মাসুম বিল্লাহ : মাত্র তিন শতক জমি। বাড়ির আঙিনার ছোট্ট এই জায়গাটুকু এখন সবুজের এক বিস্ময়কর রাজ্য। পরিকল্পিত চাষাবাদ, নিয়মিত পরিচর্যা আর পরিবারের সম্মিলিত শ্রমে সেখানে ফলছে হরেক রকমের শাকসবজি। পেঁপে, করলা, ওল, গিমা কলমি, পুঁইশাক, ঘাটকলমি, কচু, তরমুজ, বেগুন, কুমড়া, শিম, লাউসহ নানা জাতের সবজিতে ভরে উঠেছে পুরো আঙিনা। অল্প জায়গায় পরিকল্পিতভাবে চাষাবাদ করে বাড়ির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত গড়েছেন কলেজ শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ। শিক্ষকতার ব্যস্ততার মাঝেও সকাল-বিকাল সময় বের করে নিজের হাতে পরিচর্যা করেন স্বপ্নের এই সবজি বাগান। তিনি যশোর সদর উপজেলার ইছালী ইউনিয়নের ইছালী গ্রামের বাসিন্দা এবং খাজুরা শহীদ সিরাজ উদ্দীন হোসেন মহাবিদ্যালয়ের প্রভাষক। প্রায় পাঁচ মাস আগে শখের বশে বাড়ির আঙিনায় কয়েক ধরনের সবজির চাষ শুরু করেন আবুল কালাম আজাদ। শুরুটা ছিল ছোট পরিসরে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে আগ্রহ ও পরিশ্রম। ধীরে ধীরে তিন শতকের পুরো জায়গাটিই পরিণত হয় বৈচিত্র্যময় সবজি বাগানে। এখন বাগানের উৎপাদিত সবজি দিয়েই মিটছে পরিবারের দৈনন্দিন চাহিদার বড় একটি অংশ। ফলে বাজার থেকে সবজি কেনার প্রয়োজন অনেকটাই কমে গেছে। পরিবারের সদস্যদের জন্য নিরাপদ ও টাটকা খাবার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি এতে সাশ্রয় হচ্ছে সংসারের খরচও। বাগান পরিচর্যায় আবুল কালাম আজাদ একা নন। তার স্ত্রী ও পরিবারের অন্য সদস্যরাও সহযোগিতা করেন। পরিবারের সম্মিলিত শ্রমে আঙিনাজুড়ে গড়ে উঠেছে এক টুকরো সবুজের ক্যানভাস। কোথাও মাচাজুড়ে লাউ-শিম-কুমড়া, কোথাও সারি সারি বেগুন ও পেঁপের গাছ, আবার অন্য পাশে বিভিন্ন জাতের শাকসবজি। আবুল কালাম আজাদ বলেন, নির্মল পরিবেশে কিছুটা সময় কাটানো, মানসিক প্রশান্তি পাওয়া এবং পরিবারের জন্য নিরাপদ ও বিষমুক্ত সবজি নিশ্চিত করার চিন্তা থেকেই এ উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। তিনি বলেন, “প্রায় পাঁচ মাস আগে সবজি চাষ শুরু করেছি। এখন পরিবারের প্রয়োজনের বেশির ভাগ সবজি বাগান থেকেই পাওয়া যায়। তাই আগের মতো বাজার থেকে সবজি কিনতে হয় না। সকাল ও বিকালে সময় পেলেই বাগানে কাজ করি। আমার স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরাও আমাকে এ কাজে সহযোগিতা করেন।” প্রয়োজন মিটিয়েও বাগানে যখন অতিরিক্ত সবজি উৎপাদন হয়, তখন তা আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যে বিতরণ করেন তিনি। তার কাছে এই বাগান শুধু সবজি উৎপাদনের জায়গা নয়, বরং অবসরকে আনন্দময় ও কর্মমুখর করে তোলার একটি মাধ্যমও। একজন শিক্ষক হয়েও কৃষিকাজে যুক্ত থাকতে গর্ববোধ করেন আবুল কালাম আজাদ। তার মতে, চাকরি বা অন্য কোনো পেশার পাশাপাশি সামান্য জায়গা থাকলেও পরিকল্পিতভাবে চাষাবাদ করা সম্ভব। প্রয়োজন শুধু আগ্রহ, ইচ্ছাশক্তি ও নিয়মিত পরিচর্যার। তিনি বলেন, “আমাদের অনেকের বাড়ির আঙিনায় ছোট-বড় কিছু জায়গা অব্যবহৃত থাকে। একটু পরিকল্পনা করে সেই জায়গা কাজে লাগালে পরিবারের সবজির চাহিদার অনেকটাই পূরণ করা সম্ভব। এতে অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি নিরাপদ খাবারও পাওয়া যায়।” বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও বেকার তরুণদের এমন উদ্যোগে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। তার বিশ্বাস, অল্প জায়গা ও সীমিত সামর্থ্য নিয়েও শুরু করা যায় ফলপ্রসূ উদ্যোগ। কেউ সবজি চাষ সম্পর্কে জানতে বা তার অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে চাইলে সহযোগিতা করতেও তিনি প্রস্তুত। ভবিষ্যতে নিজের এই উদ্যোগ আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে তার। সবজি চাষের পাশাপাশি বাড়ির আঙিনায় ট্যাংকিতে মাছ চাষের স্বপ্নও দেখছেন তিনি। আবুল কালাম আজাদের ভাষায়, “যার যতটুকু জায়গা ও সামর্থ্য আছে, সে ততটুকু দিয়েই শুরু করতে পারে। অল্প জায়গাও ফেলে না রেখে কাজে লাগানো উচিত। এতে পরিবারের খরচ কমবে, নিরাপদ খাবার পাওয়া যাবে এবং অবসর সময়টাও আনন্দের সঙ্গে কাটবে।” মাত্র তিন শতক জমিতে এক কলেজশিক্ষকের এই সবুজ উদ্যোগ তাই এখন শুধু একটি পারিবারিক বাগান নয়। সীমিত জায়গার সর্বোত্তম ব্যবহার, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, পারিবারিক সাশ্রয় এবং কৃষির প্রতি আগ্রহ তৈরির এক অনুপ্রেরণার গল্পও বটে। তিন শতকের এই ছোট্ট সবুজ রাজ্য যেন বলে দিচ্ছে-ইচ্ছা, পরিকল্পনা আর শ্রম থাকলে অল্প জায়গাতেও গড়ে তোলা যায় সবজির স্বর্গ।