Ad for sale 100 x 870 Position (1)
Position (1)

ধূমপান রোধে রাষ্ট্র ও সমাজের করণীয়

এখন সময়: সোমবার, ১ জুন , ২০২৬, ০৯:৪১:২৫ পিএম

বিশ্বাস ওয়াহিদুজ্জামান :

ভূমিকা: মানুষ সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ জীব। কিন্তু এই সর্বশ্রেষ্ঠ জীবেরও কিছু বদঅভ্যাসও রয়েছে। তন্মধ্যে ধূমপান প্রধানতম বদঅভ্যাস। এটি আমাদের সমাজকে অনেক পিছিয়ে দিচ্ছে । এর কুফল জীবনব্যাপী এবং প্রজন্ম হতে প্রজন্মন্তরে। এটি একটি সামাজিক ব্যাধি। ৩১ মে ২০২৫ বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবসে এ বিষয়ে কিছু পর্যবেক্ষন নিম্নরূপ।

মাধ্যম: ধূমপান বাংলাদেশে সাধারনত হয়ে থাকে বিড়ি সিগারেটের মাধ্যমে। তুলনামূলকভাবে বিড়ি কমমূল্যের এবং গ্রামে সহজলভ্য আর সিগারেট তুলনামূলক দামী, বর্তমান সময়ে গ্রাম-শহর সকল স্থানেই প্রকাশ্যে দেদারছে এগুলি বিক্রি হয় ।

সরকারী স্বীকৃতি: দুঃখজনক হলেও সত্য যে বিড়ি সিগারেটের কোম্পানীকে সরকার লাইসেন্স দেন। বিড়ি সিগারেটের প্যাকেট প্রতি একটি করে ব্যান্ডরোল লাগানো হয়,এর মাধ্যমে সরকার রাজস্ব আদায় করে, যদিও এবিষয়ে গবেষক ও সুধীজনের ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। সীমাহীন ক্ষতি : পৃথিবীর কোন বিজ্ঞানী, স্বাস্থ্যবিদ, পুষ্টিবিদ ধূমপানের কোন ইতিবাচক দিক বর্ণনা করতে পারেন নি।

এর সীমাহীন খারাপ দিকগুলির কয়েকটি বর্ণিত হলো- ১। ফুসফুসের ব্যাপক ক্ষতি হয় , কিডনী লিভার ও শ্বাসযত্রের প্রদানহ হয়। ২। কাশি হয়, শ্বাসকষ্ট হয়। ৩। ঠোট কালো হয়ে যায়, চেহারায় লাবন্য নষ্ট হয়। ৪। এটি পৃথিবীর এতটাই জঘন্যতম কাজ যা সিনিয়র-জুনিয়র, পরিবার সদস্য, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মস্থলে সহকর্মী, স্বামী-স্ত্রী, সহযাত্রী কারো সামনে এটা করা যায় না ৫। অহেতুক টাকা ব্যয় হয়। এজন ব্যক্তি সারাজীবনের সিগারেটের টাকা জমিয়ে কমপক্ষে ২/৩ টি মসজিদ মন্দির, পাঠাগার, বা স্কুল তৈরী করতে পারে। ৬। উঠতি বয়সে/ছাত্রাস্থায় ধূমপানে টাকা জোগাড় করতে চুরি ছিনতাই, ধার-কর্জ বা পরিবারের সদস্যগণ হতে চাপপূর্বক টাকা পয়সা গ্রহনের ঘটনা অহরন ঘটছে। ৭। মতিভ্রম হয়, মনোযোগ হারায়। স্মরনশক্তি লোপ পায়। কর্মদক্ষতা ও যৌনক্ষমতা হ্রাস পায়। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। ৮। আয়ু কমে যায়। চিকিৎসকগণ গবেষণা করে দেখেছেন এক একটি বিড়ি-সিগারেটে ২০ মিনিট করে আয়ু হ্রাস পায়। ৯। ধূমপায়ী অপেক্ষা তার নিকটজনের ক্ষতি অধিক হয়। পরিবেশ নষ্ট হয়।

সরকারী প্রচেষ্টা:

১। তামাক ব্যবহার হ্রাস করতে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল নামক একটি অফিস আছে যার অফিস ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবের বিপরীতে তোপখানা রোডে। তাদের কিছু কর্মসূচি আছে। ২। জেলা তামাক নিয়ন্ত্রণ কমিটি রয়েছে সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে। এখানে জেলা শিক্ষা অফিসার , উপপরিচালক সমাজসেবা ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর এবং নির্ধারিত এনজিওগুলি আছে । মাসিক বা ত্রৈমাসিক মিটিং হয়। ৩। বিড়ি সিগারেটের প্যাকেটে ধূমপানের ক্ষতির দিক ও একটি করে রোগীর ছবি দেওয়া থাকে, তবে এ প্রচারনা বড় আকৃতির অক্ষরে নহে, অনেকটা শুভংকরের ফাঁকি । ৪। শুধুমাত্র বিটিভিতে এ বিষয়ে একটি বিজ্ঞাপন হয় রাত আটটার খবরের পূর্বে। এটি বাধ্যতামূলকভাবে সকল চ্যানেলে ২/৩ ঘন্টা পর পর বারংবার প্রচার করা প্রয়োজন। ৫। বাসস্ট্যান্ড, গুরুত্বপূর্ণ সরকারী অফিস সম্মুখে এ জাতীয় বড় বড় বিলবোর্ড স্থাপন করা প্রয়োজন। ৬। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, সমাজসেবা অধিদপ্তর ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তর হতে বেসরকারী সংস্থার রেজিস্ট্রেশন প্রদানকালে সনদের পিছনে বাধ্যতামূলকভাবে ধূমপান ও মাদক নিয়ন্ত্রণে কাজ করার শর্ত জুড়ে দিতে হবে। ৭। সকল সরকারী অফিসের প্রবেশস্থানে ধূমপান রোধে ধূমপান বিরোধী একটি বিলবোর্ড/সাইনবোর্ড স্থাপন বিষয়ে ২০১৯ সালে একটি বিধিমালা জারি করেছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু এবিষয়ে জেলা-উপজেলা স্বাস্থ্য দপ্তর কর্তৃক কোন প্রতিবেদন বা ছবি নেওয়া হয়নি। এটি করা হলে বিধিমালাটি বাস্তবায়ন হতো। ৮। বাংলাদেশ রেলওয়ে ধূমপান রোধে একটি প্রজেক্ট গ্রহন করেছে। ৯। সরকারীভাবে ৩১ মে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস জেলা-উপজেলা পর্যায়ে উদযাপিত হচ্ছে। 

বেসরকারী প্রচেষ্টা:

অনেক বেসরকারী প্রতিষ্ঠান ধূমপান নিয়ন্ত্রনে কাজ করে। তন্মধ্যে উবিনীগ-ঢাকা,এডিআই ঝিনাইদহ, সাফ-পোড়াদহ কুষ্টিয়া, শিক্ষা ফাউন্ডেশন রেলরোড, যশোর অন্যতম। এছাড়া এসব সংগঠনের কেন্দ্রীয় মোর্চা হচ্ছে বাংলাদেশ তামাক নিয়ন্ত্রণ জোট। এসকল সংগঠন স্টিকার, হ্যান্ডবিল, বিলবোর্ড স্থাপন, মিটিং সিটিং, সেমিনার করে ধূমপান নিয়ন্ত্রনে সচেষ্ট আছে।

# সরকারী উৎসাহ ও নির্লিপ্ততা :

সরকার ধূমপান রোধ বিষয়ে অনেকখানি নির্লিপ্ত বলে গবেষকরা মন্তব্য করেছেন। যেমন বিভিন্ন সরকারী বেসরকারী ব্যাংক কুষ্টিয়া ও রংপুর এলাকার বিভিন্ন তামাকচাষীদের সহজ শর্তে পর্যাপ্ত পরিমানে লোন দিয়ে থাকে। এছাড়া সরকারী চাকরীর বিজ্ঞাপনে “ধূমপায়ীদের আবেদন করার প্রয়োজন নেই’ এমন কোন নিষেধাজ্ঞা থাকে না, ফলে শিক্ষার্থী ও যুবকিশোরদের মাঝে ধূমপানের পরিমান ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে । নন ততত

# জরিমানা:

জনসমক্ষে ধুমপান নিয়ন্ত্রনে মাত্র ৫০ টাকা জরিমানার বিধান ছিল। এটি বাড়িয়ে ৩০০/= টাকা করা হয়েছে, এবিষয়ে মাসে প্রতি উপজেলা/ইউনিয়নে বাসস্ট্যান্ড, ট্রেন স্টেশন কমপক্ষে ২০ টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা প্রয়োজন। এগুলি পত্রিকা-ফেসবুকহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারনা প্রয়োজন।

# বিজ্ঞাপন:

৩১ মে তামাক বিরোধী দিবসে সরকারী বেসরকারী অফিস, সংস্থা কর্তৃক পত্রিকাসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচার করা প্রয়োজন।

# অফিস/ট্রেন/রেস্টুরেন্ট ধূমপানের জন্য রুম বরাদ্দ:

অনেক অফিস/ট্রেন/রেস্টুরেন্ট ধূমপানের জন্য পৃথক স্মোকিং জোন/রুম বরাদ্দ আছে সাইনবোর্ডসহ। এটি ধূমপানকে পরোক্ষভাবে প্রমোট করা হচ্ছে। এপ্রথা বন্ধ করতে হবে।

# সর্বাধিক উৎপাদক জেলা:

ধূমপানের প্রধান উপাদান তামাক উৎপাদনে শীর্ষ জেলা কুষ্টিয়া(দৌলতপুর উপজেলা), মেহেরপুর(গাংনী) এবং রংপুর জেলা(হারাগাছ এলাকা)। এসব জেলায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধূপানের ও তামাক চাষের ক্ষতির দিকগুলি নিয়ে কাজ করা যেতে পারে। এসব জেলায় সরকারী বেসরকারী ব্যাংক ও এনজিও যাতে তামাকচাষে লোন বিতরন হ্রাস করে সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক (কেন্দ্রীয় ব্যাংক)/মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটি(এমআরএ) সার্কুলার করুক ।

# কৃষি বিভাগের তৎপরতা:

তামাক উৎপাদনকারী জেলাসমূহে কৃষকদের তামাক চাষের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে মটিভেশনাল সভা করতে হবে। বিকল্প হিসেবে গম,ভুট্রা ও ধান চাষকে উৎসাহিত করতে হবে। ট্রেনিং দিতে হবে, স্বল্পসুদে সহজ কিস্তিতে সফটলোন দিতে হবে।

# উত্তরনের অনান্য উপায়:

১। মটিভেশন: ধূমপায়ীদের মটিভেশন দিয়ে এ বদভ্যাস হ্রাস করে একপর্যায়ে জিরো করাতে হবে। ২। ট্যাক্স /এক্সসাইজ বৃদ্ধি: সরকারীভাবে কর অধিকহারে আরোপ করে শলাকাপ্রতি দাম প্রতিবছর দ্বিগুন করতে হবে।

৩। আমদানী হ্রাস/রোধ:

সিগারেট ও তামাকজাত দ্রব্য বিদেশ হতে আমদানী , আহরন বহন বন্ধ করতে হবে।

৪। ধর্মীয় উপসনালয়ে প্রচারনা:

মসজিদ মন্দির ও অনান্য উপসনালয়ে ধূমপানের ক্ষতি বিষয়ে মাসভিত্তিতে বয়ান/ঘোষনা দেওয়া প্রয়োজন। এভাবে প্রচারনা হলে স্বল্পতম হলেও কাজ হবে। ৫। তামাকমুক্ত জেলা/উপজেলা/ইউনিয়ন/পৌরসভা/গ্রাম ঘোষণা: সরকারীভারে বিভিন্ন এনজিও,যুব সংগঠন,পাঠাগার, সরকারী-বেসরকারী অফিসের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার প্রচারনা করে ২/৩ বছর পরে জরিপ করে তামাক/ধূমপান/মাদকমুক্ত জেলা/উপজেলা/ইউনিয়ন/পৌরসভা/গ্রাম ঘোষণা করা যায়। এবিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি প্রজেক্ট/প্রতিষ্ঠান করতে পারে।

৬। সুযোগ-সুবিধা হ্রাস: ধূমপায়ী কর্মকর্তা কর্মচারী/শিক্ষকের সুযোগ সুবিধা লিখিত বা অলিখিতভাবে হ্রাস করা যেতে পারে।

৭। বিভিন্ন ডকুমেন্ট/ভাউচার/সনদে শ্লোগান:

ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার বিভিন্ন বিভিন্ন ডকুমেন্ট/ভাউচার/সনদে বাল্যবিবাহ/টিকাদান ইত্যাদী বিষয়ে শ্লোগান থাকে। এখন হতে ধূমপানে বিষপান বা অনুরূপ জনসচেতনতামূলক বানী সংযোজন করতে হবে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ডিডি(এলজি) এটি বাস্তবায়ন করতে পারবেন।

৮। পারিবারিক প্রচেষ্টা:

বিবাহসাদী আত্বীয়তা করাসহ পরিবার হতে ধূমপানের বিরুদ্ধে কাজ করতে হবে সকলকে।

উপসংহার: এভাবে ব্যক্তি,পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,কর্মস্থল,সমাজ, রাষ্ট্র সকলের ছোট ছোট প্রচেষ্টায় ক্রমাগত মরনব্যাধি ধূমপানের মত নিকৃষ্টতম গর্হিত অভ্যাসটি হ্রাস বা বন্ধ করা যেতে পারে।

## প্রাবিন্ধক শিক্ষা ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, রেলরোড, যশোর এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান উপদেষ্টা

Ad for sale 100 x 870 Position (2)
Position (2)
Ad for sale 225 x 270 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 225 x 270 Position (4)
Position (4)