ঝিনাইদহ, মহেশপুর ও কালীগঞ্জ প্রতিনিধি : স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন- প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৯ তলা বিশিষ্ট আধুনিক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স করা হবে। তিন ধাপে দেশের সব ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করা হবে।’ তিনি বলেন- বিগত ১৭ বছরের ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের চিকিৎসা খাত চরম অবহেলা ও ব্যাপক লুটপাটের শিকার হয়েছে । ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের রেখে যাওয়া অবহেলিত স্বাস্থ্যখাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে কাজ করছি। রোববার ঝিনাইদহের মহেশপুর ও কোটচাঁদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আকস্মিক পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হাসপাতালের ওষুধ ক্রয়েও দুর্নীতি হয়েছে। মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি ওষুধ, অ্যান্টি র্যাবিস ভ্যাকসিন, অ্যান্টিভেনমসহ জরুরি ইনজেকশন হাসপাতালের বাইরে বিক্রি করা হতো। রোগীদের ওষুধ দেওয়া হতো না। রোগীদের সঙ্গে চিকিৎসকরা খারাপ আচরণ করতেন। অনেক জায়গায় চিকিৎসকরা নিয়মিত হাসপাতালে আসতেন না। ডাক্তার নার্সরা রোগীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করতেন। আমরা দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে এ ধরনের অভিযোগের নোট পেয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘কেবল স্বাস্থ্যখাত নয়, বরং স্বাস্থ্যখাতের গোটা পদ্ধতিই পরিবর্তন করে দিচ্ছি। নতুন একটি শৃঙ্খলার মধ্যে চিকিৎসা পদ্ধতিকে আনতে চাচ্ছি। চিকিৎসক সংকট, ওষুধ সংকট ও রোগীদের সেবা সহজীকরণে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। সরকারি স্বাস্থ্যসেবার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরাতে আমরা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কোনো ছাড় দেবো না।’ স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আগামীতে ১৫১ শয্যা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চালুর পর এসব হাসপাতালে প্রসূতি নারীদের জন্য ২৫ শয্যার বিশেষ ওয়ার্ড রাখা হবে। শিশুদের জন্য ২০ শয্যার পৃথক ওয়ার্ড রাখা হবে। এই হাসপাতালগুলোতেই কিডনি ডায়ালাইসিসের মতো সেবা আমরা চালু করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। এগুলো বাস্তবায়ন হলে দেশের স্বাস্থ্যখাত ও চিকিৎসা সেবার পদ্ধতিই বদলে যাবে।’ এর আগে সকালে মহেশপুর ও কোটচাঁদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এ সময় হাসপাতালের বহির্বিভাগ (আউটডোর), রোগীদের টিকা কার্যক্রম, রান্নাঘর, খাবারের মান, শৌচাগার, স্টোররুম এবং হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ঘুরে দেখেন। একই সঙ্গে চিকিৎসক, নার্স ও অন্য কর্মীদের কর্মস্থলে উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনের বিষয়ে খোঁজখবর নেন। এছাড়া তিনি হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগীদের সার্বিক খোঁজখবর নেন। সেই সঙ্গে হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবার মান ও খাবারের মান নিয়ে রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন। এসময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক,মহেশপুর জানান- সকালে উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মোঃ সাখাওয়াত হোসেন হঠাৎ পরিদর্শনে আসেন। এ সময় তিনি রোগীদের ওয়ার্ডে যান এবং রোগীদের সাথে কথা বলেন। পরে ঔষধের স্টোর, স্টোক রেজিষ্টার, অপরেশন থিয়েটার এবং অফিসের বিভিন্ন রুম ঘুরে ঘুরে দেখেন। স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সের বর্তমান ম্যানেজম্যান্ট ও পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। হাসপাতালের অফিস রুমে ডাক্তার ও কর্মচারিদের সাথে খোলামেলা আলোচনা করেন। উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সের পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ হেলেনা আক্তার নিপা স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে জানান, হাসপাতালে ডাক্তার, নার্স ও পরিচ্ছন্ন কর্মী সংকট। তিনি তাৎক্ষণিক ভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমডিকে ফোন করে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। স্বাস্থ্যকমপ্লে´ আউটসোর্সিংয়ে কর্মরত লোকজনের কাছে জনৈক ঠিকাদার ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করায় তাৎক্ষণিক টাকা না দেয়ার নির্দেশ দেন ও ঠিকাদার মনিরুলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া আশ্বাস দেন। এছাড়া সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে আউটসোর্সিংয়ে যারা এখনো বেতন পায়নি তাদের বেতন দেয়ার ব্যবস্থা ও হাসপাতালের সমস্যা গুলো দ্রুত সমাধান করা হবে বলেও আশ্বাস দেন। মহেশপুরের ভৈরবা হাসপাতালটি বন্ধ থাকার বিষয়ে তিনি বলেন- সরকারের নানা প্রকার পরিকল্পনা আছে তাতে প্রতিটা ইউনিয়নের একটি করে হেলপসেন্টার চালু করা হবে। এছাড়া তিনি আরো বলেন, সারাদেশে দুই থেকে আড়াই হাজার বেডের ১০/১২ বিশেষায়িত হাসপাতাল করা হবে। যার মধ্যে দুইটি থাকবে মহিলাদের জন্য। আকস্মিক পরিদর্শন কেন করা হচ্ছে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, অনেক হাসপাতালে ডাক্তার অনউপস্থিত থাকে, সরকারি ঔষধ থাকা শর্তে ও রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনে আনতে হয়। হাসপাতালের পরিবেশ নোংরা থাকে। এসকল রোধ করার জন্যই এক আকস্মিক পরিদর্শন করা হচ্ছে।
কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি জানান- রোববার দুপুর দুইটার দিকে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আকস্মিক পরিদর্শনে আসেন স্বাস্থ্য মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। মন্ত্রী এদিন বেলা ১১ টার পর ঝিনাইদহের মহেশপুর ও কোটচাঁদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শন শেষে দুপুর ২ টার দিকে কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আকস্মিক পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন। মন্ত্রী নিজেই ডাক্তার ও নার্সদের উপস্থিতি ভিজিট করেন। এরপর হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখেন এবং রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন। মন্ত্রী হাসপাতালটির খাবারের মান যাচাইয়ে নিজে খাবার খেয়েও টেস্ট করেন। তিনি হাসপাতালের বাথরুম ও ছোটখাট জিনিসও খতিয়ে দেখেন। প্রায় এক ঘন্টা ব্যাপি সকল বিষয় খতিয়ে দেখেন। আরো উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার রেজওয়ানা নাহিদ, কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আল মামুন, উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক হামিদুল ইসলাম হামিদ, উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব মাহবুবুর রহমান মিলনসহ স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। শেষে বিকাল ৩ টার দিকে ঝিনাইদহের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন।