মনিরুল ইসলাম মনি, সাতক্ষীরা : ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় হোটেল শিখা ইনে অগ্নিকণ্ডে নিহত সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের যুবক আলিমুজ্জামান সাজুর (৪৫) মরদেহ দীর্ঘ চার দিন পর অবশেষে দেশে পৌঁছেছে। ভোমরা ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট কতৃপক্ষ তার পরিবারের কাছে নিহত সাজুর মরদেহ হস্তান্তর করেন। শনিবার দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে ভারতের ঘোজাডাঙ্গা ইমিগ্রেশন ও বিএসএফ কর্তৃপক্ষ সাজুর লাশবাহী গাড়ি নিয়ে জিরো পয়েন্টে পৌঁছায়। এ সময় বাংলাদেশের ভোমরা ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের ওসি সজীব বালা ও বিজিবি কোম্পানি কমান্ডার আফজাল হোসেন ভারতীয় কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে সাজুর লাসের কফিন গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ইমিগ্রেশন চেকপোষ্টে আনুষ্ঠানিকতার শেষে সাজুর লাস তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। এরপর নিহত সাজুর গ্রামের বাড়ি কালীগঞ্জ উপজেলার উদ্দেশ্যে রওনা হয় তার লাশ ভাই অ্যাম্বুলেন্স। দুপুর ২ টার দিকে রাজুর লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স গ্রামের বাড়ি তারালিতে পৌঁছালে কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের স্বজনেরা। কান্নার আহাজারিতে যেন এখানকার আকাশ বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। বিকেলে আছর নামাজ বাদ জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানের তার লাশ দাফন সম্পন্ন হয়। আলিমুজ্জামান সাজু কালিগঞ্জের তারালী ইউনিয়নের বরেয়া গ্রামের মৃত ইউনুচ সরদারের ছেলে। তিনি পেশায় ঘের ব্যবসায়ী ছিলেন। চার ভাইয়ের মধ্যে সাজু ছিলেন সবার ছোট। তার মেজো ভাই রাজু সরদারও মারা গেছেন। মাত্র এক বছর আগে মাকে হারান তিনি। এরই মধ্যে সাজুর মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছে বড় ভাই সাহেব আলী সরদার ও সেজু ভাই উজ্জ্বল সরদার। সাজুর ভগ্নিপতি শফিকুল ইসলাম শফি জানান, কোমরের ব্যাথার চিকিৎসার জন্য প্রায় ৫-৬ দিন আগে ভারতে গিয়েছিলেন সাজু। চিকিৎসা শেষে বুধবারই তার বাড়ি ফেরার কথা ছিল। কিন্তু দেশে ফেরার আগেই কলকাতায় হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে তাঁর মৃত্যুর খবর আসে। ১৯ আগস্ট বুধবার রাত ১০টার দিকে আমরা খবর পাই, কলকাতার হোটেলে আগুন লেগে সাজু মারা গেছেন। প্রথমে বিষয়টি বিশ্বাস করতে পারিনি। পরে এক স্বজনের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হই। সাজুর বড় ভাই সাহেব আলী সরদার বলেন, ‘চিকিৎসা শেষে কলকাতার হোটেল শিখা ইনে ছিল সাজু। তার ফেরার অপেক্ষায় ছিলাম আমরা। হঠাৎ জানতে পারি, ওই হোটেলে আগুন লেগে আমার ভাই মারা গেছে। বাড়ির দ্বিতীয় তলার কাজের জন্য ইট আনা হয়েছে। ছোট ভাই আলিমুজ্জামান সাজু বলেছিল আমি ইন্ডিয়া থেকে আসি, ঘের-বেড়ি বাড়ির অন্যান্য লোকজনদের দেখতে বলিস, আমি এসে কাজে হাত দেব। এর মধ্যেই দুর্ঘটনা ঘটে গেল। প্রতিবেশী হাফিজুর রহমান বলেন, সাজু এলাকায় সৎ ও ভালোমানুষ হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রায় সাত-আট বছর আগে তিনি হজ পালন করেন। মাজার ব্যথা জনিত কারণে তাই বিয়ে করেননি সাজু। এলাকায় কারও সঙ্গে তার কোনো বিরোধ ছিল না। মায়ের মৃত্যুর এক বছর পর অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারানো সাজু। এলাকাবাসী ভবেশ ঘোষ বলেন, কলকাতায় চিকিৎসা করতে যেয়ে হোটেল ম্যানেজমেন্টের অব্যবস্থাপনার কারণে অগ্নিকাণ্ডে বাংলাদেশী প্রবাসীদের মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক। তবে তিনি ধন্যবাদ জানান পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে। তিনি বলেন অগ্নিকান্ডের পর নিউমার্কেট এলাকার ১৭টি আবাসিক হোটেলের বিরুদ্ধে শোকজ নোটিশ জারি করেছে পশ্চিমবঙ্গের দমকল বিভাগ। ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমতি না থাকার অভিযোগে এসব নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এর আগে আরও ৯টি আবাসিক হোটেল ও চারটি রেস্তোরাঁর বিরুদ্ধে শোকজ নোটিশ জারি করা হয়েছিল। অপর দিকে, একই হোটেলে নিহত অপর বাংলাদেশি কালীগঞ্জ উপজেলার তেতুলিয়া গ্রামের ভাবেশ কুমার সরকারের স্ত্রী দুই সন্তানের জননী গৃহবধূ রেবুতি রানী সরকারের মরদেহ শুক্রবার রাত সাড়ে ৩টার সময় ভারতের কলকাতা নিমতলা শ্মশান ঘাটে অন্ত্যিষ্টিক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নিহত রেবতী সরকারের ছেলে অনিক সরকার ও নিহতের দেবর সঞ্জয় সরকার। নিহত রেবতী সরকারের ছেলে অনিক সরকার বলেন, প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুক্রবার কলকাতা নিউমার্কেট থানা পুলিশ তার মায়ের মরদেহ তাদের কাছে হস্তান্তর করেন। এরপর রাত সাড়ে ৩টা দিকে কলকাতা নিমতলা শ্মশান ঘাটে অন্ত্যিষ্টিক্রিয়া সম্পূর্ণ করা হয়। উল্লেখ্য, গত ১৮ আগস্ট মঙ্গলবার রাত ২টার দিকে কলকাতা শহরের মির্জা গালিব স্টেট এর শিকা ইন হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে ৯ জন নিহত হয়। এরমধ্যে ৭জন বাংলাদেশী নাগরিক। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলায় বরেয়া গ্রামের আলিমুজ্জামান সাজু ও তেতুলিয়া গ্রামের গৃহবধূ রেবতী সরকার। ভোমরা ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে আলিমুজ্জামান সাজুর লাস গ্রহণ করে তার পরিবার পরিজন । পরে বাদ জোহর নামাজে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার লাশটি দাফন করা হয়।