বিল্লাল হোসেন : যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এছাড়া রোগীর স্বজনকে জিম্মি বাণিজ্যের অভিযোগে সোনিয়া খাতুন নামে এক স্বেচ্ছাসেবীকে বাদ দেয়া হয়েছে। হাসপাতালের ওয়ার্ড থেকে বহির্বিভাগ নিয়মিত রাউন্ডে দেখা হচ্ছে রোগীরা সঠিক সেবা পাচ্ছেন কিনা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে-হাসপাতালের শৃঙ্খলা, চিকিৎসাসেবা, ওষুধ সরবরাহ, রোগীদের খাবার, রাজস্ব আয় থেকে শুরু করে টেন্ডার কার্যক্রম প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই নজর রাখছেন তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত। অফিসের কাজের পাশাপাশি হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও বহির্বিভাগে গিয়ে রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলছেন। চিকিৎসক-কর্মচারীরা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করছেন কি না, রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ওষুধ পাচ্ছেন কিনা এসব বিষয় সরেজমিনে দেখছেন। হাসপাতালের ফার্মেসিতে অ্যান্টিবায়োটিক ‘কেফুক্লেভ’ গায়েবের অভিযোগ ওঠার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে ফার্মেসির ইনচার্জ জহুরুল ইসলামের ইনচার্জের দায়িত্ব বাতিল করা হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে ওষুধ গায়েবের প্রকৃত কারণ এবং কারও দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় নবজাতকের মাথায় আঘাত লেগে মৃত্যুর ঘটনায়ও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং অস্ত্রোপচারের সময় সংশ্লিষ্টদের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তদন্তের মাধ্যমে তা বের করার চেষ্টা চলছে। রোগীদের দালাল ও প্রতারকদের হাত থেকে রক্ষায় হাসপাতালের প্রচার মাইক সচল রাখা হয়েছে। রোগী ও স্বজনদের সচেতন করতে নিয়মিত সতর্কবার্তা প্রচার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে রোগীদের সহযোগিতার নামে কেউ যাতে অনৈতিকভাবে অর্থ আদায় করতে না পারে, সে বিষয়েও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। রোগীর স্বজনকে জিম্মি করে অর্থবাণিজ্যের অভিযোগ ওঠায় স্বেচ্ছাসেবী সোনিয়া খাতুনকে বাদ দেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্বেচ্ছাসেবীদের রোগীদের সহযোগিতার দায়িত্ব দেয়া হলেও কোনো ধরনের অবৈধ অর্থ লেনদেন বা বাণিজ্য করার সুযোগ দেওয়া হবে না। রোগী ও স্বজনদের কাছ থেকে অনৈতিকভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের খাবারের মান নিয়েও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিনের মামলার জটিলতা কাটিয়ে নতুন টেন্ডারের মাধ্যমে রোগীদের উন্নত মানের খাবার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি টেন্ডার কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। হাসপাতালের রাজস্ব আয় ও আর্থিক কার্যক্রমেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সরকারি অর্থ ও সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের হাসপাতালের নির্ধারিত নিয়মের মধ্যে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। হাসপাতালের বিভিন্ন সেবায় কোনো ধরনের অনিয়ম বা অব্যবস্থাপনা যাতে দীর্ঘস্থায়ী না হয়, সে জন্য নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রশাসনিক কঠোরতার পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়কের নিয়মিত মাঠপর্যায়ের উপস্থিতির কারণে বিভিন্ন সমস্যা দ্রুত চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে। অভিযোগ পাওয়ার পর তা যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দায়িত্ব পালনে ভালো কাজ করা চিকিৎসক-কর্মচারীদের উৎসাহিত করার ওপরও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত বলেন, ‘একজন রোগী অনেক আশা নিয়ে হাসপাতালে আসেন। তাই কোনো রোগী যেন হয়রানির শিকার না হন, প্রয়োজনীয় ওষুধ থেকে বঞ্চিত না হন কিংবা দালাল-প্রতারকের কবলে না পড়েন—এটি নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত হবে, সত্যতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালের প্রতিটি সম্পদ জনগণের। তাই ওষুধ, খাবার, রাজস্ব আয় ও টেন্ডারসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে চাই। যশোর জেনারেল হাসপাতালকে আরও সুশৃঙ্খল, রোগীবান্ধব ও আস্থার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করাই আমাদের লক্ষ্য।’