাদেরকে সহ লাইলার লাশ নিয়ে লাইলার গ্রামের বাড়ির দিকে রওনা হয়।