নিজস্ব প্রতিবেদক : পদ্মা সেতুর সুবাদে দক্ষিণাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগে বিপ্লব ঘটলেও চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে দেশের অন্যতম প্রাচীন যশোর বিমানবন্দর। যাত্রী অর্ধেকের নিচে নেমে আসায় দৈনিক ১৮টি ফ্লাইটের বদলে এখন পুরো সপ্তাহে চলছে মাত্র ৯টি ফ্লাইট। লোকসানের মুখে আগামী ১৬ জুলাই থেকে এই রুটে সব ফ্লাইট পুরোপুরি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। বিমান চলাচলের এই নজিরবিহীন সংকটে স্থানীয় অর্থনীতি স্থবির হওয়ার পাশাপাশি কর্মহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন ট্রাভেল এজেন্সি, পরিবহন খাতসহ বিমানবন্দর কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে জড়িত শ’শ’ মানুষ। এদিকে, যশোর বিমানবন্দরে ফ্লাইট বাতিলের প্রতিবাদে বুধবার মানববন্ধন করেছে দক্ষিণবঙ্গ ট্রাভেল এজেন্সি ঐক্যজোট। বক্তব্য রাখেন দক্ষিণবঙ্গ ট্রাভেল এজেন্সি ঐক্যজোটের শরিফুল ইসলাম, রাকিব হাসান, গিয়াসউদ্দিন বাদশা, গোলাম মোস্তফা, হাসনাত, আবুল হাসনাত, শাইদুজ্জামান, এহেতেশাম ফারুক, আসিফ বাবু, মাজহারুল ইসলাম, নোমান হাসান প্রমুখ। যশোর বিমানবন্দর সূত্রে জানাগেছে, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আগে যশোর বিমানবন্দর যাত্রীদের পদচারণায় মুখরিত থাকতো। আগে যেখানে দৈনিক সর্বোচ্চ ১৮টি পর্যন্ত ফ্লাইট ওঠানামা করতো, সেখানে এখন পুরো সপ্তাহে ফ্লাইট চলছে মাত্র ৯টি। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ইউএস-বাংলা ও নভোএয়ার নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করতো। পদ্মাসেতু চালুর পর বদলে গেছে দক্ষিণাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ। সময় ও দূরত্ব কমায় সড়কপথেই এখন স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত করছেন যাত্রীরা। তবে এর বড় ধাক্কা লেগেছে এই অঞ্চলের একমাত্র যশোর বিমানবন্দর রুটে। ঢাকা-যশোর রুটে বিমানের যাত্রী নেমে এসেছে অর্ধেকেরও নিচে। বর্তমানে সীমিত পরিসরে ডানা মেলছে বিমান বাংলাদেশ ও ইউএস-বাংলা। তবে লোকসানের মুখে আগামী ১৬ জুলাই থেকে এই রুটে নিজেদের সব ফ্লাইট পুরোপুরি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। ফ্লাইট বন্ধের এই সিদ্ধান্তে হুমকির মুখে পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতি। বিমানবন্দর কেন্দ্রিক গড়ে ওঠা ট্রাভেল এজেন্সি, ভাড়ায় চালিত গাড়ির চালক এবং আশপাশের ছোট-বড় ব্যবসায়ীরা এখন কর্মহীন হওয়ার শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন শ’শ’ মানুষ। যশোরের বিমানের টিকেট এজেন্সি ইস্কাইজেট এর স্বত্ত্বাধিকারী অরুণ মজুমদার জানান, আগে যখন যশোর-ঢাকা রুটে ১৮টি বিমানের ফ্লাইট চলচাল করেছে তখন প্রতিদিনি দুই হাজার যাত্রী চলাচল করেছে। বর্তমানে প্রতিদিন মাত্র গড়ে ৭০-৮০ জন যাত্রী চলাচল করছে। ইউএস বাংলা ফ্লাইট বন্ধ করলে শুধু বাংলাদেশ বিমানের দুটি ফ্লাইট চলবে সপ্তাহে। তখন গড়ে ৮০ জন যাত্রী চলাচল করবে। তিনি বলেন, মূলত সব বিমানের ফ্লাইটের টিকেটের দাম বেশি হবার কারণে যাত্রী মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। কারণ যশোর ঢাকা রুপের দূরত্ব ৭৮ নটিকেল মাইল, ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৫ হাজার ৭৫০ টাকা। আর ঢাকা-কক্সবাজার রুটের দূরত্ব হলো ১৬৭ নটিকেল মাইল, যার ভাড়া ৪ হাজার ৮৫০ টাকা। ভাড়ার বৈষম্য দূর হলে যশোর ঢাকা রুটে আবারও যাত্রী ফিরে আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বিমানবন্দর এলাকার ট্রাভেল এজেন্সি গিয়াসউদ্দিন বাদশা বলেন, ‘এক সময় প্রতিদিন ১৮টার উপরে ফ্লাইট হতো। সেটি কমতে কমেেত এখন দাঁড়িয়েছে একটিতে। যার প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন এজেন্সি গাড়িচালকদের। পরিবার পরিজন নিয়ে বিপাকে আছেন শ’শ’ মানুষ। তিনি বলেন, ‘মূলত টিকিটের দাম বেশি হওয়ার কারণে মানুষের আগ্রহ কমেছে।’ যশোর চেম্বার অব কমার্সের যুগ্ম সম্পাদক এজাজ উদ্দিন টিপু বলেন, ‘বাণিজ্যিকভাবে যশোর গুরুত্বপূর্ণ জেলা। বেনাপোল ও নওয়াপাড়া বন্দর থাকাতে প্রতিনিয়ত ঢাকা থেকে বিভিন্ন ব্যবসায়ীরা যশোরে আসেন। যেখানে বিভিন্ন জেলায় ফ্লাইট বৃদ্ধি পাচ্ছে; সেখানে যশোরের মতো জায়গায় ফ্লাইট বন্ধ করা হচ্ছে। এটা দুঃখজনক। এর মাধ্যমে যশোরের অর্থনীতিক সেক্টরে প্রভাব পড়তে পারে। সরকারি বিমানের পাশাপাশি বেসরকারি বিমানে আরো ফ্লাইট চালুর দাবি জানাচ্ছি। এদিকে, এমন পরিস্থিতিতে বিমানবন্দর এলাকায় বুধবার দুপুরে মানববন্ধন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে ট্রাভেল এজেন্সি, ভাড়ায় চালিত গাড়ির চালক ও ব্যবসায়ীরা। দক্ষিণবঙ্গ ট্রাভেল এজেন্সি ঐক্যজোটের ব্যানারে নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন দাবি জানান। কর্মসূচিতে নেতৃবৃন্দ প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় নিয়মিত ফ্লাইট, যশোর রুটে অতিরিক্ত বিমান ভাড়া কমিয়ে অন্য রুটের সঙ্গে ন্যায় সঙ্গত ভাড়া নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়। তাদের দাবি ভাড়া কমিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করলে যাত্রী ফিরবে বিমানে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, ‘নানা সংকটের মধ্যেও যশোর ঢাকা রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করেছে। তবে পদ্মাসেতুর প্রভাবে অনেকটা যাত্রী কমেছে। সাধারণ মানুষ পদ্মা সেতু রুটেই চলাচল করছে। যাত্রী সংকটে বাস্তবতা নিরিখে এই সিন্ধান্ত নিয়েছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। যদি যাত্রীদের চাহিদা বাড়ে; তাহলে আমরা দ্রুতই ফ্লাইট পরিচালনা করবো।’ যশোর বিমানবন্দর ম্যানেজার আইয়ুব আলী জানান, পদ্মা সেতুর সুবাদে যাতায়াত সহজ হওয়ায় মানুষ গাড়িতে চলাচল করছে। বিশেষ করে আগে খুলনার যাত্রীরা যশোর বিমান বন্দর ব্যবহার করত। কিন্তু এখন তারা গাড়িতে পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকায় যাচ্ছেন। এতে করে যাত্রী সংকটে পড়েছে বেসরকারি বিমানগুলো। তবে যাত্রী কমলেও আমাদের কোন সমস্যা হবেনা। যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন- ‘বাণিজ্যিক স্থান থেকেই ফ্লাইট বাড়াতেও এয়ারলাইন্সগুলোর সমস্যা হবে। জেলার গুরুত্ব বিবেচনা করে বিমান সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে সমস্যার সমাধান করা হবে। তিনি বলেন, যেহেতু যশোর ফুল ও সবজির জন্য বিখ্যাত, সারাবিশ্বে রপ্তানির জন্য এই বিমানবন্দরে কার্গোবিমান চালুর বিষয়টিও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’ প্রসঙ্গত, বর্তমানে প্রতিদিন ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স একটি, প্রতি মঙ্গলবার ও শুক্রবার একটি করে ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান বাংলাদেশ।