১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা

চুড়ামনকাটির চয়ন খুন, আটক দু’জনের আদালতে স্বীকারোক্তি

এখন সময়: মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল , ২০২৪, ০৪:২৮:০৭ পিএম

নিজস্ব প্রতিবেদক : নামযজ্ঞ অনুষ্ঠানে মারামারিতে আহত বন্ধুদের দেখে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পথে যশোরে চয়ন দাস (১৭) নামে এক কিশোর খুন হয়েছে। গত শনিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে সদর উপজেলার শানতলায় তার ওপর হামলা চালিয়ে গলা চেপে শ্বাসরোধে হত্যা করে রাস্তায় ফেলে রাখা হয়। ওই সময় বন্ধুদের হাসপাতাল থেকে দেখে বাড়ি ফিরছিল ওই কিশোর। নিহত চয়ন সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি দাসপাড়ার নয়ন দাসের ছেলে ও এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থী।
পুলিশ জানায়, চয়ন দাসকে হত্যার ঘটনায় আটক দুই জনসহ ১২ জনের নাম উল্লেখ করে গত রোববার দিবাগত রাতে কোতয়ালি থানায় মামলা করেছেন নিহতের পিতা চুড়ামনকাটি দাসপাড়ার বাসিন্দা নয়ন দাস।
এই ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) দুই যুবককে গ্রেপ্তার করেছে। আটক দুইজনই আদালতে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। গ্রেপ্তারারা হলো, সদর উপজেলার শানতলা দাসপাড়ার পরিতোষ কুমারের ছেলে হৃদয় কুমার দাস (১৯) এবং নির্মল দাসের ছেলে প্রদীপ দাস (২৩)।
মামলার অপর আসামিরা হলেন, শানতলা দাসপাড়ার লালনের ছেলে অনিক, রমেশের ছেলে বিশাল, গনেশ দাসের ছেলে সবুজ, মৃত শান্তি দাসের ছেলে গনেশ, পরিতোষ দাসের ছেলে নয়ন দাস, পরেশ দাসের ছেলে লালন দাস, তপন দাসের ছেলে শান্ত, আরবপুরের অরুন দাসের ছেলে সাগর দাস, ধর্মতলার গোপাল দাসের ছেলে সোহাগ দাস ও ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বারবাজার মশিহাটি দাসপাড়ার মিলন দাসের ছেলে জনি দাস।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক পার্থপ্রতিম চক্রবর্তী বলেন, নিহতের শ্বাসনালী ও কাঁধের পেছনের হাড় ভাঙা ও থুতনিতে ধারাল অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন ছিল।
পিবিআই জানিয়েছে, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টার দিকে চুড়ামনকাঠি কুন্ডুপাড়ায় নামযজ্ঞ অনুষ্ঠানে খাবার খাওয়া নিয়ে চুড়ামনকাঠি দাসপাড়ার কয়েকজন ছেলের সাথে শানতলা দাসপাড়ার কিছু ছেলেদের গোলমাল হয়। বিষয়টি স্থানীয় লোকজন এবং চুড়ামনকাঠি দাস পাড়ার মাতব্বর আনন্দ দাস বিষয়টি মীমাংসা করে দেন। পরবর্তীতে ২৪ ফেব্রুয়ারি ঝিকরগাছার মল্লিকপুরে নামযজ্ঞ অনুষ্ঠানে চুড়ামনকাঠি দাসপাড়ার ছেলেরা যায়। আসামিরাও একই স্থানে নামযজ্ঞ অনুষ্ঠানে গেলে উভয় পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়। একপর্যায়ে আসামিরা চয়নের বন্ধু জীবন দাস ও স্বাধীন দাসকে চাকু দিয়ে আঘাত করে রক্তাক্ত জখম করে। তখন তাদের চিকিৎসার জন্য যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এরপর চয়নসহ চুড়ামনকাঠির অনেক লোকজন তার বন্ধুদের দেখতে হাসপাতালে যায়। দিবাগত রাত পৌনে একটার দিকে চয়নসহসহ ৮/১০ জন হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পথে শানতলা পেপসি কোম্পানির ১ নম্বর গেটের সামনে পৌঁছলে পূর্ব শত্রুতার জের ধরে হৃদয় ও প্রদীপসহ শানতালা দাসপাড়ার ১৫/২০ জন চয়ন দাসসহ অন্যদের পথরোধ করে খুন করার উদ্দেশ্যে এলোপাতাড়ি মারধর করে। আটক হৃদয় ও প্রদীপসহ অন্যান্য আসামিদের মারধরের ফলে চয়নের কয়েকজন বন্ধু জখম হয়। সে সময় আসামিরা চয়নকে গলা চেপে শ্বাসরোধে হত্যা করে রাস্তায় ফেলে রাখে।
