ক্রীড়া প্রতিবেদক : ডারউইন টেস্টে জয়ের পর বাংলাদেশে কেমন উদযাপন হয়েছে,সে সম্পর্কে জানার তীব্র আকাঙ্ক্ষা অস্ট্রেলিয়ান সাংবাদিকদের। ঢাকা থেকে দ্বিতীয় টেস্ট কাভার করতে আসা সাংবাদিকদের কাছে পেয়ে দেশে উদযাপনের সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চান। কেউ জিজ্ঞেস করেন, ঢাকার রাস্তায় মিছিল হয়েছে কিনা। কারও জানতে চাওয়া, পত্রিকায় কত বড় হেডলাইন হয়েছে? মোটর শোভাযাত্রা হয়েছিল কিনা। এ থেকে একটা জিনিস বোঝা যায়, অসিদের টেস্টে হারানো বিশাল প্রাপ্তি। এই অর্জনকে উদযাপন করা খুবই স্বাভাবিক। টেস্ট অভিষেকের ২৬ বছর পর পাওয়া বড় জয় বিশ্ব ক্রিকেটকেই তো নাড়া দিয়েছে। এ কারণেই অসিদের এত আগ্রহ। তবে আগ্রহের সমান্তরালে উদ্বেগও আছে দেশটির ক্রিকেট অনুরাগীদের মধ্যে। খেলা সম্প্রচার কাজে নিয়োজিত একজন তো বলেই ফেললেন, ‘দ্বিতীয় টেস্টও জিতে যেতে পারে আপনাদের দল।’বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মধ্যেও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে অনুরূপ বিশ্বাস। প্রথম টেস্ট জয়ের নায়ক হাসান মাহমুদ মনে করেন, পেস ও বাউন্সি উইকেটেও ভালো করবে বোলিং ইউনিট। একজন ঠাট্টাচ্ছলে বলছিলেন, অস্ট্রেলিয়া দলের ধমনিতেও প্রবাহিত হচ্ছে হারের শঙ্কা। আর এই শঙ্কা কাজে লাগিয়ে ম্যাকাইয়ে সিরিজ নির্ধারণী দ্বিতীয় টেস্ট স্মরণীয় করে রাখার স্বপ্ন দেখে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের অর্জনগুলো বেশ চমকপ্রদ। ২০০৫ সালে কার্ডিফে মোহাম্মদ আশরাফুলের সেঞ্চুরিতে ওয়ানডেতে হারায় অস্ট্রেলিয়াকে। ২০১৭ সালে দেশের মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়ও ছিল ঘটনাবহুল। ২০২১ সালে দেশের মাটিতে টি২০ সিরিজ জয়ও তো ইতিহাস। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক টেস্ট জয় সমীহ-জাগানিয়া। এই অর্জনের মুকুটে যোগ হতে পারে আরেকটি সাফল্যের পালক। গত বৃহস্পতিবার ম্যাকাইয়ে টাইগারদের প্রধান কোচ ফিল সিমন্সের কাছে এই ম্যাচ নিয়ে অনেক কিছু জানতে চাওয়া হয়। তিনি উত্তর দেন কূটনীতিকের মতো করে,‘এই নতুন একটি ম্যাচ, কান্ডিশনও ভিন্ন। আর অস্ট্রেলিয়াও চেষ্টা করবে কঠিনভাবে ফিরতে। আমরা চেষ্টা করব প্রসেস মেনে খেলার। আশা করি, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি গেম দেখতে পারবেন সমর্থকরা।’ সিমন্স ভুল বলেননি; সিরিজ বাঁচাতে মরিয়া হয়ে অপেক্ষা করছে অসি বাহিনী। ম্যাকাইয়ে পৌঁছানোর পরের দিন থেকে অনুশীলন করে তারা। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত বিরতিহীন অনুশীলন করেছে স্বাগতিকরা। ব্যাটিং- বোলিং দুই ভূমিকায় একাগ্র ছিলেন বোলাররা। টানা দুই ঘণ্টা বোলিং করার পর ব্যাটিং করতে দেখা গেছে এক ঘণ্টার মতো। বোলারদের এভাবে লম্বা ব্যাটিং সেশন করার কারণ হাসান মাহমুদ, তাসকিন আহমেদের ছন্দে থাকা। ডারউইন টেস্টের প্রথম ইনিংসে ব্যাটারের ভূমিকা নিয়েছিলেন তারা। টেলএন্ডারদের সঙ্গী হিসেবে পেয়ে ৬৫ রানের ঝলমলে একটি ইনিংস খেলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। তানজিদ হাসান তামিমের সেঞ্চুরি, নাজমুল হোসেন শান্ত আর মিরাজের হাফ সেঞ্চুরিতে ৪২৬ রানের বড় সংগ্রহ দাঁড় করে বাংলাদেশ। বল হাতেও ঝলমলে ছিলেন মিরাজ। তিনি পাঁচ উইকেট শিকার করায় দ্বিতীয় ইনিংসে অসিদের ২৮৪ রানে বেঁধে ফেলা সম্ভব হয়। ৫৬ রানের লক্ষ্য খুব সহজে তাড়া করে ফেলেন মুমিনুল হকরা। ৯ উইকেটে ম্যাচ জিতে ইতিহাস গড়েন শান্তরা। তারই প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে ম্যাকাইয়ে। কোচ সিমন্স ভালো ক্রিকেট খেলার কথা মুখে বললেও মনের গভীরে চঞ্চল অন্য কিছু। রাওয়ালপিন্ডির মতো অস্ট্রেলিয়ায়ও বাজিমাত করার স্বপ্ন টাইগার ড্রেসিংরুমে। তাই প্রস্তুতির পরতে পরতে ছিল গেম প্ল্যানের ছাপ। বাঁহাতি পেসার শরিফুল ইসলাম দেড় ঘণ্টার বোলিং সেশন করেন প্রথম অনুশীলনে। হেড কোচের পাশাপাশি বোলিং কোচের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছিল তাঁর ওপর। হাসান মাহমুদ, তাসকিন আহমেদ, খালিদ আহমেদ, এবাদত হোসেন করেন টেস্টের বোলিং স্পেল। ধারণা করা হচ্ছে, সিরিজ নির্ধারণী দ্বিতীয় টেস্টে খেলানো হবে চার পেসার। কোচের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে হাসি দিয়ে এড়িয়ে যান এই বলে-আজ ঠিক করব একাদশ। ম্যাকাইয়ে চার পেসার খেলানোর সম্ভাবনা নিয়ে গুঞ্জনের কারণ তীব্র বাতাস, কুসুম কুসুম শীত আর পেস ও বাউন্সি উইকেট। এই মাঠের উইকেট গড়া হয়েছে ব্রিসবেনের গ্যাবার পিচে, কিউরেটরও গ্যাবা থেকে আসা। গত টেস্ট চলাকালে রিকি পন্টিংরাও বলছিলেন, উইকেট ভিন্ন হবে। একজন অস্ট্রেলিয়ান সাংবাদিক এ প্রসঙ্গ তুলতেই সিমন্স সোজা ব্যাটে খেলেন,‘ডারউইনের উইকেট নিশ্চয়ই ব্যাটিংবান্ধব ছিল না। ওখানে খেলতে পারলে এখানেও খেলা সম্ভব হবে। উইকেট নিয়ে চিন্তা করার কোনো কারণ দেখি না।’ কন্ডিশন যে ভিন্ন হবে, সাদমান ইসলাম ও মুশফিকুর রহিমের কথায় তা পরিষ্কার। নেট সেশনের সময় শরিফুলকে সাদমান ইসলাম বলেন, ‘তোমার বাউন্স কারার প্রয়োজন নেই; অটো বাউন্স হবে এখানে। শুধু বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখো।’ ব্যাটারের পরামর্শ মেনে বোলিং সেশন করেন বাঁহাতি এই পেসার। পেসার হাসানকে মুশফিকুর রহিমের পরামর্শ, ‘যে বাতাস, তাতে রিভার্স সুইং করা কঠিন হবে। এক চ্যানেলে বোলিং করলে ভালো হবে।’ ম্যাকাইয়ের রেড ব্যারিয়ার অ্যারেনার হ্যারাপ পার্কের উইকেট কেমন হলো-জানার জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে টেস্ট ম্যাচ শুরু হওয়া পর্যন্ত। তবে ক্রিকেটাররা ভালো করে উইকেটে পড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন গতকালই। আর অসি ক্রিকেটাররা তো আগে থেকেই জানেন, উইকেট কেমন হবে। কারণ, তাদের পছন্দের উইকেটে খেলা হবে ম্যাচ। দেশের ১২তম টেস্ট ভেন্যুর অভিষেক রাঙাতে মরিয়া হয়ে খেলে ম্যাচ জয়ের চেষ্টা করবে। এ ছাড়া প্রতিশোধের নেশাও জেঁকে বসেছে তাদের ওপর। গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে উভয় দলে একাধিক পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। বাংলাদেশ তিন পেসার নিয়ে খেললে তাসকিনকে বিশ্রাম দিয়ে খেলাতে পারে শরিফুলকে। আর চার পেসার খেললে বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল থাকতে পারেন দ্বাদশ খেলোয়াড়।