স্পন্দন ডেস্ক : যশোরের মণিরামপুর ও কেশবপুরে বৃহস্পতিবার দুপুরের পর হঠাৎ কালবৈশাখি ঝড় ও বজ্রপাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিসহ কৃষক নিহত হয়েছে। টানা আড়াই ঘন্টারও বেশি সময় চলা এই ঝড়ে আহত হয়েছে অন্তত ২০ জন। এছাড়াজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ঝড়ের কারণে দুপুরের পর থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
গত কয়েকদিন ধরে যশোরের তাপমাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে ছিল। বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষ গরমে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। দুপুরের পর আকাশ কালোমেঘে গুমোট আকার ধারণ করে শুরু হয় প্রচ- ঝড়। সেই সাথে বজ্রবৃষ্টি।
রাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান-
মণিরামপুর উপজেলার রাজগঞ্জে বৃহস্পতিবার দুপুরে বজ্রপাতে মশ্মিনগর ইউনিয়নের সাহাপুর গ্রামের বাসিন্দা কৃষক লুৎফর রহমান সরদার নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে মাঠে কাজ করার সময় প্রচ- মেঘ ও কালবৈশাখী ঝড়ের সাথে ঘন ঘন আকাশ কাঁপানো গর্জন সৃষ্টি হয় । এসময় লুৎফর রহমান বাড়ি ফেরার পথে বজ্রপাত হলে ঘটনাস্থলে তার মৃত্যু হয়েছে । তিনি প্রতিদিনের মত বৃহস্পতিবারও সকালে শাহপুর মাঠে ফসলি জমিতে কাজ করতে আসেন।
তার মৃত্যুর সংবাদে পরিবার ও এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে প্রচ- তাপের সাথে তীব্র গরম পড়তে থাকে। এরপরে দুপুরে শুরু হয় বজ্রবৃষ্টি, শিলার সাথে কালবৈশাখী ঝড়। এতে রাজগঞ্জ অঞ্চল লন্ড ভন্ড হয়ে যায়। ক্ষতি হয়েছে কৃষকে কাঁচা পাকা ধানের। বিদ্যুৎ লাইনে খুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ দোকান পাট ও ঘর বাড়ির, ঝাঁপা ভাসমান সেতুসহ রাজগঞ্জ অঞ্চলে ঝড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঘরের চাল উড়ে গেছে, গাছ ভেঙে তছনছ হয়েছে। গাছ রাস্তায় পড়ে চলাচল বন্ধ হয়ে যায় । অন্যদিকে উপজেলার মশ্বিমনগর ইউনিয়নের পারখাজুরা এলাকায় কাল বৈশাখি ঝড়ে তীব্র আঘাত হানে। বিভিন্ন স্থানে গাছ উপড়ে পড়ে এবং অনেকের ঘরের চালের টিন উড়িয়ে নিয়ে যায়। বিভিন্ন গাছ ভেঙে আঁছড়ে পড়ে বিদ্যুুতিক খুঁটির উপরে। ওই এলাকাসহ ঝাাঁপা, হরিহরনগর, রাজগঞ্জ এলাকায় বন্ধ রয়েছে বিদ্যুৎ সরবারহ।
কেশবপুর প্রতিনিধি জানান-
দুপুরে কালবৈশাখীর তা-বে পাকা ধানের খেত লা-ভ- হয়েগেছে। শাহাপুর বাজারের শত বছরের পুরাতন বটগাছ উপড়ে গেছে। কৃষকের পাঁকা বোরোধান খেতে কালবৈশাখী তা-বে শীলা ও বজ্র বিষ্টিতে বোরোধান খেতে যেন মৈ দিয়েছে। বজ্রপাতে ও শীলা বৃষ্টিতে উঠতি পাঁকা বোরোধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কষ্টের ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কৃষককুল হতাশ হয়ে পড়েছে। তাদের আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে।
বৈশাখের ঝড়োহাওয়ার তা-বের কারণে গুটি আম ঝরে গাছ আম শূন্য হয়ে গেছে। উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের উপ-সহকারী কৃষি অফিসার মোঃ রুস্তম আলী দৈনিক স্পন্দনকে বলেন- চলতি বোরো মৌসুমে উপজেলায় লক্ষ্য মাত্রা ছাড়িয়ে ১৫ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে বোরোধান আবাদ হয়েছে। ধানের ফলন খুব ভালো হয়েছিল। বৈশাখ মাসের শুরুতেই বোরো খেতের ধান পাক ধরেছে।বজ্র ও শীলা বৃষ্টিতে পাকা ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এবছর আমের মুকুলসহ ভালো ফলন হয়েছিল।
চলতি বোরো মৌসুমে উপজেলার প্রায় সাড়ে ৬ হাজার মৎস্য ঘেরের ভিতরে আবাদ কৃত বোরোধান পানিতে তলিয়ে গেছে। কষ্টে অর্জিত বোরোধান তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকের আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। সদর ইউনিয়নের ব্যাসডাঙ্গা গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন ঝড়ের তান্ডব পাকা ধানের খেত জমিতে শুয়ে গেছে। আর সেই ধরনের খেত পানিতে তলিয়ে গেছে। একই সাথে আমের মুকুল ঝড়ে পড়েছে। কোমরপোল গ্রামের নুরুজ্জামান বলেন- তার জমিতে ব্রি-২৮ জাতের ধান লাগানো ছিল। যা আগাম পাক ধরেছে। ঝড়ো হাওয়ায় ও বজ্র বৃষ্টিতে পাঁকাধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
বৈশাখী ঝড়ের কবলে পড়ে গাছপালা ভেঙ্গে গ্রামাঞ্চলের যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে পড়েছে। একই সাথে গ্রামাঞ্চলের বৈদ্যুতিক সংযোজন বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে।
অনেক জায়গায় গাছ ভেঙে পড়েছে, বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে গেছে এবং অসংখ্য স্থানে তার ছিঁড়ে পড়েছে। ঝড়ে আহত হয়ে ৯ জন কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন। যাদের মধ্যে ২ জনকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার্ড করা হয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, প্রায় ১৫০ বিঘা জমির ধান হেলে পড়েছে এবং আম ও কাঁঠালেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মোশাররফ হোসেন জানান, ‘ঝড় বৃষ্টিতে যশোরে তেমন ক্ষতি হয়নি। কিছু কিছু জায়গায় বোরো ধান হেলে পড়েছে; সেগুলোতে তেমন ক্ষতির আশাঙ্কা দেখছি না। যশোরে ১৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এই বৃষ্টি ধানের জন্য আর্শিবাদ। তার পরেও কোথাও ক্ষয়ক্ষতি হলে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’
যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি -২ জেনারেল ম্যানেজার হাদিউজ্জামান বলেন, ‘কাল বৈশাখী ঝড়ে মণিরামপুর ও কেশবপুরে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১৬টি বিদ্যুতিক খুঁটি ভেঙ্গে গেছে। অসংখ্যা জায়গায় তারের উপর গাছ পড়ে আছে। আমাদের কর্মীরা রাতেও কাজ করছে। তবে সব জায়গায় বিদ্যুৎ লাইন সচল করা সম্ভব হবে না।’
জেলা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা শেখ আব্দুল কাদের বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় ঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। বজ্রপাতে মণিরামপুরে একজন মারা যাওয়ার খবর আছে। তবে কি পরিমান ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে; সেটা নিরুপণে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’