পিবিআই জানিয়েছে, ঘটনার পর তাদের সদস্যরা বিষয়টি তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একটি পর্যাায়ে সদর উপজেলা বসুন্দিয়া বাজারের একটি সেলুন থেকে গত রোববার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে প্রদীপকে এবং রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডু উপজেলার দিকনগর গ্রামের খোকন দাসের বাড়ি থেকে হৃদয়কে আটক করা হয়। আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। সোমবার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় তারা। জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জাকিয়া সুলতানা ওই স্বীকারোক্তি রেকর্ড করেছেন বলে পিবিআই জানিয়েছে।
চুড়ামনকাটি দাস পাড়ার মাতব্বর আনন্দ দাস জানিয়েছেন, তিনিও ওই রাতে ঝিকরগাছার মল্লিকপুরে গিয়েছিলেন। সেখানে চুড়ামনকাঠি দাসপাড়ার ছেলেদের সাথে শানতলা দাসপাড়ার ছেলেদের গন্ডগোল হয়। এই ঘটনায় চুড়ামনকঠি দাসপাড়ার তপন দাসের ছেলে জীবন দাস, নিরঞ্জন দাসের ছেলে দীপ্ত দাসসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়। তাদের যশোর জেনারেল হাসপাতলে ভর্তি করা হয়।
তিনি জানান, ওই রাতেই জীবন দাস ফোনে নিহত চয়নকে তাদের দেখতে হাসপাতালে যেতে বলে। তিনটি গাড়িতে করে চয়নসহ ১০/১৫জন হাসপাতালে যায় এবং তাদের দেখে বাড়িতে ফিরছিল। চয়ন দাসের গাড়িটি ছিল সামনে। শানতলা পেপসি কোম্পানির সামনে পৌঁছলে সেখানে গাড়ি থেকে নামিয়ে চয়নকে মারধর করা হয়। অন্য দুইটি গাড়ি পেছনের দিকে ছিল। এরমধ্যে একজন ট্রাক চালক জানায় সামনে গন্ডগোল হচ্ছে। সে সময় তিনিসহ সাথে থাকা লোকজন দৌড়ে এগিয়ে যান এবং দেখেন চয়ন রাস্তার ওপর পড়ে আছে। সে সময় চয়নকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এর আগে আরবপুরে বসবাসরত গোপালের ছেলে সোহাগের সাথে রাস্তায় দেখা হয়। সে সময় সোহাগ তাকে হুমকি দিয়ে বলে, ‘মারামারির ঘটনা বুঝ করে নেবো’। এর কিছু সময় পর হত্যাকাণ্ড ঘটে।
তিনি আরো জানিয়েছেন, হামলাকারীরা ৩/৪টি মোটরসাইকেলে করে আসে। তাদের মধ্য ছিল মৃত শান্তির ছেলে গণেষ, পরশের ছেলে লালন, রমেশের ছেলে বিশাল, গোপালের ছেলে সোহাগ, গণেষের ছেলে সবুজ, লালনের ছেলে অনিক, একই এলাকার দীপ্তি, শয়নের ছেলে নয়ন, সন্তোষ, রতনের ছেলে শ্রীকান্ত, সন্তোষের ছেলে আশিক, শ্যামলের ছেলে অুনপম এবং একই এলাকার নির্মল।
এ বিষয়ে কোতয়ালি থানার ওসি আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, নিহতের থুতনিতে সামান্য আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তাকে হত্যা করা হয়েছে, না কি সে গাড়ি থেকে পড়ে গিয়েছিল, সেটি তদন্ত করা হচ্ছে। পোস্টমর্টেম রিপোর্টের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। তবে হত্যা মামলা হিসাবে বাদীর অভিযোগ রেকর্ড করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে।