নিজস্ব প্রতিবেদক: পর্যটনের নামে ভৈরব নদের যশোর শহর অংশ ব্যক্তিমালিকানায় ‘টুরিস্ট পয়েন্ট’ করার অনুমতি দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। উন্মুক্ত জলাশয় ব্যক্তিমালিকানায় অনুমতি দেয়া হলেও কোন দরপত্র আহ্বান করা হয়নি। অবৈধভাবে অনুমতি পাওয়া ওই প্রতিষ্ঠান এখন নদীর পাড় দখল করে তৈরি করছেন স্থাপনা। এমনকি পাউবো ‘টুরিস্ট পয়েন্ট’ করতে যেসব শর্ত দেয়া হয়েছিলো সেগুলোও মানেনি অনুমতি পাওয়া প্রতিষ্ঠানটি। যদিও গণবিরোধী এই অবৈধ অনুমতিতে সরকারের কোন আর্থিক স্বার্থ না থাকলেও বিশেষ একটি মহলের স্বার্থে ‘টুরিস্ট পয়েন্ট’ ব্যক্তিমালিকানায় অনুমতি দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ভৈরব নদ সংস্কার আন্দোলন কমিটির। ক্ষোভ প্রকাশ করে কমিটির উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, ‘নদী জনসম্পত্তি। এই নদী নিয়ে দীর্ঘদিন আন্দোলন করে সংস্কার হয়েছে। সংস্কারের সময়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসন নদী তট আইন লঙ্ঘন করেছে। এই আইন লঙ্ঘন করার উদ্দেশ্য ছিলো এটা এখন নদী নিয়ে ব্যবসা করবে সেটাই তার প্রমাণ। নদীর পাড়ে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। সেটাকেও ঘিরে বিভিন্ন মহল সিন্ডিকেট করে ব্যবসা করছে। নদীকে ব্যক্তি মালিকানায় এই ধরণের কর্মকাণ্ড করতে দিতে অবৈধ। এটা গণবিরোধী কাজ। এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলবে নদ সংস্কার কমিটি।’ পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোর তথ্যমতে, ২০১৬ সালে ২৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ভৈরব নদের ৯২ কিলোমিটার খনন প্রকল্প গ্রহণ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। যশোর শহর অংশের চার কিলোমিটার এলাকায় নামমাত্র কিছু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। যদিও নদী খনন কাজের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মেগা প্রজেক্টেও প্রবাহ ফেরেনি ভৈরব নদে। নানা প্রশ্নের মধ্যে নদীর পাড়েই ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পার্ক। সেই পার্কটিতেও কোন প্রকার দরপত্র ছাড়া ব্যক্তিমালিকানায় শিশুদের জন্য স্পোর্টস জোন করার অনুমতি দেয় পাউবো। এই বির্তকের মধ্যে এবার গত বছরের ২৪নভেম্বর নদীতে টুরিস্ট পয়েন্ট করার জন্য আবেদন করেন মেসার্স বিসমিল্লাহ মধু ট্রেডিং পরিচালক মাহবুব ইসলাম। তার অনুমতির প্রেক্ষিতে জেলা নদী রক্ষা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শহরের ঢাকা রোড ব্রিজ হতে কাঠালতলা ব্রীজ পর্যন্ত ১০ শর্তসাপেক্ষ দুই মাসের অনুমতি প্রদান করেছিলেন পাউবো। যা শেষ হয়েছে ৩১ মার্চে। শর্তে নদীর কচুরিপানা পরিস্কার, কোন স্থাপনা নির্মাণ করতে পারবে না বলে উল্লেখ করা হয়। নির্ধারিত সময়সীমা পার হয়ে গেলেও সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে এখনো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। এমনকি ভৈরব নদে ইতিমধ্যে কংক্রিটের সিঁড়ি নির্মাণ করেছেন তিনি। পাশেই তৈরি করা হয়েছে একটি ঘর। যা নির্দেশনা শর্তের বিধিভঙ্গের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। শুক্রবার ঘুরে দেখা গেছে, নদীতে কোন কচুরিপানা পরিষ্কার করেনি। নদীতে পড়ে রয়েছে স্পীডবোট, নৌকা। দড়াটানা হাসপাতালের পিছনে ভৈরব নদের তল থেকে পাড় পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছে কংক্রিটের সিঁড়ি। পাশেই তৈরি করা হয়েছে ঘর। এছাড়া নদীর পশ্চিম পাশে নদীর পাড় দখল করে বিভিন্ন দোকান, হোটেল রেস্তোরাঁ নির্মাণ করা হয়েছে। স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এই জায়গাটি একসময় রাজনীতিক নেতাদের দখলে ছিল। পরে নদ খননের সময় দখলমুক্ত করা হয় । এছাড়া, নদের পাড় দিয়ে বাইপাস সড়ক হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া ধারে আবারও নদীর পাড় দখল করে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। এ অবস্থায় আবারও দখলের ঘটনা নিন্দনীয়।’ অনুমতি পাওয়া মাহাবুব ইসলাম দাবি করেন, তিনি বৈধভাবেই নদের পাড়ে এ স্থাপনা তৈরি করেছেন। সময় শেষ হলেও তিনি আবার সময় বৃদ্ধির জন্য আবেদন করেছেন। তিনি দাবি করেন, ‘টুরিস্ট পয়েন্ট’ তৈরি হলে একদিকে যেমন যশোরবাসীর বিনোদনের স্থান পাবে; অন্যদিকে নদী পরিস্কার থাকবে।’ পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী বলেন- ‘শর্তসাপেক্ষে দুই মাসের জন্য শুধুমাত্র কচুরিপানা পরিষ্কার করে স্পিডবোট চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। সিঁড়ি বা কোনো স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়নি। এছাড়া, ওই অনুমতির মেয়াদও এখন শেষ হয়ে গেছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ এই বিষয়ে জেলা নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসানের মুঠোফোনে কয়েকদফা যোগাযোগ করা হলে তিনি রিসিভ করেননি।’