ডাঃ মোঃ মাহমুদুল হাসান পান্নু : রমজানে আল্লাহতালার ইবাদত বন্দেগী করার জন্য সুস্থ থাকা একান্ত প্রয়োজন, তাই এই সময়ের সমস্যাগুলো সম্পর্কে সচেতন থেকে ব্যবস্থা নিলে এই পবিত্র মাসে সুন্দর ভাবে ইবাদত করা সম্ভব।
রমজানে অন্যতম একটি সমস্যা হল কোষ্ঠ কাঠিন্য। কারণ সারা দিন রোজা রাখার জন্য পানি খাওয়া হয় না,তাছাড়া ইফতারির সময় আমরা বিভিন্ন ভাজাপোড়া জাতীয় খাবার বেশি খায় এবং সেহেরীতেও আমরা সাধারণত: আঁশযুক্ত খাবার কম খাই ‘রিচ ফুড’ অর্থাৎ উচ্চ ক্যালরি যুক্ত খাবার বেশি খাই।ফলে প্রায় সব রোজাদারেরই রমজানে একটু একটু কোষ্ঠ কাঠিন্য হয়ে থাকে। যার ফলে রমজানে পায়ুপথের বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। বিশেষ করে পাইলস ও এনাল ফিসার নামক দুটি রোগ এইসময় বেশী হয়ে থাকে।
কোষ্ঠ কাঠিন্যের জন্য মলত্যাগের সময় প্রেসার দিয়ে মলত্যাগ করতে হয়,যার ফলে মলদ্বারের রক্তনালী সূমহ ফুলে যায় এবং কোন কোন সময় রক্তনালীতে ঞবধৎ হয় বা রক্তনালী ছিড়ে যায়, ফলে প্রচুর রক্তপাত হয়। এটাকেই পাইলস বলে। (অধিকাংশ সাধারণ মানুষ অবশ্য মলদ্বারে কিছু হলেই সেটাকে পাইলস মনে করে-এ বিষয়ে অন্য একদিন বিশদ আলোচনা করব)
এছাড়া মল যখন কঠিন হয় তখন প্রেসার দিয়ে মলত্যাগের কারণে মলদ্বার চিরে বা ছিড়েও যেতে পারে এবং এতে তীব্র ব্যাথাসহ অল্প রক্তপাত হতে পারে। ব্যাথার জন্য রোগীর দৈনন্দিন কাজের ব্যাঘাতও ঘটতে পারে ।এটাকে এনাল ফিসার বলে......গবেষণায় দেখা গেছে রমজানে পায়ুপথে পাইলস ও এনাল ফিসার সব চাইতে বেশী নতুন রোগী সৃষ্টি হয়। অপরদিকে পুরাতন রোগী যারা ইতোমধ্যে পাইলস ও এনাল ফিসার রোগে ভুগছেন রমজানে তাদের রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। মলত্যাগের সময় রক্তপাত ও তীব্র ব্যাথার কারণে রোগীকে অনেক সময় রোজা ভেঙে ফেলতে হয় বা রোজা রাখতে পারেন না। ফলে অনেকেই রমজানের নেয়ামত থেকে বঞ্চিত হন।
এ থেকে বাচার উপায় সমূহঃ
১। রমজানে যথাসম্ভব ভাজাপোড়া কম খাবেন,ইফতারির সময় এবং সেহেরি পর্যন্ত প্রচুর পানি পান করুন,
২। বেশি করে ফলমূল খান, রাতের খাবারে শাকসবজি ও আঁশযুক্ত খাবার বেশি খান।
৩। নিয়মিত মলত্যাগের অভ্যাস গড়ে তুলুন,
‘DON'T MAKE A DEDICATORY CALL AS A MISS CALL”..
অর্থাৎ মলত্যাগের বেগ আসলে ধরে না রেখে যতদ্রুত সম্ভব মলত্যাগ করুন।
৪। যাদের পূর্বে থেকেই কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা আছে তারা প্রথম থেকেই সতর্ক হোন। মল নরম করার জন্য রমজান মাস জুড়ে ইসুফগুলের ভূষি খেতে পারেন। ইহা বাজারে খোলা অবস্থায় পাওয়া যায় আবার ওষুধের দোকানে প্যাকেট আকারেও পাওয়া যায়। ইফতাররের সময় ও সেহেরি খাবার পর ১ চামচ বা ১ প্যাকেট ১গ্লাস পানিতে গুলিয়ে সাথে সাথে পান করুন।
৫। আর যাদের পূর্ব থেকেই পায়ুপথের বিভিন্ন রোগ আছে তারা রমজানের শুরুতেই একজন কলোরেক্টাল সার্জন দেখিয়ে পরামর্শ নিন।
৬। রমজানে যদি কারো নতুন করে সমস্যা দেখা দেয় তাহলে অবশ্যই একজন কলোরেক্টাল সার্জনের পরামর্শ নিন।
রোগের কাছে লজ্জার কিছু নেই। অনেকেই লজ্জার কারণে ডাক্তারের কাছে যেতে চান না,লজ্জা করে রোগ পুষে রাখলে এক সময় তার চিকিৎসা করা দূরহ হয়ে যায়। তাছাড়া একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে অনেক সময় মলদ্বারের ক্যান্সারও প্রেজেন্ট করতে পারে।
সুতরাং পায়ুপথের যে কোন উপসর্গ দেখা দিলে তা অবহেলা না করে একজন কলোরেক্টাল সার্জনের (পায়ুপথের রোগ বিশেষজ্ঞ) পরামর্শ নিন। বিঃদ্রঃ প্রাথমিক পর্যায়ে পাইলস, এনাল ফিসার রোগের চিকিৎসা করালে ৮০% থেকে ৯০% ক্ষেত্রে অপারেশন ছাড়া ভালো হয়।
প্রত্যেকে ভালভাবে পবিত্র রমজানের ইবাদত বন্দেগি করতে পারুন, এই প্রত্যাশা রইল।
লেখক :
কলোরেক্টাল ও ল্যাপারোস্কপিক সার্জন
সহকারী অধ্যাপক (কলোরেক্টাল সার্জারি)
যশোর মেডিকেল কলেজ, যশোর।